Jagonews24
বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যানের পদ খালি প্রায় এক মাস ধরে। চেয়ারম্যান না থাকায় আটকে আছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মীদের বেতন। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনেও চেয়ারম্যান পদ খালি এক মাস ধরে। শীর্ষস্থানীয় পদ খালি থাকা এই প্রতিষ্ঠান দুটিতে পরিচালনা পর্ষদের বোর্ড সভা হচ্ছে না। নেওয়া যাচ্ছে না নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে রুটিন কার্যক্রম চলমান। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। কারণ আইডিআরএর চেয়ারম্যান এবং সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলেও তা এখনো অনুমোদন দেয়নি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। ফলে এই তিন জায়গায় নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে পারছে না অর্থ মন্ত্রণালয়। আবার যেহেতু এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানরা নিজ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছে, তাই তারাও দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ২ মার্চ আইডিআরএর চেয়ারম্যান পদ থেকে ড. এম আসলাম আলম পদত্যাগ করেন। একই দিন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ও সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে মোহাম্মদ জয়নুল বারী পদত্যাগ করেন। নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে তাদের পদত্যাগ কার্যকর করতে ফাইল তৈরি করে অর্থমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। তবে তাদের পদত্যাগ কার্যকর সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন এখনো পায়নি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ফলে এই তিন জায়গায় নতুন করে চেয়ারম্যান নিয়োগের কার্যক্রমও শুরু করতে পারছে না আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। আরও পড়ুন বিমা কোম্পানির লাইসেন্স নবায়নে জটিলতা, বাড়তি ফি মওকুফের দাবিশেয়ারবাজারে সক্রিয় হচ্ছেন বিদেশিরা, বেড়েছে শেয়ার কেনাজীবন বিমায় বকেয়া দাবির পাহাড়, বিপর্যয়ে ৭ কোম্পানিএ যেন আলাদিনের চেরাগ, ১০ লাখে ২০ দিনে ১৩ লাখ টাকা লাভ! এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, আইডিআরএ, সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান নিজ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। সুতরাং, তারা আর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তবে তাদের পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সংক্রান্ত ফাইল এখনো অর্থ মন্ত্রণালয় পায়নি। এই তিন জায়গায় নতুন চেয়ারম্যানও নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন দেওয়া সংক্রান্ত ফাইল পাওয়া গেলে তারপর নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হবে। তাহলে কি আইডিআরএ, সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অবশ্যই জটিলতা দেখা দিয়েছে। আর তিনটি প্রতিষ্ঠানই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে চেয়ারম্যানের পদ খালি থাকা ভালো নয়। কিন্তু এখানে বর্তমানে আমাদের কিছু করার নেই। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আগের পদত্যাগ করা চেয়ারম্যানদের পদত্যাগ কার্যকর হওয়া সংক্রান্ত ফাইল আসতে হবে, তারপর আমরা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। আগের চেয়ারম্যান নিজ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ায় ও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ না দেওয়ায় বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর কর্মীদের বেতন আটকে গেছে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিআরএর এক কর্মকর্তা বলেন, আইডিআরএর কর্মীদের বেতনের জন্য বোর্ড সভায় অনুমোদন লাগে। চেয়ারম্যান পদ থেকে এম আসলাম আলম পদত্যাগ করার পর আইডিআরএ-তে সরকার নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়নি। আবার কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়নি। ফলে এক মাস ধরে চেয়ারম্যানের পদ খালি। চেয়ারম্যান না থাকায় বোর্ড সভা হচ্ছে না। এতে কর্মীদের বেতনও আটকে গেছে। সোনালী ব্যাংক ও সাধারণ বীমা করপোরেশনে রুটিন কার্যক্রম চললেও পলিসিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না প্রতিষ্ঠান দুটি। এ বিষয়ে সাধারণ বীমা করপোরেশনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করার পর নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে এক মাস ধরে