Somoy TV
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এ জীবনে আমরা ভালো-মন্দ যা কিছুই করবো, এর প্রতিদান আমরা আখিরাতে পেয়ে যাবো। তবে অনেক সময় ভালো কাজ করেও বান্দা এর যথাযথ প্রতিদান পাবে না।এর কারণ হচ্ছে তার আমল আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়নি। এবং প্রতিদান পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে, নেক আমলটি তাতে উত্তীর্ণ হয়নি। এ জন্য আমাদের জানা থাকা দরকার যে, নেক আমল কীভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট গ্রহণযোগ্য হতে পারে? ভালো কাজ করেও তার যথাযথ প্রতিদান না পাওয়ার প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا (২৩) আর ওরা যা কিছু আমল করেছে, আমি তার নিকট আসবো এবং তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবো। (সূরা ফুরকান :২৩) প্রখ্যাত মুফাসসির ও মুহাদ্দিস হাফেয ইবনে কাসির রহ. (মৃত: ৭৭৪হি.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, وذلك لأنها فقدت الشرط الشرعي، إما الإخلاص فيها، وإما المتابعة لشرع الله. فكل عمل لا يكون خالصا وعلى الشريعة المرضية، فهو باطل. ওই সব লোকের আমল নষ্ট হওয়ার কারণ হল শরীয়তের দৃষ্টিতে আমল কবুল হওয়ার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে, সেসব আমল ওই সব শর্তে উত্তীর্ণ হয়নি। হয়ত সেগুলোতে ইখলাস (তথা: নিয়তের বিশুদ্ধতা) অনুপস্থিত। কিংবা শরিয়তের অনুসরণ অনুপস্থিত। প্রত্যেক নেক আমল যা, বিশুদ্ধ হবেনা ও শরীয়ত সমর্থিতপন্থায় পালিত হবে না, তা বাতিল ও অগ্রহণযোগ্য। (তাফসীরে ইবনে কাসির ৬/১০৩) উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আমরা বুঝলাম, কোনো নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট মাকবুল ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য জরুরি হল বিশুদ্ধ নিয়ত ও এর পদ্ধতিটি সুন্নাহসম্মত ও শরীয়তের নির্দেশিত পন্থায় হওয়া। এ দু’য়ের মিশেলেই আমলটি আল্লাহ তাআলার দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে। শরিয়তের দৃষ্টিকোণে আমলের আধিক্যের চেয়েও আমলটির গুণগতমান অধিক থেকে অধিকতর উন্নত হওয়াই কাম্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ বড় বরকতময় তিনি, যার হাতে (সর্বময়) রাজত্ব এবং তিনি সর্ব বিষয়ে শক্তিমান, যনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম। (সূরা মুলক: (৬৭): ১-২) প্রখ্যাত বুযুর্গ ফুযাইল ইবনে ইয়াজ রহ. (মৃত: ১৮৭হি.) এর ব্যখ্যায় বলেন, {ليبلوكم أيكم أحسن عملا} [هود: ৭] قال: أخلصه وأصوبه فإنه إذا كان خالصا ولم يكن صوابا لم يقبل وإذا كان صوابا ولم يكن خالصا لم يقبل حتى يكون خالصا والخالص إذا كان لله والصواب إذا كان على السنة উত্তম আমল মানে বিশুদ্ধ ও সঠিক আমল। আর কোনো নেক আমল ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা শুদ্ধ ও উৎকৃষ্ট হিসেবে পরিগণিত হবে। আর নেক আমল বিশুদ্ধ হিসেবে তখনই গণ্য হবে, যখন তা কেবল আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের আশায় করা হয়। আর সঠিক তখন হবে, যখন তা শরিয়ত নির্দেশিতপন্থায় ও সুন্নাহ অনুযায়ী পালন করা হয়। (হিলয়াতুল আউলিয়া ৮/৯৫; তাফরিরে বাগাবি ৫/১২৪; আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১৩/৬৬২) আরও পড়ুন: আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ নিয়তের বিশুদ্ধতা এটি নেক আমল গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য মৌলিক শর্ত। তাই তো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,إنما الأعمال بالنية، وإنما لامرئ ما نوى، فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله، فهجرته إلى الله ورسوله، ومن كانت هجرته لدنيا يصيبها أو امرأة يتزوجها، فهجرته إلى ما هاجر إليهগ্ধ“সকল আমল নিয়ত অনুসারেই মূল্যায়িত হয়। আর প্রত্যেকে তা-ই পাবে, যা সে নিয়ত করেছে। ফলে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে (অর্থাৎ তাঁদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য) হিজরত করে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হয়েছে বলেই বিবেচিত হবে। আর যে হিজরত করে, পার্থিব কোনো বিষয় হাসিল করার জন্য, কিংবা কোনো নারীকে বিয়ে করার লক্ষ্যে, তার হিজরতের মধ্য দিয়ে সে কেবল তার উদ্দিষ্ট বিষয়ই হাসিল করতে পারবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯০৭) উপরোক্ত হাদিসের মধ্যে নিয়তের বিশুদ্ধতার অনিবার্যতার কথা বর্ণিত হয়েছে। আর দ্বিতীয় যে বিষয়টি অর্থাৎ আমলটি সুন্নাহ অনুযায়ী ও শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী হওয়ার অনিবার্যতা এ বিষয়ে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,فمن رغب عن سنتي فليس مني যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হয়, সে আমার দলভুক্ত নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০৬৩)প্রসিদ্ধ তাবেয়ি হাসান বসরি রহ. বলেন, عمل قليل في سنة، خير من عمل كثير في بدعة সুন্নাহসম্মত অল্প আমলও বিদআতযুক্ত অধিক আমল থেকে অনেক উত্তম। (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহী, পৃ: ৪৭১) মোটকথা, যে কোনো নেক আমল আল্লাহ তাআলার দরবারে গ্রহণযোগ্য হতে হলে, দু’টি বিষয় অপরিহার্য নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং আমলের কর্মপদ্ধতির বিশুদ্ধতা। এর কোনো একটি ছুটে গেলে কাঙ্খিত ফল হাসিল হবে না। এবং তা আল্লাহ তাআলার দরবারে কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক পন্থায় নেক আমলের তাওফীক দান করুন। লেখক: উস্তাযুল হাদীস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান (বেগম মসজিদ) চাঁদপুর।
Go to News Site