Jagonews24
ভারতের জন্মহার (ফার্টিলিটি রেট) প্রথমবারের মতো জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় স্তরের নিচে নেমে গেছে, যা ভবিষ্যতে শ্রমশক্তির ঘাটতি এবং বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করেছে। গত মাসে ভারতের অফিস অব দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেনসাস কমিশনার প্রকাশিত সর্বশেষ এসআরএস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট প্রজনন হার (টিএফআর) প্রতি নারীর ক্ষেত্রে ১.৯ সন্তানে নেমে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখতে যেখানে ২.১ প্রয়োজন, সেখানে এই হার এখন তারও নিচে। টিএফআর বলতে একজন নারী তার জীবদ্দশায় গড়ে কত সন্তান জন্ম দিতে পারেন, তা বোঝায়। ২০০০ সালের দিকে ভারতে এই হার ছিল প্রতি নারীতে প্রায় ৩.৩ সন্তান। জন্মহার কমার পেছনে কী কারণ? ১৯৭০-এর দশক থেকে ভারতীয় সরকার ও নীতিনির্ধারকরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছেন। তাদের মতে, দেশের মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল, অথচ সম্পদ ছিল সীমিত এবং তখনকার ভারত তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ছিল। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১৯৭০-এর দশকে বিতর্কিত জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচিও ছিল। ২০১৯ সালেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ’ নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ভারত এক নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। সে বছর প্রকাশিত ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে-র তথ্য দেখায়, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে জন্মহার দ্রুত কমছে। যদিও এক বছর পর ভারত জনসংখ্যার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশে পরিণত হয় এবং প্রায় ১৫০ কোটির জনসংখ্যার খবর জন্মহার কমার প্রবণতাকে আড়াল করে দেয়। এখন সর্বশেষ জরিপ বলছে, নীতিনির্ধারকদের ধারণার চেয়ে জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার সম্ভাবনা আরও দ্রুত সামনে চলে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষার প্রসার, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা এবং সন্তান লালন-পালনের ক্রমবর্ধমান ব্যয় জন্মহার কমার অন্যতম কারণ। ভারতের সামাজিক নীতি নিয়ে কাজ করা উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ দিপা সিনা বলেন, যখন সমাজে নারীরা বেশি শিক্ষা, জন্মনিয়ন্ত্রণ সুবিধা এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করেন, তখন সাধারণত মোট প্রজনন হার কমে যায়। তিনি আরও বলেন, এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ভারতে শিশু মৃত্যুর হার কমে যাওয়ায় পরিবারগুলোর বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে। এসআরএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ৩০টি শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটতো, ২০২৪ সালে তা কমে ২৪-এ নেমে এসেছে। এই কারণগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্মহারের পার্থক্যের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ভারতের দরিদ্রতম রাজ্যগুলোর একটি বিহারে জন্মহার ২.৯, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে উত্তর প্রদেশ, যেখানে হার ২.৬। অন্যদিকে, উচ্চ শিক্ষার হার ও কম শিশু মৃত্যুহারের কারণে রাজধানী নয়াদিল্লিতে জন্মহার সবচেয়ে কম, প্রতি নারীতে মাত্র ১.২ সন্তান। দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরালাতেও এই হার ১.৩। দিপা সিনা বলেন, ১৯৮০-এর দশক থেকে ভারতের আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে হওয়া অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণের রাজ্যগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। এসব কারণই সেখানে জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। জন্মহার কমার পরিণতি কী? ২০০৫ সালে ভারতের জনসংখ্যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা জনমিতিক সুবিধার পর্যায়ে প্রবেশ করে। এটি এমন একটি সময়, যখন দেশের কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর (১৫-৬৪ বছর) সংখ্যা শিশু ও বয়স্ক নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বলছে, ভারতের এই সুবিধা ২০৫৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। জাপান, সিঙ্গাপুর ও হংকং ১৯৬০-এর দশকে এই পর্যায়ে প্রবেশ করে এবং দ্রুত উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়। চীন ১৯৮০-এর দশকে এই সুবিধা পায় এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ভারতও