Somoy TV
বাগেরহাট জেলা পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ না করে এবং নামমাত্র কাজ দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে খোদ সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এ নিয়ে জেলা পরিষদজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তবে এসব অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাগেরহাট জেলা পরিষদের অধীনে (আরএফকিউ দরপত্র বিজ্ঞপ্তি নং-০২/২০২৫-২৬) ১ থেকে ৬ নম্বর প্যাকেজের কার্যাদেশ দেয়া হয়। দরপত্র অনুযায়ী এসব কাজ শুরুর তারিখ ছিল বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এবং সমাপ্তির তারিখ ছিল মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি)। এক মাসের মধ্যে কাজ করার সিদ্ধান্ত থাকলেও কার্যাদেশে ১০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হয়। মূলত তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে বিল প্রদান ও চেক প্রস্তুত রাখা হয়। প্যাকেজগুলোর মধ্যে রয়েছে: ১ নম্বর প্যাকেজে চিতলমারী ডাকবাংলোর স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক কাজ আধুনিকায়ন এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে আসবাবপত্র সরবরাহ; ২ নম্বর প্যাকেজে ফকিরহাট ও কচুয়া ডাকবাংলোর কক্ষ আধুনিকায়ন; ৩ নম্বর প্যাকেজে রামপাল ডাকবাংলোর কক্ষ আধুনিকায়ন ও জেলা পরিষদের কনফারেন্স কক্ষে সাউন্ড সিস্টেম সরবরাহ; ৪ নম্বর প্যাকেজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন মেরামত; ৫ নম্বর প্যাকেজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস কক্ষ আধুনিকায়ন এবং ৬ নম্বর প্যাকেজে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস কক্ষ রং করা এবং অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ। এই ছয়টি প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য ৬৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রকল্পের কাজ না করেই চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া বাকি তিনটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে চেক হস্তান্তরের অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল আলম, সার্ভেয়ার ইমরানসহ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা তাদের পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে এই কাজ করেন। এ বিষয়ে জানতে গেলে গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল আলম। সরকারি কাজের নীতিমালা অনুযায়ী কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অফিস আংশিক বা সম্পূর্ণ বিল বা চেক প্রদান করতে পারে না। বিল উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। অন্যদিকে খোদ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস কক্ষ আধুনিকায়নে দুটি প্রকল্পে ১৬ লাখ টাকার কাজ না করার বিষয়ে জানতে চাইলে এই প্রকৌশলী দাবি করেন, কাজ করা হয়েছে। কিন্তু তাৎক্ষণিক পাশের রুমে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কাজ করা হয়নি। এ সময় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু রিয়াদ কাজ না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, সহকারী প্রকৌশলী সঠিক তথ্য দেননি। আরও পড়ুন: বাগেরহাটে মাছ চুরির অভিযোগে নির্যাতনে ২ চোখ নষ্ট সরেজমিনে রামপাল ডাকবাংলোর কক্ষ আধুনিকায়নের কাজ দেখতে গিয়ে দেখা যায়, নামমাত্র তিনটি রুম ও একটি সিঁড়ির কিছু অংশ সংস্কার এবং রংয়ের কাজ করা হয়েছে। এ বিষয়ে রামপাল প্রেসক্লাবের সভাপতি এম এ সবুর রানা বলেন, ‘রামপাল ডাকবাংলোর কক্ষ আধুনিকায়ন বলতে যা বোঝায়, তার কোনো কিছুই করা হয়নি। নামমাত্র সিঁড়ির কিছু অংশ সংস্কার ও রংয়ের কাজ হয়েছে। যারা জনগণের অর্থ হাতিয়ে নেয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর নিয়মিত লাইসেন্স রিনিউয়াল দিয়ে আসছি। কিন্তু পরিষদের অসাধু কর্মকর্তারা নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারের লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ না করেই অর্থ তুলে নেন।’ তাদের অভিযোগ, জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল আলম যোগদানের পর থেকে আরএফকিউ কাজের সংখ্যা বেড়েছে। তিনি আসার পর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সব আরএফকিউ কাজ নিজেদের পছন্দের ঠিকাদার দিয়ে করিয়েছেন। এছাড়া একাধিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দের অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এত অনিয়ম থাকলেও জেলা পরিষদের অডিট কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সার্বিক বিষয়ে বাগেরহাট জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘যে প্রকল্পগুলো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্তের জন্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু রিয়াদকে প্রধান করে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
Go to News Site