চেয়ারম্যানের পদ খালি। চেয়ারম্যান না থাকায় বোর্ড সভা করা সম্ভব হচ্ছে না। যেসব কমিটির প্রধান চেয়ারম্যান, সেসব কমিটির সভাও হচ্ছে না। বোর্ড সভা না হওয়ার কারণে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। তবে রুটিন কার্যক্রম চলছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের বেতন হয় ব্যবস্থাপনা পর্ষদের অনুমোদনে। ফলে চেয়ারম্যান না থাকলেও কর্মীদের বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না, এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। যোগাযোগ করা হলে সোনালী ব্যাংকের একজন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) জাগো নিউজকে বলেন, চেয়ারম্যান না থাকায় আমাদের কর্মীদের বেতন পাওয়ার বিষয়ে কোনো জটিলতা নেই। তবে চেয়ারম্যান না থাকায় এক মাস ধরে বোর্ড সভা হচ্ছে না। ফলে যেসব বিষয়ে বোর্ডের অনুমোদন লাগে সেসব কাজ হচ্ছে না। মূলত এখন ব্যাংকের রুটিন কার্যক্রম চলছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় আহসান এইচ মনসুরকে। এর পাঁচদিন পর ২ মার্চ আইডিআরএ থেকে এম আসলাম আল, সোনালী ব্যাংক থেকে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী এবং সাধারণ বীমা করপোরেশন থেকে জয়নুল বারী পদত্যাগ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর এই তিনজন তিন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। আসলাম আলম ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আইডিআরএর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। তিনি তিন বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ছিলেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। কিন্তু দেড় বছরের মাথায় থাকে পদত্যাগ করতে হয়। চেয়ারম্যান পদে থাকা অবস্থায় আসলাম আলম বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দেন। তবে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়েছে বিমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে। বিমা কোম্পানিগুলো থেকে বাড়তি অর্থ আদায়ের জন্য নিবন্ধন নবায়ন আটকে রাখা হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এমন আচরণের কারণে বর্তমানে দেশের সব বিমা কোম্পানি আইনতভাবে অবৈধ হয়ে পড়েছে। তিন মাস ধরে দেশের বিমা কোম্পানিগুলো অবৈধভাবে ব্যবসা করছে। এ বিষয়ে গত ৪ মার্চ ‘দেশের সব বিমা কোম্পানি এখন ‘অবৈধ’ শিরোনামে জাগো নিউজে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এখনো কোম্পানিগুলো আইনতভাবে অবৈধ অবস্থায় রয়েছে। দেশের জীবন (লাইফ) ও সাধারণ (নন-লাইফ) বিমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচগুণ বাড়ানো সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয় গত ৪ ফেব্রুয়ারি। এর প্রায় এক মাস পর ‘ব্যক্তিগত অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে ২ মার্চ আইডিআরএ চেয়ারম্যান অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন। গেজেট অনুযায়ী, ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের বিপরীতে ২ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, কোনো কোম্পানি এক কোটি টাকা প্রিমিয়াম আয় করলে পরবর্তী বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য তাকে ২৫ হাজার টাকা ফি দিতে হবে। এরপর ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে হার বাড়িয়ে প্রতি হাজারে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য ৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এই হার ছিল প্রতি হাজারে ১ টাকা। এদিকে সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান জয়নুল বারী এক সময় আইডিআরএর চেয়ারম্যান ছিলেন। সাবেক সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারীকে ২০২২ সালের ১৫ জুন তিন বছরের জন্য আইডিআরএ চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তবে চেয়ারম্যান হওয়ার পর নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচিত হন জয়নুল বারী। এক পর্যায়ে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তিনি আইডিআরএ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর কিছুদিন পর ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে সাধারণ বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পেশাদারত্বের সঙ্গে ব্যাংকটি পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু গত ২ মার্চ আকস্মিকভাবে সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন মুসলিম চৌধুরী। এমএএস/এএসএ/এমএফএ
Go to News Site