Jagonews24
বর্তমানে বাংলাদেশে হামের প্রকোপ হঠাৎ বেড়েছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের নজর রাখা এবং ঘরোয়া যত্নের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলছিলেন সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাগো নিউজের সহ-সম্পাদক জান্নাত শ্রাবণী। ছবি: শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন জাগো নিউজ: বর্তমানে দেশে হামের প্রকোপ কেন হঠাৎ করে বাড়ছে বলে আপনি মনে করেন?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে এরমধ্যে বেশি যেই সমস্যাটার কারণে হাম বেড়েছে সেটা হচ্ছে গত দুবছরে টিকা দেওয়ার পরিমাণ কমে গেছে। ইপিআই এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে হামের টিকার দেওয়ার পরিমাণ নেমে এসেছে ৫৯ শতাংশে। যা হাম বেড়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ। এছাড়া অনেক শিশু নির্ধারিত সময়মতো হাম-রুবেলা টিকা পাচ্ছে না। বিশেষ করে করোনার সময় স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে। পাশাপাশি টিকা নিয়ে ভুল ধারণা, গুজব এবং সচেতনতার অভাবও একটি বড় কারণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসের কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জাগো নিউজ: হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো কী কী? অনেক সময় সাধারণ জ্বরের সঙ্গে পার্থক্য বোঝা যায় না-এ বিষয়ে কী বলবেন?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: শুরুতে হামের লক্ষণ সাধারণ জ্বরের মতোই মনে হয়। জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এসব দেখা যায়। তবে কয়েকদিন পর মুখের ভেতরে সাদা দাগ (কপলিক স্পট) দেখা যায় এবং এরপর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। তাই জ্বরের সঙ্গে যদি এই লক্ষণগুলো যুক্ত হয়, তখন হামের বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। জাগো নিউজ: কোন বয়সের শিশুরা হামে বেশি ঝুঁকিতে থাকে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষ করে যারা টিকা নেয়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। জাগো নিউজ: হামে আক্রান্ত হলে সবচেয়ে বড় জটিলতাগুলো কী হতে পারে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। এসব জটিলতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। ছবি: শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন জাগো নিউজ: হাম কি বড়দেরও হতে পারে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: অবশ্যই, হাম বড়-ছোট সবাই হতে পারে। তবে বড়দের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছেন গর্ভবতী নারীরা। তাই সবচেয়ে বেশি জরুরি সতর্কতা। জাগো নিউজ: হামের ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় এবং এটি কতটা সংক্রামক?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে বাতাসে ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ অ-টিকাপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারে। জাগো নিউজ: হামের এই ভয়াবহতা কী মহামারিতে রূপ নিতে পারে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: যদি টিকাদানের হার কমে যায় এবং মানুষ সচেতন না হয়, তাহলে এটি মহামারিতে রূপ নিতে পারে। তবে সময়মতো পদক্ষেপ নিলে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। জাগো নিউজ: হামজনিত শিশুমৃত্যু রোধে ‘বাবল সিপ্যাপ’ বলা হচ্ছে, এটি কী এবং কীভাবে কাজ করে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: ‘বাবল সিপ্যাপ’ একটি বিশেষ চিকিৎসা যন্ত্র, যা শ্বাসকষ্টে ভোগা শিশুদের জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছে দিতে সাহায্য করে এবং শিশুকে সহজে শ্বাস নিতে সহায়তা করে। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে এটি জীবনরক্ষাকারী ভূমিকা রাখতে পারে। জাগো নিউজ: একটি শিশু হামে আক্রান্ত হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে হবে, মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। পরিবারের সদস্যদের টিকা নেওয়া আছে কি না সেটাও নিশ্চিত করা জরুরি। আরও পড়ুন: ভরসার নাম চিকিৎসক, চ্যালেঞ্জেরও শেষ নেই যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা জরুরি, অবহেলা নয় অসচেতন জীবনযাপনেই বাড়ছে কিডনি রোগের ঝুঁকি জাগো নিউজ: হামের চিকিৎসায় ঘরোয়া যত্ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ? অভিভাবকদের কী কী করণীয়?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তাই ঘরোয়া যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে বিশ্রাম দিতে হবে, প্রচুর তরল খাবার দিতে হবে, জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে। জাগো নিউজ: কখন বুঝবেন যে শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নিতে হবে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়, খিঁচুনি দেখা দেয়, খুব দুর্বল হয়ে পড়ে, কিছু খেতে না পারে বা জ্বর খুব বেশি বেড়ে যায়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। জাগো নিউজ: টিকা না নেওয়ার ফলে ঝুঁকি কতটা বাড়ে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে হামে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। পাশাপাশি জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। জাগো নিউজ: অনেক অভিভাবক টিকা নিয়ে ভয় পান, এই ভয়ের পেছনে কী ভুল ধারণা কাজ করে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: অনেকেই মনে করেন টিকা দিলে ক্ষতি হতে পারে বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে, যা সঠিক নয়। টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কার্যকর। জাগো নিউজ: সরকারি টিকাদান কর্মসূচি কতটা কার্যকরভাবে হামের প্রতিরোধে ভূমিকা রাখছে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) হাম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিয়মিত টিকাদান ও ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে শতভাগ সফলতা পেতে হলে সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে। জাগো নিউজ: একবার হামে আক্রান্ত হলে কি আবার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: সাধারণত একবার হামে আক্রান্ত হলে শরীরে আজীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবে আর আক্রান্ত হবে না ভেবে নিশ্চিত থাকার কোনো কারণ নেই। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ছবি: শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা ইয়াসমীন জাগো নিউজ: পুষ্টিহীন শিশুদের ক্ষেত্রে হামের ঝুঁকি বা জটিলতা কি বেশি হয়?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: অবশ্যই। পুষ্টিহীন শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, ফলে তারা সহজে আক্রান্ত হয় এবং জটিলতাও বেশি হয়। জাগো নিউজ: গ্রাম ও শহরের মধ্যে হামের সংক্রমণ বা প্রতিরোধে কী ধরনের পার্থক্য দেখা যায়?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: গ্রামে সচেতনতা ও টিকাদানের ঘাটতি বেশি, আর শহরে ঘনবসতির কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়। তাই দুই জায়গায়ই ভিন্ন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাগো নিউজ: অভিভাবকদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী? কীভাবে তারা তাদের সন্তানকে হামের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারেন?ডা. শামীমা ইয়াসমীন: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শিশুকে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সচেতন থাকলেই হামের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। জেএস/
Go to News Site