Jagonews24
ওমানের মরুভূমির বুকে লুকানো স্বপ্নের নীল জগত ‘ওয়াদি দাইকাহ ড্যাম’ পাহাড়। ক্যানিয়ন আর লেকের অপূর্ব মিলনে গড়ে ওঠা প্রকৃতির অনন্য বিস্ময়কর রূপকথার ভ্রমণ। ওমানের প্রকৃতির বুকে লুকিয়ে থাকা অপার্থিব বিস্ময়ের নাম ওয়াদি দাইকাহ ড্যাম। এটি এমন স্থান, যেখানে মরুভূমির রুক্ষতা আর জলের স্নিগ্ধতা একে অপরকে আলিঙ্গন করে সৃষ্টি করেছে স্বপ্নময় দৃশ্যপট। আরব উপদ্বীপের সাধারণ ধারণা হলো বালির সমুদ্র, শুষ্ক পাহাড় আর দিগন্তজোড়া নির্জনতা। কিন্তু সেই ধারণাকে একেবারে পাল্টে দেয় ওয়াদি দাইকাহ ড্যাম। মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজেই এখানে এক নতুন গল্প লিখেছে। মরুভূমির বুক চিরে গড়ে উঠেছে এক নীলাভ হ্রদ, যার সৌন্দর্য চোখে পড়লে মনে হয় যেন আপনি ইউরোপের কোনো নরওয়েজিয়ান ফিয়র্ডে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওমানের রাজধানী মাসকট থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জায়গাটি। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে হলেও খুব বেশি বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একটি ছোট্ট ড্রাইভই আপনাকে পৌঁছে দেবে স্বপ্নময় জগতে; যেখানে পাহাড়, ক্যানিয়ন আর জলের অপূর্ব মিলন আপনাকে মুগ্ধ করে রাখবে দীর্ঘসময়। এই ওয়াদি মূলত একটি শুকনো নদীর খাত বা উপত্যকা, যেখানে প্রায় ১২০টিরও বেশি ছোট ছোট ওয়াদি এসে মিশেছে। বৃষ্টির সময় যেগুলো পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই বৃষ্টির পানিকেই সংরক্ষণ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল ড্যাম বা বাঁধ। ২০১২ সালে উদ্বোধন করা প্রকল্পটি শুধু একটি জলাধারই নয় বরং ওমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জল ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ। প্রায় ৭৫ মিটার উচ্চতার প্রধান ড্যাম এবং ৪৮.৫ মিটার উচ্চতার একটি সহায়ক ড্যাম মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এ বিশাল কাঠামো। পাহাড়ের বুক চিরে নামা পানির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে এ ড্যাম। সেই পানিকে জমিয়ে তৈরি করেছে প্রায় ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল লেক, যার চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার বিস্তৃত অপরূপ প্রাকৃতিক পরিমণ্ডল। আরও পড়ুনপৃথিবীর অপার সৌন্দর্য দেখার গভীর অভিজ্ঞতা আমি যখন প্রথম জায়গাটিতে পা রাখি; তখন সত্যিই বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল—এটা কি সত্যিই মরুভূমির দেশ ওমান? নাকি কোনো ইউরোপীয় দেশের পাহাড়ি লেকের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছি! পানির রং ছিল অবিশ্বাস্য রকমের স্বচ্ছ আর নীলাভ, চারপাশের পাহাড়গুলো যেন সেই পানির আয়নায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি এঁকে দিচ্ছিল। বাতাসে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি যেন প্রকৃতি এখানে সব কোলাহল থামিয়ে দিয়ে শুধু নীরব সৌন্দর্যের গান গাইছে। ড্যামের ওপর দাঁড়িয়ে যখন দূরে তাকাই; তখন দেখতে পাই লেকের বিস্তৃত জলরাশি ধীরে ধীরে পাহাড়ের ভাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হালকা বাতাসে পানির ওপর ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হয়, আর সূর্যের আলো সেই ঢেউয়ের ওপর পড়ে ঝিলমিল করে ওঠে। দৃশ্যটা যেন কোনো চিত্রশিল্পীর ক্যানভাস থেকে উঠে আসা জীবন্ত ছবি। এখানে সময় যেন থমকে যায়, মন চায় শুধু বসে থাকতে, তাকিয়ে থাকতে, আর প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যকে নিজের ভেতরে অনুভব করতে। জায়গাটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয় বরং স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করা হয় সেচের কাজে, বিশেষ করে আশেপাশের ফলের বাগানগুলোতে। ফলে এই ড্যাম একদিকে যেমন পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য, অন্যদিকে স্থানীয় জীবনের সাথেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আরও পড়ুনকৃষকের সন্তানের এভারেস্ট জয়ের মহাকাব্য প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন। কেউ আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে, কেউ আসেন ছবি তুলতে, আবার কেউ আসেন নিঃশব্দে কিছু সময় কাটাতে। পরিবার, বন্ধু কিংবা একাকী ভ্রমণ সব ধরনের মানুষের জন্যই জায়গাটি অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়। সত্যি বলতে, ওয়াদি দাইকাহ ড্যাম এমন একটি জায়গা; যেখানে গেলে মনে হয় প্রকৃতি তার সমস্ত রূপের ভান্ডার খুলে দিয়েছে। মরুভূমির মাঝখানে এমন জলরাশি, এমন শান্ত পরিবেশ—এ যেন বাস্তবের ভেতর লুকিয়ে থাকা স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে একবার নিজের চোখে দেখলে, মনে হয় পৃথিবী এখনো কত অজানা সৌন্দর্যে ভরা। যা আমাদের অপেক্ষায় আছে, শুধু একটু সময় নিয়ে খুঁজে পাওয়ার জন্য। এসইউ
Go to News Site