Somoy TV
রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে। পহেলা এপ্রিল থেকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) তাদের সহায়তা তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে কার্যক্রম চালু করবে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের অবস্থানভেদে প্রতিটি পরিবারের পাবলিক রেশনেও পার্থক্য থাকবে। তবে এই নতুন ব্যবস্থাকে রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতারা অবিচার হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হলেও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন।২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় বড় আকারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটে। বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। প্রতি বছর জন্ম নিচ্ছে আরও প্রায় ৩০ হাজার শিশু। এদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ নারী ও শিশু এবং প্রায় ১২ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের বড় রোহিঙ্গা ঢলের সূত্রপাত আসলে ২০১২ সাল থেকেই। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে প্রবেশ করেছে, যার মোট সংখ্যা প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ। ২০১৭ সালে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সব মিলিয়ে তখন রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখে। পরবর্তীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নেয়ায় সংখ্যা আরও বাড়ে। এছাড়া ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি। তবে অনিবন্ধিত আরও রোহিঙ্গা রয়েছেন, যাদের সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই স্থায়ী সমাধান: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তিনি বলেন, ২০১৭ সালের পর আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা গোষ্ঠীর সহায়তায় রোহিঙ্গাদের জন্য বড় আকারের ত্রাণ কার্যক্রম চালু ছিল। যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার (জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান) বার্ষিক বাজেট ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই সহায়তায় ভাটা পড়েছে। ২০২৪ সালের পর থেকে তা আরও কমে গেছে এবং ২০২৫ সালে প্রাপ্ত সহায়তা নেমে আসে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে। চলতি বছরে কত অর্থায়ন পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত নয়, যদিও প্রয়োজন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। মো. মিজানুর রহমান সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে রোহিঙ্গাদের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে এবং পুষ্টিহীনতা বাড়বে। এর ফলে অনেকেই জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে চলে যেতে পারে বা সীমান্তবর্তী অপরাধে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। এরই মধ্যে ক্যাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখা দিয়েছে-চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধ বেড়েছে। ভাসানচরেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। এছাড়া অর্থের অভাবে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হলো প্রত্যাবাসন। তবে প্রায় নয় বছর পেরিয়েও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। বরং নতুন করে অনুপ্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু না হলে এই সংকট নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীকে খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। আগে জনপ্রতি মাসে ১২ ডলারের সমপরিমাণ খাদ্য সহায়তা দেয়া হতো। তবে এখন নতুন ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হচ্ছে। পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে প্রতিটি পরিবারের রেশন। ১ এপ্রিল থেকে এই ভিন্ন হারে রেশন প্রদান শুরু করা হবে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বড় দাতা দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সহায়তা কমে যাওয়ায় অর্থসংকট তৈরি হয়েছে। তাই ডব্লিউএফপি এখন ‘নিড-বেসড’ বা প্রয়োজনভিত্তিক পদ্ধতিতে সহায়তা দিচ্ছে। এতে সীমিত সম্পদের মধ্যে পরিস্থিতি মোকাবিলা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটির সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের পর রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বড় দাতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। মোট সহায়তার অর্ধেকেরও বেশি এসেছে সেখান থেকে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে বৈদেশিক মানবিক সহায়তা কিছুটা কমে গেছে। অর্থসংকটের আরেকটি কারণ হলো ‘নিড-বেসড’ পদ্ধতি চালু করা। এখন পরিবারগুলোর অবস্থার ভিত্তিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। প্রথমত, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষকে মাথাপিছু প্রতি মাসে ৭ ডলার করে দেয়া হবে। দ্বিতীয়ত, প্রায় ৩৩ শতাংশ মানুষ পাচ্ছে ১২ ডলার করে; এর মধ্যে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু-নেতৃত্বাধীন পরিবার বা বয়স্ক সদস্য থাকা পরিবারগুলো অতিরিক্ত ৩ ডলার সহায়তা পেতে পারে। তৃতীয়ত, বাকি ৫০ শতাংশ মানুষকে দেওয়া হচ্ছে মাথাপিছু ১০ ডলার করে। তিনি বলেন, যেসব পরিবারে কর্মক্ষম সদস্য রয়েছে-যারা বিভিন্ন সংস্থা বা এনজিওতে পেইড ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছে কিংবা ক্যাম্পে ছোটোখাটো ব্যবসা করছে-তাদের তুলনামূলক কম সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআরের ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে হঠাৎ অর্থসংকট দেখা দিলে একপর্যায়ে সবার রেশন ৬ ডলারে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে এই নতুন ‘নিড-বেসড’ পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে পরিকল্পিত এবং বাস্তবসম্মত। তবে সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে কিছুটা অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, এনজিও কর্মী ও রোহিঙ্গা কমিউনিটির মাঝি ও ভলান্টিয়ারদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, গত এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা ও বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝানো হয়েছে। আরও পড়ুন: ২০২৪ সালের পর নতুন করে রোহিঙ্গা এসেছে ১ লাখ ৪৪ হাজার তবে রোহিঙ্গা নেতারা আশঙ্কা করছেন, সহায়তা কমে গেলে ক্যাম্পে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে পারে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, রোহিঙ্গারাও মানুষ এবং তাদের প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের প্রয়োজন। তবে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) নতুনভাবে ১২, ১০ ও ৭ ডলারের তিনটি ক্যাটাগরিতে খাদ্য সহায়তা দেয়ার পরিকল্পনা করছে, যা রোহিঙ্গাদের প্রতি অবিচার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, খাদ্য সহায়তায় ঘাটতি দেখা দিলে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ জীবিকার তাগিদে স্থানীয় গ্রামগুলোতে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটবে এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে। জোবায়ের আরও বলেন, এই পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে বাইরে চলে যেতে পারে, যা শুধু স্থানীয় নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়েও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গার অবস্থান কক্সবাজারের উখিয়া এলাকার ক্যাম্পগুলোতে।
Go to News Site