Collector
Giriş Yap
লিবিয়ায় অপহরণের শিকার হন ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী | Collector
লিবিয়ায় অপহরণের শিকার হন ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী

লিবিয়ায় অপহরণের শিকার হন ৩০০ অভিবাসনপ্রত্যাশী

যুক্তরাজ্যে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ৩০০ জনের বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অপহরণ করা হয়েছিল গত গ্রীষ্মে। তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন, আর মুক্তিপণ না দিলে জোর করে কিডনি তুলে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে । অপহৃত ব্যক্তিরা সবাই ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের তরুণ। লিবিয়ায় একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া তাদের আটক করে এবং প্রত্যেকের পরিবারের কাছে ৫ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। মিলিশিয়ারা হুমকি দেয়, দ্রুত অর্থ পরিশোধ না করলে বন্দিদের কিডনি অপসারণ করা হবে। বিবিসি এমন কয়েকজন সাবেক জিম্মির সঙ্গে কথা বলেছে, যারা পরে মুক্তি পেয়েছেন। পাশাপাশি এমন কিছু আলোকচিত্রও দেখা গেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে যে জোরপূর্বক অস্ত্রোপচার সত্যিই ঘটেছিল। মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নির্যাতনের বিভিন্ন প্রমাণ দেখিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত সংকীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখা হয়েছিল বন্দিদের। একটি কক্ষে প্রায় ১৮০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। অন্তত একজন জিম্মির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে। তবে এখনো কতজন বন্দি অবস্থায় রয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। যে মিলিশিয়া অভিবাসীদের অপহরণ করেছিল, তারাই মূলত তাদের লিবিয়ার মধ্য দিয়ে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে ছিল। কিন্তু যাত্রার আয়োজনকারী ইরাকি-কুর্দি মানবপাচারকারী নোয়া অ্যারনের সঙ্গে অর্থ লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের জেরে পরিস্থিতি বদলে যায়। অ্যারন বর্তমানে অর্থপাচার ও মানবপাচারের পৃথক মামলায় ফ্রান্সে ১০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এই অপহরণের ঘটনা সামনে আসে মানবপাচারকারী কার্দো জাফকে নিয়ে বিবিসির সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সময়। ওই তদন্তের পর গত মাসে জাফকে গ্রেফতার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, অ্যারন ও জাফ অতীতে একসঙ্গে কাজ করতেন। দুজনই ইরাকি কুর্দিস্তানের রানিয়া শহরের বাসিন্দা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের এক প্রতিবেদনে অঞ্চলটিকে সক্রিয় মানবপাচার চক্রে পরিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিবিসির অনুসন্ধানী দল রানিয়ায় জাফ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল। সে সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের কাছে এসে জানান, তার ছেলে অপহৃতদের একজন ছিলেন। তিনি বলেন, অ্যারনের পাচারচক্র যুক্তরাজ্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে কয়েক হাজার ডলার নিয়েছিল। ওই যাত্রাপথে উত্তর আফ্রিকা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার কথা ছিল। পথে লিবিয়া অতিক্রম করতে হতো। জাতিসংঘের উপদেষ্টা ও মানবপাচার বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ডাঙ্কারলির ভাষায়, লিবিয়া এমন একটি দেশ যেখানে কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিশাল শূন্যতা রয়েছে। দেশটির বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়ার নিয়ন্ত্রণে। মানবপাচার চক্রগুলো তাদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে। তদন্তে জানা যায়, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে বিমানে লিবিয়ায় পৌঁছানো অভিবাসীদের বিভিন্ন দলকে একটি পাহারাদার-ঘেরা স্থাপনায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করা হয়। পরে মিলিশিয়ারা প্রতিটি জিম্মির জন্য ৫ হাজার ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। তাদের দাবি ছিল, আগের একটি চুক্তির অর্থ নোয়া অ্যারন পরিশোধ করেননি। অর্থ দ্রুত না দিলে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করে বলা হয়, একটি কিডনির মাধ্যমে মূল্য আদায় করা হবে। মিলিশিয়ারা জিম্মিদের ছবি ও ভিডিওও পাঠাতো। অনেক ভিডিও ছিল অত্যন্ত সহিংস ও মানসিকভাবে আঘাতমূলক। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণকে বলা হচ্ছে তাকে কিডনি অপসারণের জন্য চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হচ্ছে। রানিয়ার ওই ব্যক্তি জানান, তিনি মুক্তিপণের অর্থ পরিশোধ করেছিলেন। তার ছেলে ১১০ জন জিম্মির সঙ্গে জানুয়ারিতে ইরাকি সরকারের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ বিমানে দেশে ফেরেন। তবে তিনি একটি ছবি দেখান, যা তার ছেলে বন্দি অবস্থায় পাঠিয়েছিল বলে দাবি করেন। ছবিতে পেটের কাছে একটি তাজা অস্ত্রোপচারের দাগ দেখা যায়, যা পরিবারের সন্দেহ অনুযায়ী কিডনি অপসারণের ফল হতে পারে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আরও কয়েক ডজন পরিবার একই ধরনের ছবি নিয়ে সামনে আসে। বিবিসি ছবিগুলোর একটি যুক্তরাজ্যের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখায়। তিনি জানান, ছবির দাগগুলো কিডনি অপারেশনের সময় করা চিরার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। তবে বাস্তবে অঙ্গ অপসারণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। লিবিয়ার অভিবাসনপথে মুক্তিপণের জন্য অপহরণের ঘটনা বহুবার নথিভুক্ত হয়েছে। ডাঙ্কারলির মতে, সীমিত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্রগুলো এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, ফলে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জিম্মি এরই মধ্যে মুক্তি পেয়েছেন। কেউ কেউ দ্রুত মুক্তিপণ পরিশোধ করে মুক্ত হন। তবে কুর্দি কর্তৃপক্ষের সন্দেহ, অন্য কিছু জিম্মিকে হয়তো নিজেদের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের বিনিময়ে মুক্তি পেতে হয়েছে। এক তরুণ জানান, তাকে গরম বস্তু দিয়ে পায়ে দগ্ধ করা হয়েছিল। তিনি পায়ের পোড়া দাগও দেখান। ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর জানায়, সে ১৭৮ জনের সঙ্গে একটি ছোট কক্ষে বন্দি ছিল। তার ভাষায়, আমরা ছয় মাস সূর্যের আলো দেখিনি। সে আরও জানায়, জায়গা এতটাই কম ছিল যে সবাইকে বসে বসে ঘুমাতে হতো। সব বন্দির জন্য ছিল মাত্র একটি শৌচাগার। কেউ বেশি সময় নিলে তাকে মারধর করা হতো। বন্দিদের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিন এক টুকরো রুটি দেওয়া হতো খাবার হিসেবে। তবে সেটিও পেতে হলে অপহরণকারীদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতো। এসব ভয়াবহ ঘটনার পরও ইরাকি কুর্দিস্তান থেকে ইউরোপমুখী অবৈধ অভিবাসনের প্রবাহ থামেনি বলে জানিয়েছেন কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হেমন মেরানি। তিনি বলেন, দেশে ফেরা জিম্মিদের নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের জানাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে অন্যরা একই পথে না যায়। সূত্র: বিবিসি এমএসএম

Go to News Site