এই জনমিতিক সুবিধা থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে। তবে দেশটিতে এখনো লাখ লাখ মানুষ বেকার, আর চীনের মতো ভারতও এখনো উন্নত অর্থনীতির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, জন্মহার কমতে থাকলে ভারত হয়তো এই জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সুফল ভোগ করতে পারবে না, কারণ ভবিষ্যতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাবে এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত দ্রুত বাড়বে। তিনি বলেন, যদি কম শিশু জন্ম নেয়, তাহলে ৩০ থেকে ৪০ বছর পর ভারতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে, যারা শ্রমবাজারে ততটা অংশ নিতে পারবেন না। এটি কর্মশক্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। জনসংখ্যার তথ্য ঘিরে রাজনীতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মহারের ব্যাপক পার্থক্যের অর্থ হলো, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলো ভবিষ্যতে ভারতের মোট জনসংখ্যার আরও বড় অংশ ধারণ করবে। দিপা সিনার মতে, দক্ষিণের রাজ্যগুলো এরই মধ্যে অভিযোগ করে আসছে যে কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে মোদীর সরকার, তাদের তুলনামূলক কম অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শাস্তি দিচ্ছে। তিনি বলেন, এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে আর্থিক সম্পদ বণ্টন আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। চলতি বছরের শেষ দিকে ভারত সরকার সংসদে ‘ডিলিমিটেশন’ বা আসন পুনর্বিন্যাস নীতি আনবে। ২০২৭ সালে শেষ হতে যাওয়া নতুন আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি রাজ্যের সংসদীয় আসন নির্ধারণ করা হবে। সিনহা বলেন, ডিলিমিটেশন কার্যকর হলে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এই ধারণা ছড়িয়ে এসেছে যে মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় বেশি সন্তান জন্ম দিচ্ছে, যা একসময় হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোও হিন্দুদের বেশি সন্তান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ। সরকারি তথ্য বলছে, মুসলমানদের জন্মহারই সবচেয়ে দ্রুত হারে কমেছে। ১৯৯২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলমানদের জন্মহার ৪.৪১ থেকে ২.৩৬-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে হিন্দুদের ক্ষেত্রে তা ৩.৩ থেকে ১.৯৪-এ নেমেছে। সর্বশেষ জরিপও দেখিয়েছে, সব ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যেই জন্মহার দ্রুত কমছে। ভারত কী করছে? এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার জন্মহার কমে যাওয়ার বিষয়ে কোনো জাতীয় নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্য মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে দক্ষিণের অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ঘোষণা করেছে, তৃতীয় সন্তান জন্ম নিলে পরিবারকে ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি দেওয়া হবে। রাজ্যটির বর্তমান জন্মহার ১.৪। পশ্চিমের গোয়া এবং দক্ষিণের কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানা রাজ্য প্রথমবারের মতো সন্তান নিতে ইচ্ছুক দম্পতিদের জন্য সরকারি অর্থায়নে আইভিএফ কেন্দ্র চালু করেছে। দিপা সিনার মতে, সরকারের উচিত মানুষের ব্যক্তিগত প্রজনন সিদ্ধান্তকে সম্মান করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। তিনি বলেন, ভারতের মতো দেশগুলোর উচিত তাদের জনমিতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজনের ভিত্তিতে জননীতি তৈরি করা। যদি আমরা দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হই, তাহলে সেই বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মানুষের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তার মতে, এখনই এমন নীতি প্রয়োজন, যা বয়স্ক মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এশিয়ার আর কোন দেশগুলো একই সংকটে? এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ, যেমন চীন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াও দ্রুত কমতে থাকা জন্মহারের মুখোমুখি। চীনের জন্মহার বর্তমানে ১.০, যা ২.১ প্রতিস্থাপন স্তরের অনেক নিচে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাইওয়ানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির জন্মহার প্রায় ০.৮৬ এবং তা আরও কমতে পারে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার প্রতি নারীতে প্রায় ০.৭৫ সন্তান, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন। সূত্র: আল-জাজিরা এমএসএম
Go to News Site