Somoy TV
পৃথিবীর বুকে কিছু মানুষ এমন আছেন যারা নিজেদের কৃতকর্ম কিংবা অভিনব কর্মপন্থার কারণে যুগ থেকে যুগান্তরে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। আরো তা যদি হয় একটি জাতির মেরুদন্ড খ্যাত শিক্ষা বিষয়ক-- যেটাকে তিনি যুগোপযোগী ও ফলপ্রসূ করতে দূরদর্শী কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করে জাতিকে সেই ব্যবস্থার প্রতি আহ্বান করে জাতি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখেন তাহলে তো তিনি আরো বেশি স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকেন। এমন একজন সফল স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন বিশ্ববিখ্যাত আরবি সাহিত্যিক, বিদগ্ধ মুহাদ্দিস ও স্বভাব কবি, আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী রহিমাহুল্লাহ।আল্লামা যওক নদভী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ, কক্সবাজারের মহেশখালীতে পিতা আলহাজ সুফি আবুল খাইর ও মাতা রুহ আফজা বেগমের ঘর আলোকিত করে ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সুফি আবুল খাইর একজন দ্বীনদার ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। ওলামায়ে কেরামদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতেন। তিনি শৈশবেই তার মমতাময়ী মাকে হারান। তার বয়স যখন চার কিংবা পাঁচ তখন তার পিতা সুফি আবুল খাইর সপরিবারে ব্যবসায়িক কাজে তৎকালীন বার্মা সফরকালে তার সম্মানিতা মা ইন্তেকাল করেন। মায়ের ইন্তেকালের পর তিনি বাবার পরম দয়া ও স্নেহে বেড়ে উঠেন। তার বাবা তাকে কখনো মাতৃ বিয়োগ বেদনায় ভুগতে দেননি। সদা মাতৃস্নেহ ও পিতৃ ছায়ায় আগলে রেখেছেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাদীক্ষা তার নিজ জন্মভূমি মহেশখালীর বিভিন্ন মাদ্রাসায় সম্পন্ন করেন। তন্মধ্যে নতুন বাজার জামে মসজিদের অধীনে পরিচালিত ফুরকানিয়া মাদ্রাসা, নতুন বাজার কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা ও আশরাফুল উলুম ঝাপুয়া মাদ্রাসা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। নিজ জন্মস্থান মহেশখালীতে প্রাথমিক পড়ালেখা সমাপ্ত করে তৎকালীন মাদ্রাসা জমিরিয়া পটিয়ার ( বর্তমান জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া) মহাপরিচালক আল্লামা আজিজুল হক রহিমাহুল্লার পরামর্শে পিতা সুফি আবুল খাইর আল্লামা যওক নদভীকে পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেন। সেখানে তিনি পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি আরবি, উর্দু ও ফারসি সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। সেখানে তিনি অল্প সময়ে বেশ সুনাম অর্জন করেন। পটিয়া মাদ্রাসায় দীর্ঘ ছয় বছর পড়ালেখা করে আল্লামা যওক নদভী ১৯৫৯ সালে দাওরায়ে হাদিসে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে সনদ অর্জন করেন এবং একাডেমিক পড়াশোনার ইতি টানেন। পরবর্তীতে তিনি হাদিসের উচ্চতর সনদের প্রত্যাশায় বিশ্বের খ্যাতনামা মুহাদ্দিসগণের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হন। তন্মধ্যে পাকিস্তানের আল্লামা ইউসুফ বান্নুরি, আল্লামা আব্দুল্লাহ দরখাস্তি, জাকারিয়া কান্দলভী, বিশ্ব বিখ্যাত আরবি সাহিত্যিক ও বিংশ শতাব্দীর অন্যতম মুজাদ্দিদ ভারতের আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী, আল্লামা মঞ্জুর নোমানী রহিমাহুমুল্লাহ স্ববিশেষ উল্লেখযোগ্য। আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন আল্লামা যওক নদভী কর্মজীবনে চট্টগ্রামের বশরতনগর মাদ্রাসা, নেজামে ইসলাম পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান আল্লামা আতহার আলীর আহবানে কিশোরগঞ্জের জামিয়া এমদাদিয়ায় শিক্ষকতা করেন এবং মহেশখালীর ঝাপুয়া মাদ্রাসা ও চট্টগ্রামের বোয়ালিয়াস্থ হোসাইনিয়া মাদ্রাসায় বিভিন্ন মেয়াদে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি পটিয়া মাদ্রাসার তৎকালীন প্রধান পরিচালক আল্লামা হাজি ইউনুস সাহেবের আহবানে সাড়া দিয়ে তার স্বীয় জ্ঞান মাতুলালয় জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ হন। সেখানে তার রকমারি প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তিনি ছাত্রদের