Jagonews24
দেশে করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল লেনদেনে নজরদারি বৃদ্ধি এবং ব্যবসাকে আরও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনতে এবারের বাজেটে একগুচ্ছ নীতিগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন খাতে কর-শুল্ক ছাড়, প্রণোদনা এবং কর প্রশাসনে সংস্কারের পরিকল্পনাও করছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, করের আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভবিষ্যতে নতুন ও বিদ্যমান উভয় ধরনের ব্যাংক হিসাবের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। তবে শিক্ষার্থী, সরকারি ভাতাভোগী এবং গেজেটের মাধ্যমে কর অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিসাবধারীর কোনো টিআইএন নেই। সরকার মনে করছে, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে কর শনাক্তকরণ নম্বর যুক্ত হলে আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণ সহজ হবে এবং কর ফাঁকির সুযোগ কমে আসবে। একই ধারাবাহিকতায় এমএফএস খাতেও আসছে নতুন বাধ্যবাধকতা। বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা উপায়ের মতো প্ল্যাটফর্মে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে ব্যবসায়ীদের বৈধ বিআইএন অথবা বিআইএন নিবন্ধনের প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। ভ্যাট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে পরিচালিত ব্যবসার কার্যক্রমকে কর কাঠামোর আওতায় আনার উদ্দেশ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আরও পড়ুন বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ‘বড় সুখবর’ বর্তমানে দেশে প্রায় ১০ লাখ মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যদিও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি অংশের আশঙ্কা, অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর ক্রেডিট কার্ড গ্রহণের হার কমে গিয়েছিল। এখন নতুন করে ব্যাংক হিসাবধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যাংক লেনদেনও কমে যেতে পারে। ঢাকার পল্লবী এলাকায় বিকাশ ও ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ট্রেডলাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করি। সরকারের সব ধরনের আইন মেনে চলি। এখন বিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে এতে হয়রানি বাড়বে, খরচ বাড়বে। সরকার এটি বিবেচনা করবে আশা করি।’ তবে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়তে বড় ধরনের কর-শুল্ক ছাড়ের পরিকল্পনাও করছে সরকার। মোবাইল সিমের ওপর দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার করা হচ্ছে, যার ফলে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব কমলেও ডিজিটাল সেবার বিস্তার বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প খাতের একাধিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হ্রাস এবং বিভিন্ন খাতে উৎসে করের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিত্য প্রয়োজনীয়সহ অনেক পণ্যের দাম কমবে। স্বাস্থ্য খাত এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত ৬৬টির বেশি কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নয়টি কাঁচামালে কর রেয়াত এবং এপিআই শিল্পের জন্য নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির আগাম কর প্রত্যাহার এবং মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে স্থানীয় ওষুধশিল্প আরও শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদন ব্যয় কমবে। আরও পড়ুন ঝিমিয়ে পড়েছে সর্বজনীন পেনশন, এক বছরে নতুন নিবন্ধন চার হাজার জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বিএপিআই) কোষাধ্যক্ষ মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, এপিআই তৈরির কাঁচামালের ওপর আমদানি শুন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ খাত সুবিধা পাবে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল উৎপাদন বাড়বে এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে। সে সঙ্গে রপ্তানি করার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। আর স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় কমবে। এর সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তারাও পাবেন। কৃষি ও খাদ্য খাতেও থাকছে একাধিক প্রণোদনা। কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামালে ভ্যাট প্রত্যাহার, ফল সংরক্ষণে ব্যবহৃত ফ্রুট ব্যাগ তৈরির কাঁচামালের শুল্ক কমানো এবং দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর ছাড়ের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে কাজুবাদাম, উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ এবং পাঙাশ মাছের ফিলেট আমদানিতে শুল্ক ও কর বাড়ানো হচ্ছে। আরও পড়ুন বাজেটে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যে কর ছাড় থাকছে দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, সিসি ক্যামেরা ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালে কর সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও ২০৩১ সাল পর্যন্ত শুল্ক-কর অব্যাহতির প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে ফ্লোট গ্লাস শিল্পের পাঁচটি কাঁচামালের শুল্ক কমানো এবং সিনথেটিক ওভেন ফেব্রিক্সের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমানোর পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ইভি ও ই-বাইক উৎপাদনকারী শিল্পকে কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হবে। নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অগ্রিম আয়কর নির্ধারণ করা হলেও সামগ্রিকভাবে এ খাতকে উৎসাহিত করার দিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্যও থাকছে বড় সুখবর। স্থানীয় পর্যায়ে আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার, অফিস ভাড়া ও সেবা আমদানিতে ভ্যাট অব্যাহতি এবং টার্নওভার ট্যাক্স মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। আরও পড়ুন বাড়ছে উৎসে কর, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ এসএমই খাতে ৫০ লাখ টাকা এবং নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভার করমুক্ত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া জুয়েলারি সেবায় ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে ভরিতে আড়াই হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। কর প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আয়কর রিটার্ন দাখিল, বছরজুড়ে রিটার্ন জমার সুযোগ, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দিলে কর রেয়াত এবং অতিরিক্ত কর্তিত কর ফেরতের ব্যবস্থা চালু হতে পারে। পাশাপাশি রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আরও পড়ুন বাজেট ২০২৬-২৭ / ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিতে চায় সরকার জানা গেছে, দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনে করছাড় সুবিধা আরও ১০ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে। ক্যাশলেস লেনদেনে উৎসাহিত করতে পয়েন্ট অব সেল মেশিনের (পজ মেশিন) আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ এবং আরও সাড়ে ৭ আগাম কর প্রত্যাহার করতে পারে সরকার। মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম, সিসিটিভি ক্যামেরা দেশীয়ভাবে উৎপাদনে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত দিতে পারে সরকার। উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট কমতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ। প্রতি কেজি লিপস্টিক আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য ৪০ থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার নির্ধারণ, প্রতি কেজি লোশন, ফেস ক্রিম, ফেসওয়াস আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য ১০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার নির্ধারণ করার প্রস্তাব করতে পারে সরকার। আরও পড়ুন রপ্তানি ও কৃষিখাতে বাড়তি কর, রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ার শঙ্কা এছাড়া ১১৩টি পণ্যের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করতে পারে সরকার। আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট নেই এমন ২০টি পণ্যে বসতে পারে ১৫ শতাংশ মূসক। কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনের ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট প্রত্যাহার, ফ্রুটব্যাগ তৈরির কাঁচামালের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ, পাঙাশ মাছের ফিলেট আমদানিতে বসছে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক, মৃতদের সংরক্ষণে মর্চুয়ারি আমদানিতে শুল্ক ২৫ শতাংশ কমে হচ্ছে ১ শতাংশ, এপিআই তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও টাগবোটের আমদানি শুল্ক অর্ধেক কমিয়ে ৫% নির্ধারণ করাসহ একাধিক প্রস্তাব করতে পারে সরকার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনবিআরের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, করজাল সম্প্রসারণ এবং ব্যবসা সহজীকরণ-দুই লক্ষ্য সামনে রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। একদিকে ব্যাংক হিসাব ও ব্যবসায়িক লেনদেনকে কর কাঠামোর আওতায় আনা হবে, অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যাপক কর-শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে। আরও পড়ুন সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনা হবে ৪০ ঘণ্টা সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ঘোষিত সুবিধাগুলো বাস্তবায়িত হলে শিল্পায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। তবে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে বাজেটে নাগরিক প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি, সরকারের আয় বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি আনতে হলে আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্ক ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু এসব সংস্কারের সুফল এক বছরের মধ্যে পাওয়া যায় না। এসএম/এমআইএইচএস/এমএমএআর
Go to News Site