Jagonews24
বিদেশে অবৈধভাবে পাচার করা অর্থ পুনরুদ্ধার, পুঁজিবাজার রক্ষা এবং ব্যাংকে ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি ও প্রভাবশালী মহলের ঋণ গ্রহণজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদে ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ কথা বলেন। বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অর্থমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন জটিল পদ্ধতি অবলম্বন করে বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে দেশে বা বিদেশে সঠিক, পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য তথ্য বা প্রতিবেদনের অভাবে পাচার করা অর্থের প্রকৃত ও সঠিক পরিমাণ নিরুপন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে এটা সত্য, বিগত সরকারের আমলে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। এ অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নিয়েছে। আমির খসরু জানান, বিদেশে অবৈধভাবে পাচার করা অর্থ উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্স এর সদস্য সংস্থাগুলো হলো- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টিলিজেন্স সেল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। আরও পড়ুন সংসদে অর্থমন্ত্রী / ৫ ইসলামী ব্যাংক একীভূত ও আমানত সুরক্ষা বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে ঋণখেলাপিদের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা দিয়েছে। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধে অসমর্থ ঋণগ্রহীতাদের ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে বিআরপিডি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, যেসব ব্যাংকে শ্রেণিকৃত ঋণের হার বেশি, সেসব ব্যাংকের জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ নিষ্পত্তি কৌশলসংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) আইনে সংজ্ঞায়িত ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিআরপিডি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ওই নীতিমালার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি শনাক্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে গৃহীতব্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। মানি লন্ডারিংয়ের ১১ মামলায় অগ্রাধিকার অর্থপাচার রোধ এবং অতীতে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমির খসরু বলেন, আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় জাতীয় গুরুত্ব বিবেচনায় ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করেছে। মামলাগুলো হয়েছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবার, নাবিল গ্রুপ, এইচ বি এম ইকবাল এবং সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে। অর্থমন্ত্রী জানান, এসব মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে পুলিশের সিআইডি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল (জেআইটি) গঠন করা হয়েছে। আরও পড়ুন কৃষি-গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ জেআইটির কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত এপ্রিল পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশে ৯ হাজার ৯১৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪৭ হাজার ২৪৯ কোটি ২৩ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া বিদেশে ১৫ হাজার ১১১ কোটি ৯২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত এবং ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করা হয়েছে। আমির খসরু জানান, দেশ ও বিদেশ মিলিয়ে মোট প্রায় ৭৬ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ আদালতের মাধ্যমে সংযুক্ত বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় রায় হয়েছে। এছাড়া অবৈধভাবে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ১০টি রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। মন্ত্রী আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অধীনে একটি স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি ডিভিশন গঠন করা হয়েছে। শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ১২টি প্রতিষ্ঠান নিয়ে তদন্ত করার বিষয়ে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনা এবং আইএফআইসি গ্র্যান্ডেট শ্রীপুর টাউনশিপ গ্রিন জিরো কুপন বন্ড-সংক্রান্ত তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে আজীবন এবং বিএসইসির সাবেক কমিশনার ড. শামসুদ্দিন আহমেদকে পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রমে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ ও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এমওএস/একিউএফ
Go to News Site