শিক্ষাগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আরবি, বাংলা, উর্দু ও ফারসি সাহিত্য নিয়ে পুরোদমে মেহনত শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি পটিয়া মাদ্রাসায় আরবি ভাষা একাডেমি ও ত্রৈমাসিক আরবি পত্রিকা “আস-সুবহুল জাদীদ” বের করা শুরু করেন। তার এসব সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে ছাত্রশিক্ষক সবাই প্রীত হন এবং তিনি সবার ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্য পাত্রে পরিণত হন। তার সুখ্যাতি মাদ্রাসা পরিমণ্ডল ছাপিয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এসব সৃজনশীল কাজের মধ্যে হঠাৎ তার মনে এক ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তার উদ্রেক হলো—তিনি একটি যুগোপযোগী শিক্ষাধারা প্রণয়ন করে জাতি পরিবর্তনে অংশ নিতে আগ্রহী হয়ে পড়েন। তিনি আরবি, বাংলা, ইংরেজি ও গণিতসহ যুগ চাহিদার আলোকে বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চান। জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মতো প্রাচীন প্রতিষ্ঠানে তার চিন্তার বিকাশ ঘটাতে পারবেন না দেখে দফায় দফায় ইস্তফা দিয়ে চলে আসেন এবং চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে কাসেমুল উলুম নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও তেমন একটা সুফল না পেয়ে অল্প সময়েই তাকে ঐ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিতে হয়। তখন চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসার পরিচালক আল্লামা হারুন বাবুনগরী রহিমাহুল্লার আহবানে আযিযুল উলুম বাবুনগরে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত সেখানে প্রায় চার বছর সুনামের সাথে শিক্ষকতার পর পটিয়া মাদ্রাসার মুরব্বিদের পীড়াপীড়িতে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ায় শিক্ষকতায় ফেরত আসেন। অতপর প্রায় চৌদ্দ বছর শিক্ষকতার পর ১৪০৫হি. তে ২য় দফা ইস্তফা দেন। তিনি পূর্ব থেকেই একটি আদর্শ, যুগোপযোগী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান-এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতেন। পটিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার এ পর্যায়ে এসে তিনি সে প্রয়োজনকে লিখনির মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরেন। কলমের আগায় ফুটিয়ে তোলেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী তার বিখ্যাত সেই প্রবন্ধ ‘মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের ডাক’। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার এই লেখাকে পুঁজি করে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তিনি চাইলে তৎক্ষণাৎ এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতে পারতেন। তবুও তিনি সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে স্বীয় লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ২৬শে শাবান ১৪০৫ হিজরি সনে ২য় বারের মতো ইস্তফা দেন। পটিয়া থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বিচ্ছিন্নতা নিয়ে স্বয়ং তিনি তার জীবনী গ্রন্থ “আমার জীবন কথা”য় লেখেন—“আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া হতে পুনরায় আমার বিচ্ছিন্নতা এবং এর কারণসমূহ; ১৩৮৫ হি. সালের শাবান মাসে একবার আমি আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া থেকে অব্যাহতি নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে (আগ্রাবাদ) মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। যদিও সেবার আমার উক্ত প্রচেষ্টা অনিবার্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে ব্যর্থ হয়। এবার ১৪০৫ হি. সালের শাবান মাসে পুনরায় অব্যাহতি নিই। দু'বারই বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ এই ছিল যে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত শিক্ষা-ক্ষেত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং বড় বড় ব্যক্তিদের লেখা ও বক্তৃতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমার মনে এ আবেগ-আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল যে, আধুনিক যুগের চাহিদানুযায়ী আরবি মাদ্রাসাসমূহের পাঠ্যক্রমে কিছু সংস্কার ও সংযোজন