Somoy TV
বৈশাখ পেরিয়ে মধুমাস জ্যৈষ্ঠের শেষের দিকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বাজারগুলো ভরে গেছে রসালো ও সুস্বাদু দেশীয় ফলে। এই ফল উৎসবের শুরুতেই রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার, ব্যস্ত সড়কের মোড় ও ফলের আড়তে হাজির হয়েছে বিখ্যাত ও সুমিষ্ট লিচু। কিন্তু লিচুর স্বাদ নেয়ার আগে বেশকিছু বিষয়ে সতর্ক থাকাটা জরুরি বলে মনে করেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।অতুলনীয় স্বাদ, মিষ্টি ঘ্রাণ আর রসালো ফল হওয়ায় সবার কাছেই এক আলাদা আকর্ষণের জায়গা দখল করে রেখেছে লিচু। এবারেও বেশ কয়েক জাতের লিচু বাজারে দেখা যাচ্ছে এবং ঢাকার ক্রেতাদের মনও জয় করেছে এই ফলটি। ঢাকার বাজারে এখন লিচুর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত চায়না থ্রি, চায়না টু, বেদানা ও সবার পরিচিত বোম্বাই জাতের লিচু ঢাকার পাইকারি আড়তগুলোতে আসছে এবং সেখান থেকে তা ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর অলিগলিতে। কেমন দামে চলছে বেচাকেনা ঢাকার বাজারে লিচুর দাম কিছুটা চড়া বলে জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। অবশ্য কেনাকাটায় দামাদামির পারদর্শিতায় কেউ কেউ স্থান ও মানভেদে ২৫০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে লিচু কেনাবেচা করছেন। বিক্রেতারা আকার ও জাতভেদে প্রতি ১০০টি লিচুর দাম ৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত হাঁকছেন। একইভাবে বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল, গুলশান, মিরপুর-১০ গোল চত্বর ও বনানীর মতো এলাকায় লিচু কিছুটা বাড়তি দামে বিক্রি হতে দেখা গেলেও পাইকারি বাজারের আশপাশে দাম কিছুটা কম। তবে এসব লিচু ক্ষতিকর কেমিকেলমুক্ত কিনা—এমন প্রশ্নের উত্তরে বিক্রেতারা 'না' বললেও কেউ কেউ অবশ্য বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। অন্যদিকে ক্রেতাদের মধ্যে লিচুতে কেমিকেল দেযা হয়েছে কিনা, তা নিয়ে তেমন ভাবনা নেই। বরং লিচুর প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ অনেক বেশি। অনেকেই পরিবারের জন্য বেশ আগ্রহ নিয়ে থোকা ধরে লিচু কিনে বাড়ি ফিরছেন। তেমনই একজন ক্রেতা ব্যাংকার মোহাম্মদ সেলিম। যিনি তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর জন্য নিয়মিত লিচু কিনছেন। দু-একদিন পরপরই তিনি লিচু কেনেন বলে জানান। তার সাফ কথা—লিচু তার অত্যন্ত প্রিয় ফল এবং বছরের এত অল্প সময় এই ফলটা পাওয়া যায় বলেই তার দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় প্রতিদিনই লিচু থাকে। আরও পড়ুন: কোন জেলার আম সেরা? রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে লিচু বিক্রি করছেন জাহাঙ্গীর। তার দেয়া তথ্যমতে, বাজারে বর্তমানে সবচেয়ে বড়, আকর্ষণীয় ও প্রিমিয়াম জাতের লিচু হলো চায়না-থ্রি, যা প্রতি ১০০ পিস ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে টক-মিষ্টি স্বাদের রসালো এবং দেখতে অনেকটা চায়না-থ্রির মতো 'বেদানা' জাতের ১০০টি লিচু মিলছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। আর সাধারণ ও আগাম জাতের বোম্বাই ও মাদরাজি লিচুর দাম কিছুটা কম, যা প্রতি ১০০ পিস মিলছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। চায়না থ্রি জাতের লিচু হাতে বিক্রেতা। ছবি ঢাকার মতিঝিল এলাকা থেকে তোলা। ছবি সময় সংবাদ কারওয়ান বাজারে ফলের আড়তের ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর লিচুর ফলন বেশ ভালো হয়েছে এবং চলতি জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়েই ঢাকার বাজারে লিচুর এই জমজমাট বেচাকেনা চলবে। আরও পড়ুন: কত বছরের শিশু দিনে কয়টি লিচু খেতে পারবে? এদিকে টানা কয়েকদিনের বৃষ্টির পর হঠাৎ তীব্র গরম এবং কড়া রোদের কারণে একসাথে অনেক লিচু পাকতে শুরু করেছে। এই অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই বাজারে বর্তমানে লিচুর দাম তুলনামূলক কিছুটা কম রয়েছে; তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে লিচুর দাম আরও বাড়বে বলেও জানান এই পাইকারি লিচু ব্যবসায়ী। লিচুতে কেমিকেলের ব্যবহার ও সতর্কতা দেশের লিচু পরিস্থিতি নিয়ে কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জানান, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২.২ থেকে ২.৩ লাখ মেট্রিক টন লিচু উৎপাদিত হয়। তবে এই সুস্বাদু ফলের মৌসুম ও সংগ্রহ সময়কালের ব্যাপ্তি থাকে মাত্র দুই থেকে তিন সপ্তাহ। স্বল্পস্থায়ী এই মৌসুমকে ঘিরে সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের এক বড় নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা আরও জানান, সম্প্রতি উচ্চ তাপমাত্রা এবং তীব্র খরার মতো বৈরি আবহাওয়ার কারণে অনেকস্থানেই লিচু নষ্ট হয়ে গেছে। এরপরেও এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাকড় ও ছত্রাকের (ফাংগাস) আক্রমণ থেকে ফল বাঁচাতে কিছু কিছু অসাধু উৎপাদনকারী ফল সংগ্রহের ঠিক আগ মুহূর্তে অতি মাত্রায় ক্ষতিকর বালাইনাশক বা পেস্টিসাইড স্প্রে করে থাকেন। আরও পড়ুন: গ্রামের নামেই লিচুর নামকরণ, প্রতিটি বাড়িতেই ঝুলছে থোকায় থোকায় লিচুতে কেমিকেল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ভোক্তাদের জন্য স্বস্তির ও আশার কথা হলো, লিচুর 'সেল্ফ লাইফ' বা সতেজ থাকার মেয়াদ খুব কম হওয়ায় সাধারণত গাছ থেকে পাড়ার বা হার্ভেস্টের পর এটি দীর্ঘসময় সংরক্ষণে নতুন করে কোনো রাসায়নিক উপাদান প্রয়োগ করা হয় না। যা কিছু ঝুঁকি, তা মূলত হার্ভেস্টের আগে ব্যবহৃত অতিরিক্ত পেস্টিসাইডের কারণেই তৈরি হয়। তাই এই বালাইনাশকের বিষক্রিয়া কিছুটা কমিয়ে ফলটি পুরোপুরি নিরাপদ করতে লিচু খাওয়ার পূর্বে, অর্থাৎ খোসা ছাড়ানোর আগেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের পরামর্শ, লিচু খাওয়ার আগে কলের প্রবাহমান পানিতে অন্তত দুই থেকে তিন মিনিট ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে; অথবা আরও নিখুঁত ও বাড়তি সুরক্ষার জন্য এক লিটার পানিতে এক চামচ লবণ গুলিয়ে তাতে লিচুগুলো ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রেখে তারপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে গ্রহণ করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব।
Go to News Site