Somoy TV
নতুন শিক্ষাবর্ষ মানেই নতুন সূচনা, নতুন প্রত্যাশা এবং নিজেকে গড়ে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের সময় নয়, বরং ইলম, আমল ও আখলাক এই তিনের সমন্বয়ে নিজেকে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুবর্ণ সময়। তাই নতুন শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।নিয়তে পরিশুদ্ধিনিয়ত সংশোধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মাদরাসা শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইলম অর্জনের উদ্দেশ্য যেন কেবল দুনিয়াবি সাফল্য বা নাম-খ্যাতি না হয়, বরং তা যেন হয় দ্বীনের খেদমত ও আত্মশুদ্ধির জন্য। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।" তাই শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই নিজের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণসুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কোন বিষয়ে দুর্বলতা আছে, কোন বিষয়ে উন্নতি করতে হবে—তা আগে থেকেই নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত শুদ্ধ করা, হিফজের পরিমাণ বাড়ানো, আরবি ব্যাকরণে দক্ষতা অর্জন, কিংবা হাদীস ও ফিকহে গভীর জ্ঞান লাভ করা। লক্ষ্য নির্ধারণ থাকলে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। সময়ের মূল্যায়নসময় ব্যবস্থাপনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন সফল শিক্ষার্থীর অন্যতম গুণ হলো সময়কে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। প্রতিদিনের জন্য একটি রুটিন তৈরি করা উচিত যেখানে নামাজ, তিলাওয়াত, পড়াশোনা, বিশ্রাম, শরীর চর্চা ও ব্যক্তিগত ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকবে। বিশেষ করে ফজরের পর সময়টি পড়াশোনার জন্য অত্যন্ত বরকতময়; এই সময়কে কাজে লাগানো উচিত। আরও পড়ুন: মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ প্রবর্তন করেছিলেন উসমানীয় যে সুলতান আগ্রহের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাপড়াশোনায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বছরের শুরুতে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে, কিন্তু কিছুদিন পরেই সেই আগ্রহ কমে যায়। এটি এড়াতে প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিয়মিত পড়াশোনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত মুতালাআ, তাকরার, মুযাকারা না করলে অর্জিত জ্ঞান দ্রুত ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। উসতাদদের সাথে সুসম্পর্কনিজ উসতাদদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা হচ্ছেন ইলমের পথপ্রদর্শক। তাদের প্রতি সম্মান, আনুগত্য ও আন্তরিকতা শিক্ষার্থীর সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে লজ্জা না পেয়ে শিক্ষকের কাছে জিজ্ঞাসা করা উচিত। এতে ইলম দৃঢ় হয় এবং শিক্ষকের দোয়া লাভ করা যায়। সৎসঙ্গ গ্রহণ করাভালো সঙ্গ নির্বাচন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ভালো সাথী একজন শিক্ষার্থীকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, আর খারাপ সঙ্গ তাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই এমন সাথী নির্বাচন করতে হবে, যারা নামাজে যত্নবান, পড়াশোনায় মনোযোগী এবং চরিত্রে উত্তম। আমল-আখলাকে গুরুত্ব দেয়াআমল ও আখলাকের উন্নয়ন মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য অপরিহার্য। শুধু জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়, সেই জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা এবং সুন্দর চরিত্র গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত নামাজ আদায়, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, এবং সুন্নাহ পাবন্দ জীবনযাপন এসব বিষয়কে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিতে হবে। পাশাপাশি মিথ্যা, গীবত, হিংসা, অহংকার ইত্যাদি খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। নিজের প্রতি সচেতন থাকাশারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। সুস্থ দেহ ছাড়া সুস্থ মস্তিষ্ক গড়ে ওঠে না। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করা উচিত। মানসিক চাপ কমাতে প্রয়োজন হলে বিশ্রাম নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতাপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার শেখা প্রয়োজন। বর্তমান যুগে প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে তা হতে হবে কর্তৃপক্ষ বা উসতাদের তত্ত্বাবধানে। কারণ এর অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই মোবাইল, ইন্টারনেট ইত্যাদি কেবল প্রয়োজনীয় ও উপকারী কাজে ব্যবহার করতে হবে এবং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে নতুন শিক্ষাবর্ষ কেবল একটি নতুন জামাত বা ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার নাম নয়; বরং এটি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার এক মহাসুযোগ। সঠিক নিয়ত, পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আল্লাহর ওপর ভরসা থাকলেই কেবল একজন শিক্ষার্থী ইলম ও আমলের উভয় ক্ষেত্রেই সফল হতে পারে। লেখক: পরিচালক, মাদরাসাতুত দাওয়াহ শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।
Go to News Site