দরকার এবং পাঠ্যক্রম থেকে কিছু অপ্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় অথবা ভাষ্য শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া আমাদের পাঠ্যক্রমে আরবি ব্যাকরণ (সরফ ও নাহব)-এর অনেক বুনিয়াদি কিতাব উদাহরণ ও অনুশীলনী বিহীন রয়েছে। সেগুলোকে উদাহরণ ও অনুশীলনী সুবিন্যস্ত ও সমৃদ্ধ করে আধুনিক যুগের পাঠ্য কিতাবের রীতি অনুযায়ী ঢেলে সাজানো অথবা নতুন রচিত কিতাবসমূহ থেকে এ ধরনের কিতাব নির্বাচন করা দরকার। এবার ইসলামি চিন্তাবিদ হজরত মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভি (আলী মিয়া-রহ. এর সাক্ষাতের কারণে আমার উক্ত আবেগ-আগ্রহে আরও শক্তি সঞ্চারিত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতেই উক্ত বিষয়ে আমি একটি প্রবন্ধ লিখি। সেটি আমার স্নেহাস্পদ অধ্যাপক আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন অনুবাদ করেন। সেই লেখাটি বাংলা সংবাদপত্র দৈনিক আজাদে এবং স্বতন্ত্র পুস্তিকাকারেও প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে এর আরবি অনুবাদও প্রকাশিত হয়। বাংলায় সেটির নাম 'মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের ডাক' এবং আরবিতে دعوة الإصلاح والتطوير في منهاج التعليم দেওয়া হয়। আমি যখনই পাঠ্যক্রমে সংস্কার ও সংশোধনের ধারণা প্রকাশ করি, কোনো কোনো হিংসুকের সুযোগ লাভ হয়। সেই লেখাটিকেই পুঁজি করে আমাকে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া থেকে অপসারণের ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয়। অথচ, আমার পূর্বে মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী রহ. ও এই ডাক দিয়েছিলেন। মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ'জমী রহ. ও নিজের বিভিন্ন লেখায় এই দাওয়াত পেশ করেছিলেন। খতিবে আজম হযরত মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ.ও স্বীয় লেখা ও বক্তৃতায় এ ধারণা প্রকাশ করেছিলেন। আরও পড়ুন: মাওলানা আব্দুল আলী রহ.-এর জীবন ও সংগ্রামের গল্প আমাদের আকাবিরগণের মধ্যে সর্বজনস্বীকৃত অনেক বুযুর্গানেদ্বীন উক্ত প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। শাইখুল ইসলাম হজরত মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ., হজরত মাওলানা কারি মোহাম্মদ তৈয়্যব রহ, প্রাক্তন মুহতামিম, দারুল উলুম দেওবন্দ, ইসলামি চিন্তাবিদ হজরত মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভি রহ. ও মাওলানা মোহাম্মদ তাকি ওছমানী সাহেব প্রমুখের সুস্পষ্ট মতামতসমূহ শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে কাজ সম্পাদনকারীদের জন্য পথের দিশা হিসেবে কাজ করবে”। তাছাড়া তিনি সেখানে বড় বড় মুরব্বিদের সংস্কারধর্মী চিন্তাধারার কথা তুলে ধরেন এবং কোন ব্যক্তি কী কী সংস্কার চান সে বিষয়েও বিস্তর আলাপ করেন। তিনি যে চিন্তাধারা লালন করে চলছেন সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সে লক্ষ্যে তিনি তার একান্ত মুরব্বিদের অন্যতম আল্লামা হারুন বাবুনগরী রহিমাহুল্লার সাথে পরামর্শ করেন এবং তিনি যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান সেখানে ইংরেজির উপর বিশেষ গুরুত্বের কথা বললে তিনি বলেন “ইংরেজি পড়ানো ফরজে কেফায়া”। বিভিন্ন ইলমি সেমিনারে যোগদানসহ বেশ কয়েকবার তিনি ভারত সফর করেন এবং যুগ বিখ্যাত আল্লামা আলী নদভীসহ তৎকালীন বিখ্যাত আলেমদের সুহবত লাভে ধন্য হন। ১৯৮১ সালের এক সফরে যাতে তিনি দুই মাসের অধিক সময় অবস্থান করেছিলেন। সে সফরে আল্লামা আলী নদভী কর্তৃক “নদভী” উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ভারত অবস্থানকালেই বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা। তিনি শুনে অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেন। আলী নদভী রহিমাহুল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠার পর থেকে তিনি তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন এবং বাংলাদেশে তাকে আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন মহলের আমন্ত্রণ ও আল্লামা যওক নদভীর বিশেষ দাওয়াতে ১৯৮৪ সালের ৯ই মার্চ আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী বাংলাদেশ সফরে আসলে যওক নদভী পুরো