Jagonews24
খুলনার মিরেরডাঙ্গা বিভাগীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এখন নিজেই ব্যাধিতে ভুগছে। সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং জনবলের অভাব নিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এ হাসপাতাল। বর্তমানে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে বক্ষব্যাধি চিকিৎসা চলার কারণে এই হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কমেছে। অনেকে বাসায় বসে চিকিৎসা নেওয়ায় হাসপাতালের ইনডোরে রোগী একেবারেই কম। নাগরিক সমাজ বলছে, হাসপাতালের যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। সরকার উদ্যোগ নিলে এই হাসপাতালটি বর্ধিত করে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা সম্ভব। একইসঙ্গে বক্ষব্যাধি চিকিৎসা দেওয়াও সম্ভব। জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ হলে একদিকে জনবল নিয়োগে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং চিকিৎসাসেবার নতুন মাত্রা তৈরি হবে খুলনায়। সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের আবাসিক রুমগুলোর সিলিং থেকে চুন-সুরকি খসে পড়ছে। সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় রয়েছে হাসপাতাল। তুলনামূলক কম রোগী থাকায় পুরো হাসপাতালে সুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। ‘প্রায় দুই মাস ধরে এখানে ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছি। চিকিৎসায় কোনো গাফেলতি নেই। তবে হাসপাতালটির অবস্থা খুবই খারাপ। মাঝে মধ্যে পলেস্তারা খসে পড়ে। আতঙ্কে থাকতে হয়। রাতেতো ভয় লাগে মাথায় আবার ছাদ ভেঙে না পড়ে।’ অন্যদিকে হাসপাতালের জায়গার একটি বিশাল স্থান জুড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত ভবন। গ্যারেজে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স। চারদিকে নেই নিরাপত্তার জন্য কোনো বিশেষ ব্যবস্থা। চিকিৎসক ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলেন, হাসপাতালের দেওয়াল এবং সিলিং সংস্কারের অভাবে বেহাল দশায় রয়েছে। সবাইকে আতঙ্কে থাকতে হয়। একাধিকবার সিলিং থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। অনেক সময় গায়েও পড়েছে অনেকের। এখন পর্যন্ত বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে এমন অবস্থায় থাকলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য শিফট অনুযায়ী ডাক্তার আর নার্সদের থাকতে হয়। কিন্তু চারদিকে নিরাপত্তার অভাবে রাতে অনেক সময় ভীতিকর অবস্থা তৈরি হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের আউটডোরে গড়ে দৈনিক ৭০-৮০ জন রোগী আসে। আর আবাসিকে ৪০-৪৫ জন রোগী থাকে। এখানে চিকিৎসকসহ ১৮৪ মঞ্জুরীকৃত পদের বিপরীতে জনবল আছে মাত্র ১১৬ জন। শূন্য রয়েছে ৬৮টি পদ। বিভাগীয় এ হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে নেই কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। শূন্য রয়েছে ২ জন সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ। ২ জন আবাসিক মেডিকেল অফিসারের মধ্যে আছেন ১ জন, প্যাথলজিস্ট পদ রয়েছে শূন্য, রেডিওলজিস্ট পদও আছে শূন্য, মেডিকেল অফিসার আছেন ৪ জন, উপ সেবা তত্ত্বাবধায়ক পদ রয়েছে শূন্য, নার্সিং সুপার ভাইজারের ৬টি পদের ১টি শূন্য, সিনিয়র স্টাফ নার্সের ৮০টি পদের একটি শূন্য, স্টাফ নার্সের ১০টি পদের তিনটি শূন্য, স্টুয়ার্ড পদও রয়েছে শূন্য, সহকারী সেবিকার ১৭টি পদের ১টি শূন্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিও) পদ রয়েছে শূন্য, অফিস সহায়ক ২৫টি পদের মধ্যে ৬টি রয়েছে শূন্য, বাবুর্চির ৫টি পদের ১টি শূন্য, পরিচ্ছন্ন কর্মীর ১৫টি পদের ৩টি শূন্য রয়েছে। এছাড়া প্রধান সহকারী, হিসাব রক্ষক, ক্যাশিয়ার ও অফিসা সহকারীর পদও শূন্য রয়েছে। ‘হাসপাতালের চারদিকে নিরাপত্তা নেই। প্রায় সময় পরিত্যাক্ত ভবনগুলোতে চুরি হয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে। তবে পরিত্যাক্ত ভবনগুলো অপসারণ করে এখানে আধুনিক চিকিৎসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।’ ভর্তি রোগী জালাল মোল্যা বলেন, ‘প্রায় দুই মাস ধরে এখানে ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছি। চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি নেই। তবে হাসপাতালটির অবস্থা খুবই খারাপ। মাঝে মধ্যে পলেস্তারা খসে পড়ে। আতঙ্কে থাকতে হয়। রাতেতো ভয় লাগে মাথায় আবার ছাদ ভেঙে না পড়ে।’ ১৮ মাস ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন শাহ জাহান শেখ। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাসেবায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু হাসপাতালের সংস্কার দরকার। পুরাতন ভবনগুলোর জায়গায় নতুন ভবন নির্মাণ করা দরকার। প্রায় সময় সিলিং থেকে সিমেন্ট বালি খসে পড়ে। রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় পড়লে আহত হতে হবে। এজন্য মশারি টানিয়ে থাকতে হয়।’ খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল বক্ষব্যাধি রোগের বিশেষ চিকিৎসার জন্য নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে এই হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করতে পারলে চিকিৎসাসেবাও দেওয়া সম্ভব। ফুলবাড়িগেট, দৌলতপুর এবং শিরোমনি ঘিরে এখন অনেক মানুষের বসবাস গড়ে উঠেছে। তাদের খুলনা নগরীতে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়। এখানে চিকিৎসাসেবা দিতে পারলে স্থানীয়দের ভোগান্তি অনেকটা কমানো সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে বর্তমানে রোগী কম থাকায় বিশাল এক কর্মীবাহিনীর অলস সময় কাটাতে হয়। এজন্য কর্মপরিধি বৃদ্ধি করলে দুই দিকেই লাভ হবে সরকারের। বক্ষব্যাধি হাসপাতালকে জেনারেল হাসপাতালে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মীরেরডাঙ্গা বক্ষব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার মুহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, হাসপাতাল সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। তবে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি। ছোট একটি বরাদ্দ পেয়ে গত বছর রং ও ছোট ছোট কিছু কাজ কাজ করানো হয়েছে। তিনি বলেন, ভর্তি এবং বহির্বিভাগের রোগীদের আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দিচ্ছি। তবে জনবল ঘাটতিতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালের চারদিকে নিরাপত্তা নেই। প্রায় সময় পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে চুরি হয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অবগত করা হয়েছে। তবে পরিত্যক্ত ভবনগুলো অপসারণ করে এখানে আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সে সুযোগ রয়েছে। তাহলে চুরি কমবে এবং মানুষকে বক্ষব্যাধির পাশাপাশি অন্যান্য চিকিৎসাসেবা দেয়াও সম্ভব হবে বলে তিনি জানান। এফএ/এএসএম
Go to News Site