Somoy TV
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে প্রবেশের পর এখন পর্যন্ত আলোচনার বড় অংশই ঘুরপাক খাচ্ছে তেল, গ্যাস এবং জ্বালানি ধাক্কার তীব্রতা নিয়ে। এই উদ্বেগ যথার্থ। কিন্তু আরেকটি ঝুঁকি নীরবে তৈরি হচ্ছে এবং সেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আগেই গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সেটি হলো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ থেকে তৈরি হওয়া খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি।অনেকের কাছে বিষয়টি কিছুটা অযৌক্তিক বা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যকে সাধারণত বিশ্বের শস্যভাণ্ডার হিসেবে দেখা হয় না। ফলে এই অঞ্চলের যুদ্ধ সরাসরি খাদ্য সংকট তৈরি করবে, আপাতদৃষ্টিতে এমনটা মনে নাও হতে পারে। তবে, খাদ্যব্যবস্থা কেবল শস্য উৎপাদন কমে গেলেই নয়, বরং খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো আরও ব্যয়বহুল বা দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠলেও বিপর্যস্ত হয়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং তেলের দাম বেশি থাকে, তাহলে আরও কয়েক কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু খাদ্য মজুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে চলবে না। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে এটি জ্বালানি, সার, সেচ, পরিবহন, বাণিজ্য এবং পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতাকে সংযুক্তকারী একটি বৃহত্তর শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করে। সেই শৃঙ্খলের এক বা দুটি সংযোগ ভেঙে গেলে, ক্ষতিটা প্রথমে নীরবে ছড়িয়ে পড়ে। এর শুরুটা হয় কাঁচামালের উচ্চমূল্য, ক্রমবর্ধমান পরিবহন খরচ এবং কারখানার উৎপাদন মন্থর হওয়ার মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত তা গিয়ে ঠেকে কম ফসল, বেশি দামের খাবার এবং পরিবারের খাদ্যাভ্যাসে কাটছাঁটে; প্রথমে মানে, পরে পরিমাণে। বর্তমান সংঘাত সেই একই ধাঁচ অনুসরণ করছে। কারণটি হলো: বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে গেলেও, আন্তর্জাতিকভাবে বাণিজ্য হওয়া সারের প্রায় ৩০ শতাংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়। আধুনিক কৃষি তিনটি মৌলিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল- নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম। নাইট্রোজেন-ভিত্তিক সার যেমন অ্যামোনিয়া ও ইউরিয়া তৈরি হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। আর ফসফেট সার নির্ভর করে সালফারের ওপর, যা তেল ও গ্যাস পরিশোধনের সঙ্গে যুক্ত। আরও পড়ুন: কী হতে পারে ইরান যুদ্ধের পরিণতি? ফলে, উপসাগরীয় অঞ্চলে বিঘ্ন ঘটলে খাদ্য উৎপাদনে এর প্রভাব শুধু জ্বালানির মাধ্যমে নয়, সারের মাধ্যমেও পড়ে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে নাইট্রোজেন ও ফসফেট সার উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং দাম বাড়ছে। বৈশ্বিক ইউরিয়া বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এখন ঝুঁকির মধ্যে। এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও বিস্তৃতভাবে খাদ্যদ্রব্যের দাম ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। খাদ্যব্যবস্থার প্রতিটি ধাপই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ট্রাক্টর, হারভেস্টার, টিউবওয়েল, ট্রাক ও জাহাজ চলে ডিজেলে। বিদ্যুৎ চালায় কোল্ড স্টোরেজ, মিল এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প। জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রস্তুতির খরচও বাড়ে। উন্নত দেশগুলোতে এটি মূলত মূল্যস্ফীতির সমস্যা। কিন্তু নিম্ন আয়ের দেশে এটি ক্ষুধার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সেখানে মোট পারিবারিক ব্যয়ের ৩৭ শতাংশই খাদ্যে, আর ২৬ শতাংশ ব্যয় হয় বাসস্থান ও জ্বালানিতে। যুদ্ধের কারণে যখন খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন পরিবারের বাজেটে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। লাখ লাখ মানুষের জন্য এর অর্থ দাঁড়ায় মৌলিক খরচ কমিয়ে আনা। বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকিটি এখনই খাদ্য সরবরাহ ভেঙে পড়ার মতো নয়। ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে শস্যবাজার কিছুটা স্বস্তিদায়ক। এটি কিছুটা সুরক্ষা দেয়। তবে খাদ্য সংকট কেবল তখনই শুরু হয় না যখন গুদাম খালি হয়ে যায়। এটি তখনও শুরু হয়, যখন সার পৌঁছাতে দেরি হয়, গ্যাস রেশনিং করা হয়, পরিবহন খরচ বাড়ে, এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলো মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামাল দিতে ব্যর্থ হয়। আরও পড়ুন: যেভাবে ইরানের খারগ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র চলমান যুদ্ধের বিপদ এখানেই। এটি আজকের খাদ্য পরিস্থিতির চেয়ে আগামী মৌসুমের উৎপাদন এবং দরিদ্র মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। আর আঞ্চলিক চিত্র ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনক। উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের খাদ্যের সিংহভাগ আমদানি করে এবং জাহাজ চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে মারাত্মকভাবে ঝুঁকিতে থাকে। এসব দেশের ৮০-৯০ শতাংশ খাদ্যই আমদানিকৃত। তাদের আর্থিক সক্ষমতা বেশি হলেও, রুট বন্ধ হয়ে যাওয়া, বীমা খরচ বেড়ে যাওয়া এবং সরবরাহ বিলম্ব পুরোপুরি সামাল দেয়া সহজ নয়। লেবাননের পরিস্থিতি আরও বেশি নাজুক। যুদ্ধের আগেই তাদের খাদ্য অনিরাপত্তা ছিল তীব্র। