Collector
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ | Collector
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ
Somoy TV

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ

আত্মীয় শব্দটি ‘আত্মা’ থেকে উদ্ভব হয়েছে। অন্তর বা হৃদয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত, এমন যে কোনো ব্যক্তিকে আত্মীয় বলে সম্বোধন করা হয়। যেমন আপন ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান ইত্যাদি। আর আরবি শব্দ রিহমুন থেকেই এ আত্মা বা আত্মীয় শব্দের উৎপত্তি। এজন্য কুরআন ও হাদিসে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে বিশেষ নির্দেশ ও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।আমাদের সমাজে বিভিন্ন সম্পর্ক থেকে আত্মীয়তার এই বন্ধন তৈরি হয়। মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্কিত হলে ভাই-বোন। কিংবা মামা খালা, চাচা, ফুফু। স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত হলে- সন্তান, নাতি,পুতি। অথবা, শ্বশুর-শ্বাশুড়ি ইত্যাদি।  আমাদের সমাজে বিভিন্ন উৎসব -উপলক্ষকে কেন্দ্র করে  আমরা আমাদের বিভিন্ন আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু বাড়িতে বেড়াতে যাই। এই যেমন কেবল ঈদুল ফিতর চলে গেছে। ঈদে আমরা একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করি। আরও ভালো যোগাযোগ বা সম্পর্ক রক্ষায় কারও বাড়িতে মেহমান হই। একইভাবে চাচা মামা ও খালা বাড়ি মেহমান হওয়া। শ্বশুরবাড়ি বেড়ানো ও মেহমান হওয়া ; এই জাতীয় দেখা সাক্ষাৎ ও যোগাযোগই হচ্ছে আত্মীয়তার বন্ধন। সম্পর্কের টানে বা নাড়ির টানে একসঙ্গে একত্র হওয়া। একইভাবে মামা চাচা ফুফাতো খালাতো ভাই-বোন, কাজিন, বন্ধু ; এমন যে কোনো আত্মীয় বাড়িতে মেহমান হওয়া। সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা, যোগাযোগ রক্ষা করা ও খোঁজ খবরের তাগিদেই আসা যাওয়া করা; কথা বলা, যোগাযোগ রাখা ইত্যাদি আত্মীয়-স্বজন বন্ধু ও কলিগের সঙ্গে সম্পর্ককে মজবুত করে। তবে সর্বদা লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, -যার বাড়িতে মেহমান হবো- এমন মেজবানের প্রতি সদয় ও ইনসাফ বজায় রাখা। আত্মীয় যত ঘনিষ্ঠ বা কাছেরই হোক। তার অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রাখা জরুরি। আবেগের বশে কারও প্রতি জুলুম করা যেমন মানানসই নয়। তেমনি বিবেক বোধকে কাজে লাগিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো ও আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানো উচিত।  এমনটা কখনো কাম্য নয় যে, কারও বাড়িতে মেহমান হলাম। লাগাতর তার এখানে থাকতে লাগলাম। চার, পাঁচ দিন হয়ে গেল ; ফেরার কোনো কথা বার্তা নেই। এদিকে মেজবান হয়রান ও চিন্তিত। বেচারা ভয়াবহ আর্থিক সংকটেও পতিত হচ্ছেন। সামর্থ্য ও সাধ্যের বাইরে ব্যয় করে ঋণগ্রস্ত হবার অবস্থা তৈরি হচ্ছে। এমন আচরণ সম্পূর্ণ জুলুম। এভাবে আত্মীয়তার সম্পর্কে বরং আরও ফাটল ধরে।  একইভাবে মেজবান-আত্মীয় প্রদত্ত খাবার আহার ইত্যাদি সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করা। অযথা মন্দ সমালোচনা করা। বিভিন্ন ভুল ত্রুটি খুঁজে বের করা। এ জাতীয় আচরণ সবগুলোই হেয় তুচ্ছ করা এবং হয়রানি করার নামান্তর। আমরা এমন আচরণ সম্পূর্ণ পরিহার করব। সকল শ্রেণির আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ইনসাফ ও দয়াপূর্ণ আচরণ করব। কখনো জুলুম বা বাড়াবাড়িমূলক আচরণ করব না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আত্মীয়তার (সম্পর্ক নষ্ট করা থেকে বিরত থাকার) বিষয়ে'। (সুরা নিসা :০১) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- তোমরা নিকট আত্মীয়, এতিম ও মিসকিনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। নিকট ও দূর প্রতিবেশী, পথচারী, চলার সঙ্গী এবং অধীনস্থ দাসীদের প্রতি অনুগ্রহ করো। (সুরা নিসা: ৩৬) উল্লিখিত আয়াত দুটিতে স্পষ্ট উঠে এসেছে যে, আত্মীয়দের সঙ্গে কেমন আচরণ ও মনোভাব পোষণ করা উচিত। এমনকি দ্বিতীয় আয়াতে প্রতিবেশী পথচারী পথিক ও দাস (বা বাসা বাড়ির কাজের লোকদের) সঙ্গেও 'সদাচরণ' করতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অথচ, আমরা এ জাতীয় বিষয়ে কতই না উদাসীন। হাদিসে মেহমানের সঙ্গে মেজবানের আচরণ সম্পর্কে পরিস্কার নির্দেশনা এসেছে। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে। সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। একইভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।  -সহি বুখারি ও সহি মুসলিম লক্ষ করুন! শুধু মেহমানকে সম্মান ও আত্মীয়তার সম্পর্কে বজায় রাখাই এ বর্ণনাটির মূল আলোচ্য। সুতরাং, আমাদের উচিত হবে, আমরা আমাদের মেহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান করব। আত্মীয়তার সম্পর্ককে অটুট রাখতে সচেষ্ট হবো।  ‎হাদিসে এসেছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে আল্লাহ তায়ালাও বান্দার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আমাদের মধ্যে কে আছেন, যিনি চাইবেন যে, আল্লাহ তায়ালা আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুন। আল্লাহর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক না থাকুক।  হজরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- 'রহিম' অর্থাৎ, আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক আল্লাহর আরশের সাথে ঝুলন্ত রয়েছে। সে বলে, যে ব্যক্তি আমার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবেন। আর যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আল্লাহ তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করবেন।  (সহি মুসলিম)আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। এজন্য এ ব্যাপারে আমাদের সকলকে খুব সচেতন হতে হবে। সাহাবি হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম রা. থেকে বর্ণিত- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, বলেছেন, (আত্মীয়তার সম্পর্ক) ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। হজরত ইবনে আবু উমর রা. সুফিয়ান থেকে  বর্ণনা করেন, অর্থাৎ- আত্মীয়তা ছিন্নকারী। (সহি মুসলিম)‎আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে,  আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার দ্বারা জীবিকার প্রশস্ততা ও দীর্ঘায়ূ লাভ হয়। তবে আমরা কেন আত্মীয়দের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা বৈরী স্বভাব পোষণ করব। যা আমাদের জন্যই ক্ষতিকর হয়। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে কোনো আত্মীয় খারাপ আচরণ করলেও, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব না। এটাই ইসলামের শিক্ষা। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি তার জীবিকার প্রশস্ততা কিংবা দীর্ঘায়ু পছন্দ করে, সে যেন তার আত্মীয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করে।  (সহি মুসলিম) আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে সব ধরনের মন্দ আচরণ ও আত্মীয় -স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে; যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এমন আচরণ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। লেখক: ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর

Go to News Site