Jagonews24
তিনি কত ভালো, কত বড় মাপের ব্যাটার ছিলেন, তার ব্যাটিং শৈলী কতটা সাজানো, গোছানো, পরিপাটি, আকর্ষণীয় আর কার্যকর ছিল, পরিসংখ্যানই বা কত সমৃদ্ধ? এসব প্রশ্ন তুলে তাকে খাটো করা যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট ইতিহাসে সন্দেহাতীতভাবে মিনহাজুল আবেদিন নান্নু অনেক বড় নাম। শুধু বড় নাম বলাই বোধহয় যথেষ্ট নয়। সম্ভবত মিনহাজুল আবেদিন নান্নুই একমাত্র ব্যাটার, যিনি টেস্ট না খেলেও দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটারদের একজন বলে পরিগণিত। সাবেক ক্রিকেটার ও স্থানীয় বোদ্ধা বিশেষজ্ঞদের বড় অংশের মতো মিনহাজুল আবেদিন নান্নু দেশের ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা ও দক্ষ ব্যাটার। খেলা ছাড়ার প্রায় দুই যুগ পরও সব পরিচয় ছাপিয়ে এখনো ‘ক্রিকেটার নান্নু’ পরিচয়টাই বড় তার। তিনি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। প্রধান নির্বাচকও ছিলেন প্রায় এক যুগ। এখন তিনি বোর্ড পরিচালকও হলেন। এবারের নির্বাচনে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী জাতীয় দলের এ সাবেক অধিনায়ক। কিন্তু জানেন কি, দেশের ক্রিকেটের এ উজ্জ্বল তারা নান্নু এক সময় খুব ভালো ফুটবলও খেলতেন? ভালো খেলতেন শুনে হয়তো ভাবছেন, পাড়ার, গলির কিংবা স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বুঝি ভালো খেলোয়াড় ছিলেন নান্নু। তা নয়। দেশের দুই সেরা ফুটবল লিগ ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় এক যুগ খেলেছেন তিনি। ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও ছিল তার অনেক পছন্দের, অনেক ভালো লাগার। ঢাকা লিগে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং চট্টগ্রাম লিগে আবেদিন ক্লাব, আগ্রাবাদ নওজোয়ান আর মোহামেডানের হয়েও খেলেছেন নান্নু। ফুটবল খেলার পাশাপাশি ফুটবল দেখা, বিশেষ করে টিভিতে আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার প্রতিও ঝোঁক ছিল প্রচুর। ক্রিকেটার নান্নুর ফুটবলপ্রেমের গল্পেও আছে খানিক বৈচিত্র। তা জানলে অবাক না হয়ে পারবেন না। তার সমবয়সী, সমসাময়িক ক্রিকেটার, ফুটবলার ও ক্রীড়াবিদদের বড় অংশ- যারা আশির দশকের শুরুতে বেড়ে উঠেছেন, তাদের বড় অংশের প্রিয় ফুটবল দল ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইতালি, জার্মানি না হয় ফ্রান্স। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, সেই স্কুলে পড়া অবস্থা থেকেই, মানে আশির দশকের প্রথম দিকে, ক্রিকেটার নান্নু ইংল্যান্ডের সাপোর্টার এবং সেই আশির দশকের শেষ ভাগ থেকে বেশ অনেকটা সময় ইংলিশ ফুটবলের দুর্দান্ত প্রতিভা ব্রায়ান রবসন ছিলেন তার খুব পছন্দের খেলোয়াড়। কী করে ইংল্যান্ড তার প্রিয় ফুটবল শক্তি? কেন আপনার প্রিয় দল ইংল্যান্ড? এর পেছনের গল্প কী? নান্নুর সাজানো-গোছানো জবাব, ‘ইংল্যান্ড আমার প্রিয় দল হওয়ার কারণ হলো ইংলিশ লিগ। আমি ছোটবেলা থেকেই ইংলিশ লিগ ফলো করি। টিভিতে এইটিজের শুরু থেকেই ইংলিশ ফুটবল দেখানো হতো। তা দেখেই আমি লিভারপুল সাপোর্টার হয়ে যাই। ইংলিশ লিগে লিভারপুল আমার প্রিয় ক্লাব। ছোটবেলা থেকেই ওই দলকে সাপোর্ট করি। যতবার ইংল্যান্ড গেছি, প্রতিবার লিভারপুলের চাবির রিং, স্যুভেনির, মাফলার আর জার্সি কিনতাম।’ ‘লিভারপুলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমি এক সময় ইংল্যান্ডের সাপোর্টার হয়ে যাই। আমি এখনো লিভারপুলের খেলা দেখি। বাংলাদেশ সময় যত রাতেই হোক না কেন, লিভারপুলের কোনো ম্যাচই আমি মিস করি না। ঠিক টিভির সামনে বসে দেখি।’ আপনার প্রিয় টিম ইংল্যান্ড, ১৯৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়নি। ফাইনালেও উঠতে পারেনি। তবে সর্বশেষ দুটি ইউরোপিয়ান আসরে রানার্সআপ হয়েছে। প্রিয় দল বিশ্বকাপে পারে না, সমর্থক হিসেবে কেমন লাগে? নান্নু স্বীকার করেছেন, ভক্ত হিসেবে খারাপ লাগে এবং সেই ভালো না করার সম্ভাব্য কারণ খোঁজার চেষ্টাও করেন তিনি। তার অনুভব, ‘আমার মনে হয় ইংলিশ ফুটবলের যারা শীর্ষ কর্তা, দায়টা তাদের। তারা বিশ্বের অন্যতম সেরা, আকর্ষণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্লাব ফুটবল আয়োজন করে অত্যন্ত দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে। কিন্তু সেটা জাতীয় দলকে সেভাবে গড়ে তুলতে পারে না। তাই ইংলিশ দল তত ভালো হয় না।’ তবে গত দুটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ইংল্যান্ড ভালো খেলেছে। ফাইনালেও উঠেছে। এখন বেশ সাজানো-গোছানো দল। বেশ কজন সক্ষম ফুটবলার আছে, যারা অনেক দেশের চেয়ে ভালো। ক্যাপ্টেন হ্যারি কেইন এখনকার বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা পারফরমার। অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমার মনে হয় ইংল্যান্ড এবার বেশ সম্ভাবনাময় দল। শেষ ইউরোপিয়ান কাপেও তারা বেশ ভালো ফুটবল খেলেছে।’ ইংল্যান্ডের পরে আর কোনো দল কি আছে, যে দলকে আপনি পছন্দ করেন? ‘হ্যাঁ আছে। আমার সেকেন্ড চয়েজ আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনা মনে ও অন্তরে গেঁথে আছেন। পৃথিবীর ফুটবলের চিত্রই পাল্টে দিয়েছেন ম্যারাডোনা। সবার যে ফুটবলের প্রতি আকর্ষণ, সেটা জাগ্রত হয়েছে ম্যারাডোনা থেকে।’ আপনার নিজের ফুটবল ক্যারিয়ার নিয়ে কিছু বলুন? আপনি কোন পজিশনে খেলতেন? কোথায় কোথায় খেলেছেন? ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন কি কখনো? ‘হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখার কথা কী বলেন? আমি তো ফুটবলারও ছিলাম। দীর্ঘদিন চিটাগাং লিগ খেলেছি। একটানা প্রায় ১২ বছর চিটাগাংয়ের টপ ক্লাস ফার্স্ট ডিভিশন ফুটবল লিগ খেলেছি। চিটাগাংয়ের লোকজন এখনো বলে, আমি ক্রিকেট না খেলে ফুটবল খেললেও জাতীয় দলে খেলতাম।’ ‘চিটাগাং লিগে আমার প্রথম দল ছিল আমাদের পারিবারিক দল আবেদিন ক্লাব। তারপর মোহামেডানে খেলেছি। ল্যান্ড কাস্টমসে খেলেছি। আগ্রাবাদ নওজোয়ানের হয়েও খেলেছি। আমি লেফট আউট ছিলাম। অনেক খ্যাপ, মানে ভাড়ায় বিভিন্ন জেলা ও নানা অঞ্চলেই খেলতে গেছি। চট্টগ্রামের সর্বকালের অন্যতম সেরা ও কুশলী ফুটবলার আশিষ দার (সাবেক জাতীয় ফুটবলার ও জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আশিষ ভদ্র) সঙ্গেও খেলেছি। চিটাগাংয়ের আগের যারা সংগঠক আছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন আমি কেমন ফুটবলার ছিলাম।’ যেহেতু ফুটবলও ভালো খেলতেন, তাই একসঙ্গে তো আর দুটো চালানো সম্ভব ছিল না। কোন সময়ে ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটকে বেছে নিলেন? ‘১৯৮৩-৮৪ সালে যখন জাতীয় ক্রিকেট দলের হয়ে প্রথম কেনিয়া সফর করি, তখন থেকেই আসলে ফুটবল ছেড়ে ক্রিকেটে বেশি মনোযোগী হওয়া শুরু। কারণ তখন পরিবার থেকে বলা হলো, যেকোনো একটাকে বেছে নাও। এরপর ১৯৮৩ সালে আমার সুযোগ হয় ক্রিকেটে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার। তখনকার অলরাউন্ডার আজহার হোসেন সান্টু আর আমি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলাম ক্রিকেটে হায়ার ট্রেনিং করতে। কিন্তু সেখানে গিয়েও আমি ক্রিকেটের সঙ্গে ফুটবলও প্র্যাকটিস করতাম। অ্যাস্টন ভিলা ক্লাবে, বার্মিংহাম সিটি সন্ধ্যার সময় প্র্যাকটিস করত। ওদের সঙ্গেও আমি অনেকদিন প্র্যাকটিস করেছি। আমি সেখানে খেলার জন্য সিক্স-স্পাইক বুটও কিনেছিলাম।’ ফুটবলের নেশা তার সব সময়ই ছিল। তার প্রমাণ, এরপর ১৯৮৩ সালে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদ যখন ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে ওঠে, সেই দলেও ছিলেন নান্নু। শুনে ও জেনে অবাক হবেন, দেশের ফুটবলের অনেক বড় তারা ‘কিং ব্যাক’ মোনেম মুন্নার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের হয়ে খেলেছেন নান্নু। তার মুখ থেকেই শোনা যাক সেই স্মৃতিকথা, ‘আমরা ছিলাম মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দলের প্রথম ব্যাচ। প্রয়াত মোনেম মুন্না, আমি, আয়াজ, জিয়া বাবু, শিমুল- আমরা সবাই একই ব্যাচের। আমাদের কোচ ছিলেন গফুর বেলুচ। মহসিন হল মাঠে আমরা প্র্যাকটিস করতাম।’ আমি যখন ইংল্যান্ড থেকে ফিরে আসি, তখন মুক্তিযোদ্ধা টিমের জাহাঙ্গীর ভাই, আরশাদ আলী মঙ্গল ভাই আমাকে ঢাকা লিগ খেলার অফার করেন। আমার আম্মা তো একদম রাজি ছিলেন না। তারপরও তারা চিটাগাংয়ের বাসা থেকে গাড়ি করে ঢাকায় নিয়ে আসেন, মুক্তিযোদ্ধার হয়ে খেলার অফার দেন। আমি খুব উপভোগ করেছি। কোচ গফুর বেলুচ আমাকে খুব পছন্দ করতেন। বলতেন, ‘তোকে আমি ব্রাদার্সে খেলাবো। তুই ব্রাদার্সে খেলার মতো প্লেয়ার।’ বিশ্বকাপ ম্যাচ সরাসরি মাঠে বসে দেখেননি কখনো। তবে নিজ চোখে মাঠে বসে খেলা দেখা না হলেও ইংল্যান্ডে ১৯৮৬ সালে আইসিসি ট্রফি খেলতে গিয়ে লন্ডনের উপকণ্ঠের এক পাবে বসে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেছেন। জাগো নিউজের সঙ্গে সে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নান্নু জানান এক অন্যরকম স্মৃতি। ‘১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ ইংল্যান্ডের একটি পাবে বসে দেখেছি। আমরা তখন ইংল্যান্ডে আইসিসি ট্রফি খেলতে গিয়েছিলাম। ওই সময় বিশ্বকাপ ফুটবল চলছিল। আমরা কজন মিলে বিলেতের এক পাবে বসে বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। খেলাটি ছিল আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের। সেই লন্ডনের পাবে বসে ওই ম্যাচ দেখার একটা মজার অভিজ্ঞতাও আছে। যা মনে হলেই হাসি চলে আসে। আবার বিব্রতও হই।’ আমি, আমার বড় ভাই জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার নুরুল আবেদিন নোবেল, বন্ধু ক্রিকেটার জাহিদ রাজ্জাক মাসুম বসে খেলা দেখছিলাম। নোবেল আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। আর্জেন্টিনা গোল দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ল নোবেল। তাকে ‘আর্জেন্টিনা-আর্জেন্টিনা’ ধ্বনি দিতে দেখে ইংলিশরা রাগে নোবেলের দিকে কটমট করে তাকাচ্ছিল। কেউ কেউ রেগে গিয়ে মন্তব্যও করে বসলো। অবস্থা বেগতিক দেখে আমরা ওই জায়গা থেকে অনেক কষ্টে বেরিয়ে আসি।’ এআরবি/আইএইচএস
Go to News Site