Somoy TV
কুমিল্লায় রেলক্রসিংগুলো যেন মৃত্যুফাঁদ। অরক্ষিত ক্রসিং, অব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতায় এ জেলায় প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।গত পাঁচ বছরে এই জেলায় বৈধ ও অবৈধ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৫৪ জন নিহত হয়েছেন। তবু ঝুঁকি কমাতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বরং প্রতিদিনই এসব ক্রসিং দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে মানুষ। চলতি বছরের মার্চে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১২ জন। আহত হন আরও অন্তত ১৫ জন। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বুড়িচংয়ের কালিকাপুর এলাকায় একটি অরক্ষিত রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় ট্রেনের ধাক্কায় একটি অটোরিকশা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৭ জন। মাত্র দুইটি ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু যা কুমিল্লার রেলক্রসিংগুলোর ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। জেলাজুড়ে মোট ২১টি গেইটযুক্ত লেভেল ক্রসিং রয়েছে। তবে এর বাইরেও অন্তত ৫৯টি অরক্ষিত ক্রসিং রয়েছে। এসব স্থানে কোনো গেইট নেই, নেই গেইটম্যান। নেই সতর্কতামূলক সিগন্যাল বা নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। আরও পড়ুন: অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাইভেটকার দুমড়ে-মুচড়ে ৪ বন্ধু আহত ফলে এসব পয়েন্টে ট্রেন আসার সময় সম্পর্কে আগাম কোনো ধারণা পান না পথচারী বা যানবাহনের চালকরা। একদিকে দ্রুতগতির ট্রেন, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীন পারাপার- এই সমন্বয়হীন পরিস্থিতিই প্রতিনিয়ত তৈরি করছে প্রাণঘাতী ঝুঁকি। কোথাও কোথাও সিগন্যাল লাইট নেই। কুমিল্লা পদুয়ারবাজার এলাকার রাশেদ নামে যুবক সময় সংবাদকে বলেন, গত দুই বছর ধরে সিগন্যাল লাইট বন্ধ। ট্রেন আসবে না কি যাবে, বোঝা যায় না। এতদিন ধরে সিগন্যাল লাইট অফ হয়ে আছে, অথচ রেল কর্তৃপক্ষের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আবার কোনো কোনো ক্রসিংয়ে গেইটম্যান থাকলেও রয়েছে অব্যবস্থাপনার ছাপ। অভিযোগ রয়েছে, গেইটম্যানরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন না। দোকানদার ইদ্রিস মিয়া সময় সংবাদকে বলেন, গেইটম্যানরা রাতে দায়িত্ব পালন না করে অন্য কাউকে গেইটে দাড় করিয়ে রাখেন। আর নিজেরা ঘুমান। যাদের দাড় করিয়ে দেয়া হয় তারা আবার মাদক সেবন করে। দূর্ঘটনা ঘটবে না কেন বলেন? পরিসংখ্যানেই উঠে আসছে ভয়াবহতা লাকসাম রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে রেলক্রসিং কেন্দ্রিক দুর্ঘটনার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ২০২১ সালে ৪১টি, ২০২২ সালে ৭১টি, ২০২৩ সালে ৬৬টি, ২০২৪ সালে ৬৪টি, ২০২৫ সালে ৭৫টি, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ১৮টি। এসব ঘটনায় মোট ৩৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার ধ্বংস হওয়ার গল্প, অপূর্ণ থেকে যাওয়া জীবনের হিসাব। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রেলওয়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়াই বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ওপর দিয়ে সড়ক নির্মাণ করেছে। ফলে এসব স্থানে পরিকল্পনাহীনভাবে তৈরি হয়েছে অসংখ্য লেভেল ক্রসিং, যার বেশিরভাগই অরক্ষিত। রেলওয়ে সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি লেভেল ক্রসিং পরিচালনার জন্য চুক্তির মাধ্যমে গেইটম্যান নিয়োগের কথা। একটি সাধারণ ক্রসিংয়ে তিনজন এবং স্পেশাল ক্রসিংয়ে ছয়জন গেইটম্যান থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কুমিল্লায় স্থায়ী স্পেশাল গেইট রয়েছে মাত্র দুটি, পদুয়ার বাজার ও বিজয়পুরে। বাকি অধিকাংশ ক্রসিংয়ে নেই কোনো মানবিক বা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আরও পড়ুন: রেললাইনে শুয়ে ছিলেন বৃদ্ধ, ট্রেনে কাটা পড়ে গেল প্রাণ কুমিল্লা রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: মো. আনিসুজ্জামান সময় সংবাদকে বলেন, সড়ক বিভাগ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে সড়ক নির্মাণ করে। তবে কুমিল্লায় বর্তমানে ৫৯টি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং আছে যেখানে কোনো গেইট ও গেইটম্যান নেই। তিনি বলেন, প্রায় সবগুলো সড়ক এলজিইডি রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে নির্মাণ করেছে। এই অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো দূর্ঘটনা ঘটলে রেলওয়ে সেইটার দায় নিবে না। অবশ্যই এই দায় নিতে হবে এলজিইডিকে। কুমিল্লা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মফিজ উদ্দিন সময় সংবাদকে জানান, ‘আমি কুমিল্লায় যোগদান করেছি ৩ মাস আগে। এই বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ২০২৪ সালে জেলার ৩১টি ঝুঁকিপূর্ণ অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সদর দপ্তরে চিঠি দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি আমরা আবার আমাদের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলব।’ কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে এই উদ্যোগ কি শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ? এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতির মাঝখানে পড়ে প্রাণ দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং দ্রুত বন্ধ বা আধুনিকায়ন, এবং বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে এই মৃত্যুর মিছিল থামানো সম্ভব নয়। আরও পড়ুন: দেশজুড়ে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের ছড়াছড়ি, বাড়ছে রেল দুর্ঘটনার ঝুঁকি
Go to News Site