সময় জুড়ে তার সাথে থাকেন এবং এক পর্যায়ে তিনি তার স্বপ্নের কথা জানিয়ে একটি নামও সাজেস্ট করেন। নামটি ছিলো “মা‘হাদে দারুল মারিফ”। তখন আলী নদভী রহিমাহুল্লাহ নামটি পছন্দ করেন এবং তার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগান। তিনি যে একটি ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে চাচ্ছেন সেই সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহল থেকে নানা কটু কথা ও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তিন সব কটু কথা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে বড়দের পরামর্শে কাজ করতে থাকেন এবং তার চিন্তাধারাকে স্পষ্ট করে বলেন, আমি কোনো তাহরিফ নয় বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা-দীক্ষা অক্ষুণ্ন রেখে প্রয়োজনীয় আধুনিক বিষয়াদি অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে—যেটিকে তিনি ব্যক্ত করেন এভাবে : الجمع بين القديم الصالح والجديد النافع তথা কল্যাণকর পুরাতন ও উপকারী নতুনের সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী শিক্ষাধারা। ১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার হাজিরপুল এলাকায় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম যুগসচেতন, উম্মাহ দরদি, সুচিন্তক মহান ব্যক্তিত্ব, আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী রহিমাহুল্লাহর সুপরামর্শেই তার শিক্ষা বিপ্লবের সূতিকাগার জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে আরবি-বাংলাসহ যুগোপযোগী সিলেবাসে পুরোদমে পড়াশোনা চলতে থাকে। পাশাপাশি “আন-নাদী আস-সাক্বাফী আল-ইসলামী” নামে একটি সাংস্কৃতিক ফোরাম গঠন করে ছাত্রদের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সাপ্তাহিক ও মাসিক সেমিনারের ধারা প্রবর্তন করেন। তার এমন ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তার ফলে অল্প সময়ে দারুল মা‘আরিফের সুখ্যাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বড় বড় মাদ্রাসা, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং বহির্বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ দারুল মা‘আরিফের ছাত্ররা সুনাম ও সুখ্যাতির উচ্চ শিকড়ে অবস্থান করছে। যে সময়ে তিনি জামেয়া দারুল মা’আরিফ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় এক তাহরিকি বন্দোবস্তের জন্ম দিয়েছিলেন তখনও কওমি মাদ্রাসাগুলোতে বাংলা-ইংরেজি পড়া হারাম ছিলো। বলতে গেলে তার এমন সিদ্ধান্তে বৃহত্তর কওমি অঙ্গন তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। তবুও তিনি থেমে যাননি। যুগোপযোগী সিলিবাসে একটা জাতি দাঁড় করাতে নিরলস পরিশ্রম করে গিয়েছেন। কারণ, তিনি সেই মুহূর্তেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, আসন্ন সময়ে শিক্ষাকে যদি যুগের কষ্টিপাথরে যাচাই করে চ্যালেঞ্জ করা না যায়, তবে কেবল কর্মক্ষেত্রেই নয়, বরং জীবনের সর্বক্ষেত্রে টিকে থাকা হবে এক দুরূহ সংগ্রাম। যারা তখন তার তাহরিকি দর্শনকে বুঝতে অক্ষম ছিলেন তারাও ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন এবং দারুল মা‘আরিফকে অনুসরণও করতে শুরু করেছেন। আজ আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভীকে একজন সফল শিক্ষা বিপ্লবী বললে নিঃসন্দেহে অত্যুক্তি হবে না। আরও পড়ুন: জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের কাসেমীর ইন্তিকাল মৃত্যুর পূর্বেই তার গায়ে সফল বিপ্লবের বিজয়ী হাওয়া স্পর্শ করেছে। বিপ্লব সফল করতে যে পরিমাণ অশ্রু তার নয়নযুগল বর্ষণ করেছে; তার দ্বিগুণ জল বোধহয় আনন্দে ঝরেছে। আজ দেশ-বিদেশে কওমি শিক্ষার্থীরা হতাশার বাণী শোনাচ্ছে; কিন্তু, মা’আরিফিরের সানাবিলগুলো আশা ও প্রত্যাশার গল্প বলছে। এই মহান বিপ্লবী, সংস্কারপ্রিয় মনীষী-- আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী ২রা মে ২০২৫ ইংরেজি মোতাবেক ৩রা জিলকদ ১৪৪৬ হিজরি, জুমাবার ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করুন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। সূত্র: আমার জীবন কথা ও জামেয়া দারুল মা’আরিফ আল ইসলামিয়ার প্রাক্তন শিক্ষার্থী মাওলানা রোকন উদ্দিন লিখিত লেখা সংক্ষিপ্ত জীবনী।
Go to News Site