Jagonews24
শৈশবের স্মৃতিতে ফিরে গেলে দেখি এক ভিন্ন পৃথিবী, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের এক গ্রামীণ জনপদ, যেখানে কাঁচা রাস্তা, বর্ষার কাদা আর অনিশ্চয়তার মাঝেই মানুষের জীবন চলত। সেই বাস্তবতায়, আমার এক সহপাঠীর বাবা একটি ঘোড়ার গাড়ির মালিক ছিলেন। আধুনিক কোনো যানবাহন ছিল না, সেই গাড়িই ছিল গ্রামের মানুষের প্রধান ভরসা, একটি চলমান জীবনরেখা। এই ঘোড়ার গাড়ির গুরুত্ব ছিল বহুমাত্রিক। এটি শুধু পরিবহনের মাধ্যম ছিল না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। নববিবাহিতা নারী কিংবা অভিজাত পরিবারের নারীদের জন্য এটি ছিল নিরাপদ, শালীন ও গোপনীয় চলাচলের একমাত্র উপায়। সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভেতরে এটি ছিল সম্মান রক্ষার একটি কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু ইতিহাসের এক ক্রান্তিকালে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়, এই সাধারণ বাহনটি এক অসাধারণ মানবিক ভূমিকা গ্রহণ করে। যখন মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য সীমান্তের দিকে ছুটে চলেছে, তখন এই ঘোড়ার গাড়িই হয়ে ওঠে একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও শিশুদের জন্য এটি ছিল বেঁচে থাকার এক বাস্তব উপায়। সেই সময় এই মানুষটি, যাকে আমরা স্নেহভরে ‘দাদা’ বলে ডাকতাম, একজন নীরব নায়ক হয়ে ওঠেন। তিনি কোনো অস্ত্র হাতে নেননি, কোনো স্লোগান দেননি, কিন্তু তিনি মানুষকে বাঁচিয়েছেন। ঘোড়ার পাশে হেঁটে, দিন-রাতের পরোয়া না করে, তিনি মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। তার গাড়ি শুধু শরীর বহন করেনি, বহন করেছে মানুষের ভয়, আশা, স্মৃতি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভার। তিনি থামেননি, না ক্লান্তিতে, না ভয়ে, না প্রতিকূলতায়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা নিরাপত্তা ছাড়াই তিনি তার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এই নীরব, অবিচল প্রয়াসই ছিল সহনশীলতার প্রকৃত রূপ, যেখানে সংগ্রাম আছে কিন্তু অভিযোগ নেই, ক্লান্তি আছে কিন্তু থেমে যাওয়ার ইচ্ছা নেই। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেছে। আজ তার এক ছেলে একই পেশায় যুক্ত, কিন্তু মাধ্যম বদলেছে। এখন তিনি মোটরবাইক চালান, দ্রুত, কার্যকর এবং তুলনামূলকভাবে লাভজনক। কংক্রিটের রাস্তা, আধুনিক যোগাযোগ, সব মিলিয়ে তার জীবন অনেক সহজ হয়েছে। তবু এই পরিবর্তনের গভীরে একটি সূক্ষ্ম ভঙ্গুরতা লুকিয়ে আছে। তার জীবিকা এখন সম্পূর্ণ নির্ভরশীল জ্বালানির ওপর, যা তার নিজের নয়, যা আসে দূর দেশ থেকে। যখন বৈশ্বিক সংকট দেখা দেয়, যখন যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হয়, তখন তার মোটরবাইক থেমে যায়। আর সেই সঙ্গে থেমে যায় তার আয়, তার দৈনন্দিন জীবন, তার পরিবারের নিরাপত্তা। আজ আমরা প্রযুক্তির যুগে বসবাস করছি। সবকিছু দ্রুত, বহির্ভরশীল এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার দ্বারা প্রভাবিত। অতীতের সেই ধীর, স্থায়ী এবং স্বনির্ভর ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা আর সরাসরি চলতে পারি না। কিন্তু সেই সময়ের ভালো দিকগুলো, যেমন স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার, সহনশীলতা এবং নীরব সাহস, আজও কাজে লাগানো যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের মতো তেলের উৎস সীমিত বা বিদেশের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সোলার প্যানেল, বায়োগ্যাস বা ছোট হাইড্রো প্রজেক্টের মাধ্যমে স্থানীয় শক্তির উৎস তৈরি করতে পারে। গরীব দেশগুলো যদি নিজস্ব গবেষণা ও ছোট উদ্যোগে বিনিয়োগ করে, তারা কম খরচে স্থানীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারে, যেমন সোলার কুকার, জলসংরক্ষণ পদ্ধতি বা স্থানীয় কৃষি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও, মানুষ, সমাজ এবং প্রযুক্তি একসাথে কাজ করলে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এভাবে আমরা দ্রুতগতির প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারি, কিন্তু সেই সঙ্গে স্বনির্ভরতা ও সহনশীলতা বজায় রাখতে পারি, যা অতীতের সেই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এই দুই প্রজন্মের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে। অতীতের ব্যবস্থা ধীর, শ্রমসাধ্য, কিন্তু স্থানীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল, একটি টেকসই ও সহনশীল ব্যবস্থা। বর্তমানের ব্যবস্থা দ্রুত, আরামদায়ক, কিন্তু বহির্ভরশীল, তাই তা সহজেই ভেঙে পড়তে পারে। এই বৈপরীত্য কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শনের একটি প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে যেমন, আমরা উন্নয়নের পথে এগোচ্ছি, এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি সম্পূর্ণভাবে বহির্ভরশীল হয়, তবে তা আমাদের ভেতরের শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। একটি সহনশীল সমাজ সেই সমাজ, যা বাহ্যিক চাপ বা সংকটের মাঝেও নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে। একটি টেকসই সমাজ সেই সমাজ, যা নিজের সম্পদ, জ্ঞান ও সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। ঘোড়ার গাড়ি এবং মোটরবাইকের এই গল্প তাই কেবল প্রযুক্তির পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি স্বাধীনতা ও নির্ভরতার, স্থায়িত্ব ও ভঙ্গুরতার এবং মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার গল্প। আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে গতি, প্রযুক্তি ও আর্থিক অগ্রগতির মাধ্যমে পরিমাপ করি। কিন্তু এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো স্থায়িত্ব, সহনশীলতা এবং আত্মনির্ভরতা। একই সঙ্গে আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, ব্যক্তি হোক বা রাষ্ট্র, কারওই একটি মাত্র উৎসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। একজন মানুষের জীবিকা যদি একমাত্র আয়ের উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সংকটের মুহূর্তে তার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে। তেমনি একটি দেশ যদি একটি পণ্য, একটি বাজার বা একটি বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা সহজেই তাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। তাই প্রয়োজন বিকল্প পরিকল্পনা, বহুমুখী আয়ের উৎস, বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি। ঘোড়ার গাড়ি হয়তো ধীর ছিল, কিন্তু তা থামত না। মোটরবাইক দ্রুত, কিন্তু তা থেমে যেতে পারে। এই সরল সত্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। ‘যে উন্নয়ন আমাদের দ্রুত এগিয়ে নেয়, কিন্তু সংকটে থামিয়ে দেয়, তা অগ্রগতি নয়; সত্যিকারের অগ্রগতি সেই পথ, যা ধীরে হলেও আমাদের টিকিয়ে রাখে এবং বিকল্প পথ তৈরি করে।’ রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেনrahman.mridha@gmail.com এমআরএম
Go to News Site