Jagonews24
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা এবং ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চিত প্রেক্ষাপটে নিজের ব্যক্তিগত অর্থায়ন বা পার্সোনাল ফাইন্যান্স ম্যানেজ করা এখন আর কেবল শৌখিনতা নয়, বরং এটি টিকে থাকার এক অপরিহার্য কৌশল। যুদ্ধের দামামা যখন বাজতে শুরু করে, তখন তার প্রথম আঘাত আসে সাধারণ মানুষের পকেটে। মুদ্রাস্ফীতির করাল গ্রাস এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের এই সময়ে প্রথাগত সঞ্চয় পদ্ধতি আর কার্যকর থাকে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজের অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রথম এবং প্রধান পাঠ হলো চরম রক্ষণশীল হওয়া। আমাদের বুঝতে হবে যে আগামী কয়েক বছর বিশ্ব অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদী মন্দার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যেখানে নগদের চেয়ে সম্পদের মূল্য এবং উপযোগিতা বেশি গুরুত্ব পাবে। তাই বিলাসিতা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ছাঁটাই করে একটি শক্তিশালী আপদকালীন তহবিল বা ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন করা এখন সময়ের দাবি। এই তহবিলটি এমন হতে হবে যা দিয়ে অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছরের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো সম্ভব। মনে রাখতে হবে, যুদ্ধের সময় কর্মসংস্থান এবং আয়ের উৎস যেকোনো সময় বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তাই হাতে পর্যাপ্ত তরল অর্থ থাকা মানসিক প্রশান্তি ও নিরাপত্তার প্রধান উৎস। অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো আয়ের বহুমুখীকরণ। আপনি যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট চাকরি বা ব্যবসার ওপর নির্ভর করে বসে থাকেন, তবে বর্তমানের এই টালমাটাল অবস্থায় আপনি চরম ঝুঁকির মুখে আছেন। প্রযুক্তির এই যুগে ঘরে বসেই বাড়তি আয়ের নানা পথ তৈরি করা সম্ভব। ফ্রিল্যান্সিং, কনসালটেন্সি কিংবা ক্ষুদ্র পরিসরে কুটির শিল্পের মতো উৎপাদনমুখী কাজে নিজেকে নিয়োজিত করলে মূল আয়ের ওপর চাপ কমে আসে। বিশেষ করে যখন ডলারের বাজারে অস্থিরতা চলছে এবং টাকার মান ক্রমাগত কমছে, তখন বৈদেশিক মুদ্রায় আয় করার চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও দূরদর্শিতার সাথে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বড় কোনো কেনাকাটা বা জমি কেনার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যদি মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটে, তবে আপনার হাতে থাকা নগদ টাকাই হবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই হাতের নগদ টাকাকে আগলে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলাই হলো এই সময়ের সেরা ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্র্যাটেজি। পৃথিবী এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কেবল তারাই টিকে থাকবে যারা আজ থেকে মিতব্যয়ী হবে এবং প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখবে। তবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। শেয়ার বাজার বা উচ্চ ঝুঁকির ব্যবসায় বড় অংকের মূলধন খাটানোর আগে দশবার ভাবা উচিত। এর পরিবর্তে সোনা বা স্থাবর সম্পত্তির মতো নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতির সময়েও নিজের মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম। যুদ্ধের ডামাডোলে যখন ব্যাংকিং সিস্টেম বা কাগুজে মুদ্রার ওপর আস্থা কমে আসে, তখন এই ধরণের বাস্তব সম্পদই মানুষের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান অবস্থায় খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তন আনা অর্থ ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ। আমরা অনেকেই খাদ্যের পেছনে আয়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করি, যার মধ্যে অপচয়ও থাকে প্রচুর। ঘরের কোণে বা ছাদে সামান্য পরিমাণ শাকসবজি চাষ করা কেবল শখের বিষয় নয়, বরং এটি আপনার মাসিক বাজার খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিতে পারে। আমদানিনির্ভর বিলাসবহুল পণ্য কেনা থেকে বিরত থেকে দেশীয় পণ্যের দিকে ঝোঁকা এখন দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত সাশ্রয়—উভয় দিক থেকেই জরুরি। এছাড়া বিদ্যুৎ, পানি এবং জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া আবশ্যক। কারণ যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের দাম যখন বাড়ে, তখন তার প্রভাব পড়ে পরিবহণ থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে। নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের বদলে গণপরিবহন ব্যবহার কিংবা ছোট দূরত্বে হেঁটে চলা কেবল শরীর ভালো রাখে না, আপনার পকেটের ওপর চাপও কমায়। ঋণের জাল থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এই সময়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। উচ্চ সুদের ক্রেডিট কার্ড কিংবা ব্যক্তিগত ঋণ এখন আপনার গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই নতুন করে কোনো বড় ঋণ না নেওয়া এবং বর্তমান ঋণগুলো দ্রুত পরিশোধ করার চেষ্টা করাই হবে সর্বোত্তম ফাইন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন। শিক্ষা এবং দক্ষতার পেছনে বিনিয়োগ করাকেও এখন অর্থ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ যেকোনো অর্থনৈতিক সংকটে দক্ষ জনশক্তি সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আপনি যদি আপনার পেশায় অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারেন, তবে মন্দার বাজারেও আপনার চাহিদা থাকবে। পাশাপাশি পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে মিতব্যয়ী হতে শেখানো এবং পারিবারিক বাজেটিংয়ে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। যখন সবাই মিলে সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা করে, তখন কঠিন সময় পার করা অনেক সহজ হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে, অর্থ ব্যবস্থাপনা মানে কেবল টাকা জমানো নয়, বরং টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। অপ্রয়োজনীয় সাবস্ক্রিপশন, বাইরে খাওয়ার প্রবণতা এবং লোকদেখানো সামাজিকতা পরিহার করে সেই অর্থকে ভবিষ্যতের জন্য সরিয়ে রাখা উচিত। মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে টাকার মান যেহেতু কমছে, তাই অলস টাকা ঘরে ফেলে না রেখে এমন জায়গায় রাখা উচিত যেখানে অন্তত মুদ্রাস্ফীতির সাথে তাল মিলিয়ে কিছু মুনাফা আসে। তবে সেই বিনিয়োগ হতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং নির্ভরযোগ্য। পরিশেষে বলতে চাই, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অস্থির না হয়ে ধৈর্য ও দূরদর্শিতার সাথে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বড় কোনো কেনাকাটা বা জমি কেনার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে যদি মুদ্রার ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটে, তবে আপনার হাতে থাকা নগদ টাকাই হবে আপনার সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই হাতের নগদ টাকাকে আগলে রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলাই হলো এই সময়ের সেরা ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্র্যাটেজি। পৃথিবী এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কেবল তারাই টিকে থাকবে যারা আজ থেকে মিতব্যয়ী হবে এবং প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখবে। উৎপাদনের প্রতিটি ক্ষেত্র যেমন রাষ্ট্রকে বাঁচায়, তেমনি ব্যক্তিগত মিতব্যয়িতা ও সঠিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা একজন ব্যক্তিকে যেকোনো দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সম্পদের সঠিক বন্টনই হতে পারে এই ঝোড়ো হাওয়ায় আপনার নৌকার পাল। তাই আবেগের বশবর্তী না হয়ে যুক্তিনির্ভর অর্থ ব্যবস্থাপনাই হোক আপনার যুদ্ধকালীন মূলমন্ত্র। লেখক : কর্পোরেট ট্রেইনার,ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। এইচআর/এএসএম
Go to News Site