Jagonews24
২০১১ সালে তামিমা সুলতানা তাম্মির সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে নাসির হোসেন ও তামিমার বিয়ের ছবি ২০২১ সালে প্রকাশ একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে রাকিবের মামলা ২০২৩ সালে বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও কেবিন ক্রু তামিমা সুলতানা তাম্মির বহুল আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত মামলার রায় ঘোষণা করা হতে পারে আগামীকাল বুধবার (১০ জুন)। তামিমার আগের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে শেষ হওয়ার আগেই নাসিরের সঙ্গে নতুন করে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অভিযোগে করা এই মামলার রায় দেবেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম। কয়েক বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তবে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করা হবে কি না এবং করা হলে শাস্তির মাত্রা কত হবে, তা নির্ভর করবে আদালতের মূল্যায়ন ও রায়ের ওপর। এই মামলা ঘিরে কেবল দেশের ক্রীড়া জগতেই নয়, আইন অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কৌতূহল তো আছেই। কারণ মামলাটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো- আগের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে বহাল থাকা অবস্থায় নতুন করে বিয়ে হয়েছিল কি না। আদালতে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মি/ছবি: জাগো নিউজ মামলায় বাদীর যে অভিযোগ মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমার সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বাদী রাকিবের দাবি, ওই বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে শেষ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসিরকে বিয়ে করেন। পরে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এ ঘটনায় ওই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন রাকিব। এতে অভিযোগ করা হয়, বৈধ বিচ্ছেদ সম্পন্ন হওয়ার আগেই দ্বিতীয় বিয়ে করা হয়েছে। তবে নাসির ও তামিমা শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাদের দাবি, তামিমার আগের বৈবাহিক সম্পর্ক আইন অনুযায়ী শেষ হওয়ার পরই তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আরও পড়ুন ‘বিয়ে বৈধ, অভিযোগ ভিত্তিহীন’, আদালতে বললেন নাসিরের স্ত্রী তামিমা আরও পড়ুন অন্যের বউকে বিয়ে করে বিপাকে ক্রিকেটার নাসির কয়েক বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া মামলার তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক শেখ মো. মিজানুর রহমান আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে নাসির, তামিমা ও তামিমার মা সুমি আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে তামিমার মা সুমিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর আসামিপক্ষ রিভিশন আবেদন করলেও ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তা খারিজ হয়ে যায়। একই বছরের ২০ মার্চ বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। মামলায় মোট ১০ সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। চলতি বছরের মার্চে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার চান। পরে তামিমা নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন, যা গত ৮ এপ্রিল শেষ হয়। সবশেষে গত ৬ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ১০ জুন রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন। কয়েক বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে রায়ের অপেক্ষায় থাকা মামলাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালতে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামিদের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। উভয়পক্ষের শেষ যুক্তি শেষ দিনের শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসান আদালতে দাবি করেন, মামলার অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই আসামিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দণ্ড দেওয়া উচিত। অন্যদিকে নাসিরের পক্ষে অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু এবং তামিমার পক্ষে অ্যাডভোকেট মোসলেহ উদ্দিন জসীম অভিযোগ অস্বীকার করে তাদের খালাস প্রার্থনা করেন। এ শুনানির দিন আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন নাসির ও তামিমা। আরও পড়ুন তামিমা ফিরে এলে তাকে গ্রহণ করবেন রাকিব আরও পড়ুন স্ত্রীর সাবেক স্বামীর সঙ্গে কী কথা হলো নাসিরের? রায় ঘিরে বাদী-বিবাদীদের প্রত্যাশা বাদীপক্ষের দাবি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণে অভিযোগের বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ নিয়ে কথা হলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ইসরাত হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন ছিল। এসময় আমরা আদালতে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র ও আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেছি। আমাদের বিশ্বাস, মামলায় উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণে স্পষ্ট হয়েছে যে অভিযোগের বিষয়গুলো ভিত্তিহীন নয়। আদালত সবকিছু বিবেচনা করে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত দেবেন বলে আশা করছি।’ ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আদালতের রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি আইন অমান্য বা আইনের বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহলে তার দায় তাকে বহন করতে হবে। আমরা মনে করি, এই মামলার রায়ের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাবে যে আইনকে পাশ কাটিয়ে কোনো কাজ করলে তার জবাবদিহি করতেই হবে,’ যোগ করেন তিনি। আদালতে মামলার বাদী রাকিব হোসেন/ফাইল ছবি মামলার প্রতিটি ধাপে আদালতের প্রতি আস্থা রেখেছেন জানিয়ে ইসরাত হাসান বলেন, ‘এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষা। বিচারিক প্রক্রিয়ায় যেসব তথ্য ও সাক্ষ্য উঠে এসেছে, সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন হলে বাদীপক্ষ ন্যায়বিচার পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’ অন্যদিকে আসামিপক্ষ শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আদালতে তাদের আইনজীবীদের দাবি, নাসির ও তামিমার বিয়ে আইনসম্মত এবং অভিযোগে বর্ণিত ঘটনাগুলো সঠিক নয়। রায় ঘোষণার আগে আসামিপক্ষের অবস্থান জানতে নাসিরের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু এবং তামিমার আইনজীবী মোসলেহ উদ্দিন জসীমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। আরও পড়ুন নাসির-তামিমার ‘বিয়ে বিতর্ক’ মামলার রায় ১০ জুন আরও পড়ুন অভিযোগ প্রমাণ হলে ৭ বছরের জেল হতে পারে নাসির-তামিমার তালাকের আইনি প্রক্রিয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলাটির মূল ভিত্তি তালাকের বৈধতা ও কার্যকারিতা। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী শুধু মৌখিকভাবে তালাক দিলেই তা কার্যকর হয়ে যায় না। তালাকের নোটিশ যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দেওয়া, সালিশি কার্যক্রম ও নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ার মতো আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন না হলে আগের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে বহাল রয়েছে বলে গণ্য হতে পারে। ফলে আদালতকে মামলার নথিপত্র, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। কেউ যদি আইন অমান্য বা আইনের বিধান লঙ্ঘন করেন, তাহলে তার দায় তাকে বহন করতে হবে। আমরা মনে করি, এই মামলার রায়ের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাবে যে আইনকে পাশ কাটিয়ে কোনো কাজ করলে তার জবাবদিহি করতেই হবে।- বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসান নজর আদালতের রায়ের দিকে পাঁচ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এখন আলোচিত এ মামলার রায়ের দিকে তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। আদালত অভিযোগের সত্যতা, সাক্ষ্য-প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার যথার্থতা বিবেচনা করে ১০ জুন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। আইনজীবীদের মতে, নাসির-তামিমার মামলার রায় ভবিষ্যতে তালাক, পারিবারিক আইন ও দ্বিতীয় বিয়ে-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসান/ছবি: জাগো নিউজ অভিযোগ প্রমাণ হলে কী শাস্তি আইনজীবীদের মতে, মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। এ নিয়ে আলাপকালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহিয়া বিনতে মাহাবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় আদালতকে প্রথমে নির্ধারণ করতে হয় যে পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে বহাল ছিল কি না। যদি আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্রের ভিত্তিতে মনে করেন যে আগের বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে হয়েছে, তাহলে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার বিষয়টি প্রযোজ্য হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আদালতের।’ এমডিএএ/একিউএফ/এমএফএ
Go to News Site