Jagonews24
চিকিৎসক সংকট, অপারেশন থিয়েটার অচল এবং দীর্ঘদিন ধরে এক্স-রে মেশিন বন্ধ থাকায় মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ৪ লক্ষাধিক মানুষের জন্য একমাত্র সরকারি এই হাসপাতালটি কার্যত সীমিত সেবায় পরিণত হয়েছে, আর এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা। গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬৩ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৬ সালে এটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয় এবং ২০১৭ সালে নতুন ভবনে চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও জনবল সংকটের কারণে সেই সেবা এখন পূর্ণতা পাচ্ছে না। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মোট ১১৭টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭০ জন, শূন্য রয়েছে ৪৭টি পদ। চিকিৎসকের ৩১টি পদের মধ্যে আছেন ১৮ জন, শূন্য রয়েছে ১১টি। নার্সের ৩০টি পদের মধ্যে ২৯ জন কর্মরত থাকলেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছে মারাত্মক সংকট। ওয়ার্ড বয়, পরিচ্ছন্ন কর্মী, অফিস সহকারী, নিরাপত্তাকর্মী, এক্স-রে টেকনিশিয়ান ও অপারেশন থিয়েটার সংশ্লিষ্ট পদসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শূন্যতা বিরাজ করছে। বিশেষ করে সার্জারি ও এনেস্থিসিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বন্ধ রয়েছে। ফলে ডেলিভারি বা জরুরি অস্ত্রোপচার করাতে আসা রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে তারা বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে অতিরিক্ত খরচে চিকিৎসা নিচ্ছেন। একইভাবে এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় রোগীদের বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে মেশিনসহ লাখ লাখ টাকার আধুনিক সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে ধুলো জমে নষ্ট হচ্ছে। শুধু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান না থাকায় এসব গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু করা যাচ্ছে না। গাংনী উপজেলার বাসিন্দা হাসান রাব্বি বলেন, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে অপারেশন করার সুযোগ থাকলেও সেটি বন্ধ থাকায় আমাদের বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। রোগী সালমা খাতুন জানান, সরকারি হাসপাতালে ডেলিভারি অপারেশন না হওয়ায় আমাদের মতো অসহায় মানুষদের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। কাথুলী ইউনিয়নের সাগর হোসেন বলেন, পা ভেঙে যাওয়ার পর হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কিন্তু এক্স-রে বন্ধ থাকায় বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে এই সেবা চালু থাকলে অনেক কম খরচে চিকিৎসা পেতাম। একই গ্রামের আলেয়া খাতুন বলেন, আমার সিজারিয়ান অপারেশন প্রাইভেট ক্লিনিকে করাতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে হলে খরচ অনেক কম হতো। এভাবে অনেক পরিবার আর্থিক চাপে পড়ছে। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাব ইনচার্জ মাহাবুল হক বলেন, এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এলাকার মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্রুত এই পদে নিয়োগ দিলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আল আজিজ জানান, দীর্ঘদিন সার্জারি ও এনেস্থিসিয়া চিকিৎসক না থাকায় অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব পদে নিয়োগ হলে দ্রুত অপারেশন চালু করা যাবে। গত চার বছরে মাত্র একটি সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে, সেটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে। তিনি আরও বলেন, এক্স-রে মেশিন পরিচালনাকারী টেকনিশিয়ান ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অবসরে যাওয়ার পর থেকেই এই সেবা বন্ধ রয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে। মেহেরপুর-২ (গাংনী) আসনের সংসদ সদস্য মো. নাজমুল হুদা বলেন, সার্জারি ও এনেস্থিসিয়া চিকিৎসক না থাকায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে এক্স-রে কার্যক্রমও টেকনিশিয়ান সংকটের কারণে বন্ধ আছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা চালু করা হোক। অন্যথায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়ে পড়বে। আসিফ ইকবাল/এনএইচআর/এএসএম
Go to News Site