Somoy TV
বাংলা বছরকে বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার উৎসব ঘিরে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি এখন যেন উৎসবের নগরী। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম এই সামাজিক উৎসবকে ঘিরে শহর থেকে শুরু করে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে এখন সাজ সাজ রব। বাংলা বর্ষকে বিদায় ও বরণ করে নিতে এরই মধ্যে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।সোমবার (৬ এপ্রিল) বিকেলে শহরের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে ৬ দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এর আগে শহরের কলেজ গেট থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। পরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে বেলুন উড়িয়ে ও ফিতা কাটার মধ্য দিয়ে মেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এই উৎসবকে চাকমারা বিজু, ত্রিপুরারা বৈসুক, মারমারা সংগ্রাই, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু এবং অহমিয়ারা বিহু—এমন ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করে থাকেন। প্রায় পক্ষকাল ধরে চলে এই উৎসব। মেলা প্রাঙ্গণে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের তরুণীদের তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক 'রিনাই রিসা' এবং তরুণদের ধুতি, ফতুয়া আর হাতে 'ইয়াগো রুমা লাগো' (এক ধরনের গামছা) পরে ঢোল ও বাঁশির তালে তালে বৃত্তাকার হয়ে ঐতিহ্যবাহী গড়াইয়া নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা যায়। অন্য প্রান্তে জলকেলিতে মেতে ওঠে মারমা সম্প্রদায়। মেলার বিভিন্ন স্থানে কেউ নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বুননে ব্যস্ত, কেউবা আবার করছেন পাজন রান্না। এর পাশাপাশি চলছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন খেলাধুলা। মঞ্চে পরিবেশিত হচ্ছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পাহাড়ের বাংলা বর্ষ বিদায় ও বরণের সব অনুষ্ঠান যেন একসঙ্গে চলছে মেলা প্রাঙ্গণে। মূলত রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় আয়োজিত মেলার উদ্বোধন ঘিরে এসব প্রতীকী আয়োজন করা হয়েছে। মেলার স্টলে স্টলে শোভা পাচ্ছে পাহাড়িদের গহনা ও পোশাক। রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক সব খাবার। পাহাড়ি-বাঙালি সব সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে মেলা প্রাঙ্গণ যেন হয়ে উঠেছে এক টুকরো পার্বত্য চট্টগ্রাম। বিজুর আগেই বিজুর আমেজে উচ্ছ্বসিত পাহাড়ের মানুষ। মেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থী কবিতা চাকমা বলেন, ‘বিজু আমাদের সবচেয়ে বড় সামাজিক অনুষ্ঠান। যা মূলত এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ, তথা চৈত্রসংক্রান্তির দিন পালন করা হয়। এর আগে আমরা ১২ এপ্রিল গঙ্গা দেবীর আরাধনায় নদীতে ফুল ভাসিয়ে থাকি। আজ সেই উৎসবের সূচনা হলো এই মেলার মাধ্যমে। এবার মেলায় এসে বিলুপ্তপ্রায় গড়াইয়া নৃত্য দেখলাম। বিভিন্ন স্টলে আমাদের ঐতিহ্যবাহী গহনা, পোশাকের পাশাপাশি কোমর তাঁতে কাপড় বোনা, পাজন রান্নাসহ বাহারি আয়োজন দেখে খুব ভালো লেগেছে। আশা করছি, এমন আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।’ আলোচনা সভায় রাঙ্গামাটি ৩০৫ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকল বর্ণের, সকল গোত্রের মানুষ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাশাপাশি একে অপরের সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে দেশের জন্য কাজ করবে, আজকের এই দিনে এটাই আমার একমাত্র প্রত্যাশা।’ আরও পড়ুন: ১৩ এপ্রিল যেসব জেলায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করল সরকার রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার বলেন, ‘পার্বত্যাঞ্চলে ১৩ ভাষাভাষীর জাতিসত্তা রয়েছে। তাদের রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ইতিহাস। এটা আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই মেলার মাধ্যমে আমাদের ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যাতে আরও উন্নত হয়, সংরক্ষিত থাকে এবং সবার মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে আমরা এ ধরনের অনুষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করছি। এবার পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতির মাধ্যমে উৎসব পালন করতে পারায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ‘সরকার কাউকে পিছিয়ে রেখে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। আমাদের সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, কোথাও কোনো বৈষম্য থাকবে না। সুতরাং এই পাহাড়ও আর পিছিয়ে থাকবে না। সমতলের সঙ্গে হাতে হাত রেখে সমান গতিতে এগিয়ে যাবে। আর তার জন্য যা যা করা দরকার তা আমাদের সরকার করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের এই বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি আমাদের বড় সম্পদ। অথচ এই মহামূল্যবান সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। এখনও যা টিকে আছে, তা আর হারিয়ে যেতে দেয়া হবে না। আমি বিশ্বাস করি, এমন আয়োজন পাহাড়ের বহুভাষিক ও বহুজাতিক সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।’ সভায় আরও বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ চাকমা, রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব এবং সদর জোন কমান্ডার লে. কর্নেল মো. একরামুল রাহাত। রাঙ্গামাটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ মেলা চলবে আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত।
Go to News Site