Somoy TV
জীবনটা শহুরে। কিন্তু সেই জীবনও ঠিক যেন জীবন নয়, কীটের মত বেঁচে থাকা। শহরের বস্তিবাসী মানুষের জীবনকে আর ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার উপায় আছে? যেখানে মিলছে না ন্যূনতম মৌলিক অধিকার। স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা সবই নাগালের বাইরে। বলা হচ্ছে নগরীর সকল সুবিধার আড়ালে বেঁচে থাকা বস্তিবাসীদের কথা।ময়মনসিংহ। মহানগরের গর্বও এখন তার। ঝাঁ চকচকে দালান আকাশের সঙ্গে গল্প করে। বিলাসী শপিংমল-রেঁস্তোরা কী নেই এখানে। তবে এই শহরেই প্রায় আড়াইলাখ মানুষ আছেন, যাদেরকে ঠিক যেন দেখা যায় না, মানে দেখতে পায় না কেউ। যাদের গল্প পুরোটাই দুঃখে ভরা। অথচ তারাই শহরের গতি ঠিক রেখেছেন, মুটে-মজুরি করে-রিক্সা ঠেলে, সবজি-আচাড় বিক্রি করে, বাসাবাড়ি গুছিয়ে রাখতে কিংবা হেঁশেলটাও যাদের হাত ছাড়া চলে না। সেই মানুষগুলো কোথায় থাকেন-কেমন থাকেন, নাকি তাদের মানুষের মত স্বাভাবিক জীবন নেই? তারই বা কে খোঁজ রাখে? নগরীর ছত্রিশবাড়ি, বাঁশবাড়ি, থানারঘাটসহ বিভিন্ন কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, একই ঘরে ১০/১২ জনের বসত। এক টয়লেটে অনেক মানুষ। এখানে জীবনটা অন্যরকম। চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবনযাপন তাদের। নগরীর একেকটি বস্তিতে অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে, ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। যেখানে মৌলিক সেবাগুলো এখনো স্বপ্নের মতোই। এখানে প্রতিদিনের লড়াই- স্বাস্থ্যঝুঁকি সুপেয় পানি, স্যানিটেশন আর নিরাপদ বাসস্থানের জন্য। বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তাদের ঘরের চালা ফুটো, বৃষ্টি হলেই পানি পরে ঘরে। বৃষ্টি একটু স্থায়ী হলে ঘরে জমে হাটু পানি। ড্রেনের ময়লা পানি ও ঘরের পানি তখন হয় একাকার। আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে দেশের প্রথম অলিম্পিক কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শুধু কী তাই? এখানকার শিশুরাও নিজেদের নাম লেখাচ্ছে অদৃশ্য মানুষের দলে। স্বপ্ন নেই, শিক্ষাও আটকে যায় জীবনের মতই শৈশবেই। যদিও এখানকার মানুষও জানে মৌলিক অধিকার বলতে কেতাবি কথাগুলো। হয়তো এতো দিনে তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে এসব বিষয় বস্তির মানুষের জন্য নয়। শরীফ নামে এক কিশোর জানায়, ছোটবেলায় স্কুলে ভর্তি হয়েছে সে ঠিকই। তবে ৬ষ্ঠ শ্রেণির বেশি তার পড়া হয় নি তার। সংসারে অভাব অনটনের কারণে কাজে লেগে যেতে হয়েছে তার। বেশিরভাগ পরিবারেই একই অবস্থা। স্কুলে ভর্তি হলেও অভাব-অনটনের কারণে ঝরে পড়ে শিশুরা। ছেলেরা বিভিন্ন কাজে যুক্ত হয়েছে সংসারের খরচ জোগায় আর মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, জানায় অভিভাবকরা। মানবাধিকার কর্মী তৌহিদুজ্জামান ছোটন বলেন, এসব মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিশ্চিত না করতে পারাটা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা। আমাদের বিশ্বাস নতুন সরকার তাদের বিষয়ে নজর দিবে। তাদের অধিকার পূরণে উদ্যোগী হবে। নগর পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল বলেন, চটকদার মেগা প্রকল্প হাতে না নিয়ে, পিপিপি মডেলের মাধ্যমে এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট পাইলট প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঘটাতে হবে বস্তিবাসীর জীবনমানের পরিবর্তন। আরও পড়ুন: ময়মনসিংহে হেলে পড়েছে পাঁচতলা ভবন বস্তিগুলোতে যে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে তা স্বীকার করে নগর প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, একটি সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হওয়ার পরও ন্যূনতম কোনো সুযোগ সুবিধা তাদের বেলায় নেই। আমি সকলের সহযোগিতা নিয়ে তাদের জন্য কাজ করতে চাই। আমি ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রীর কাছে সময় চেয়েছি। তিনি সময় দিলে তাকে বস্তির মানুষগুলোকে দেখাবো। এছাড়া বস্তির জমির মালিক জেলা প্রশাসক। তিনি যদি অনুমতি দেন তাহলে তাদের জন্য নতুন ঘর করার ইচ্ছাও রয়েছে আমাদের। সিটি করপোরেশনের বাজেট না থাকলে বিত্তবানদের কাছে তাদের জন্য সহযোগিতা চাইবো। সিটি করপোরেশনের সমাজসেবা বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ময়মনসিংহ নগরীতে সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ২৯১ টি বস্তিতে বসবাস ৫৯ হাজার ৫১২ টি পরিবারের। এতে মোট জনসংখ্যা রয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭৯ জন।
Go to News Site