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামো ক্ষতি এবং কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ। ইরানের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সমস্যাটি সরাসরি খাদ্য ঘাটতির চেয়ে বেশি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাপ্যতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা। যুদ্ধ পরিস্থিতি মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ যোগ করেছে। পাকিস্তানের জন্য এর প্রভাব অনেকের ধারণার চেয়েও বেশি। দেশটি শুধু এই কারণেই ঝুঁকিতে নেই যে তাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তেল গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি এই কারণেও ঝুঁকিপূর্ণ যে, তাদের খাদ্য উৎপাদন স্বয়ং জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পাকিস্তান গ্যাস ব্যবহার করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে- সার উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালি ব্যবহার। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বা দাম বাড়লে এই তিন ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়। কাতার তার গ্যাস সরবরাহ চুক্তিতে ‘ফোর্স মেজার’ ঘোষণা করায় এশিয়ায় এলএনজির দাম ব্যাপকভাবে বেড়েছে এবং এশিয়াজুড়ে সরকারগুলো এর প্রভাব সামাল দিতে ইতোমধ্যেই হিমশিম খাচ্ছে। ভারতে গ্যাস রেশনিং শুরু হয়েছে, আর বাংলাদেশে সাময়িকভাবে কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এসব ঘটনা দেখায়, কীভাবে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ দ্রুত জ্বালানি বাজার থেকে কৃষিখাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যা প্রায়ই নীতিনির্ধারণী আলোচনায় উপেক্ষিত হয়। যখন সারের দাম বাড়ে, কৃষকরা চাষাবাদ বন্ধ করে দেন না। তারা পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেন। তারা সারের ব্যবহার কমিয়ে দেন, ফসল পরিবর্তন করেন অথবা আরও বেশি ঋণ নেন এবং আশা করেন যে পরবর্তীতে দাম বেড়ে গেলে তা পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়া যেমন- খরা, অতিবৃষ্টি বা তাপপ্রবাহ থাকলে তা সম্ভব হয় না। এই কারণেই খাদ্য সংকট অনেক সময় ধীরে ধীরে তৈরি হয়, তারপর হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। বর্তমান সংঘাতটি ঝুঁকির এক বৃহত্তর পরিসরে নতুন মাত্রা যোগ করছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যেই রয়েছে জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ বাড়লে সরকারগুলোর রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা। তাহলে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর কী করা উচিত? প্রথমত, খাদ্য নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে আলাদা নয়, একই সমস্যার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। স্বল্পমেয়াদে, গুরুত্বপূর্ণ ফসল মৌসুমে সারের জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, ফসফেট সার আগে থেকেই সংগ্রহ করা, এবং খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রস্তুত রাখা জরুরি। মধ্যমেয়াদে, উন্নত বীজ ব্যবস্থা, সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি, সংরক্ষণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির মতো দীর্ঘদিনের অবহেলিত খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সরকারকে স্পষ্টভাবে জনগণের সঙ্গে কথা বলতে হবে। আরও পড়ুন: কাতারের তেলের ট্যাংকারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিম্ন আয়ের অনেক দেশই বৈশ্বিক ধাক্কা প্রথমে অনুভব করে পরিবারের বাজেটে। বর্তমান সংকটও সম্ভবত একই পথ অনুসরণ করবে। এটি শুরু হবে তেল ও গ্যাসের দামের চাপ দিয়ে, তারপর ছড়িয়ে পড়বে সারের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারের ব্যয়ে সংকোচনে। অনেক পরিবারের জন্য তখন মূল প্রশ্ন হবে– খাদ্য ও জ্বালানি ব্যয় মেটানোর পর বাকি খরচ কীভাবে সামাল দেয়া যাবে। সেই কারণেই, যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে খাদ্য নিরাপত্তাকে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। লেখক: ড. আবিদ কাইয়ুম সুলেরি (পাকিস্তানি সমাজনীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়ন কর্মী। তিনি ২০০৭ সাল থেকে পাকিস্তানের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।)সূত্র: জিও নিউজ
Go to News Site