Collector
কালজয়ী দীপ্তিময় কর্মবীর ছিলেন মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা আতহার আলী রহ. | Collector
কালজয়ী দীপ্তিময় কর্মবীর ছিলেন মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা আতহার আলী রহ.
Somoy TV

কালজয়ী দীপ্তিময় কর্মবীর ছিলেন মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা আতহার আলী রহ.

আল্লামা আতহার আলী রহ. ছিলেন একাধারে বরেণ্য আলেম, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক এবং সমাজ সংস্কারের এক নিবেদিতপ্রাণ মহানায়ক। দেওবন্দের আধ্যাত্মিক দর্পণ ও হাকিমুল উম্মত থানভী রহ.-এর আদর্শে গড়া তাঁর জীবন ধর্ম ও রাজনীতির মাঝে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিল। কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া ও শহীদী মসজিদের মতো অমর কীর্তির মাধ্যমে তিনি এ দেশের দীন ও মিল্লাতের তরে যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন, তা চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে।ব্যক্তিত্ব-পরিচয় মুজাহিদে মিল্লাত, শায়খুল ইসলাম আল্লামা আতহার আলী রহ. একটি সুবিদিত নাম, সমুজ্জ্বল বক্তিত্ব। ভারতবর্ষের ধর্মীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও আধ্যাত্মিকতার ময়দানে বিপুলভাবে সাড়া জাগিয়ে যেসব ক্ষণজন্মা মনীষী ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন, তিনি ছিলেন তাঁদের প্রথম সারির একজন। তিনি ছিলেন ইমামুল আসর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি রহ.-এর বিশিষ্ট শাগরিদ, হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর সুযোগ্য খলিফা এবং শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ.-এর রাজনৈতিক শিষ্য। বিপুল কর্মবহুল এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যে ভরপুর ছিল তার জীবন। শরিয়ত ও তরিকতের সফল কাণ্ডারি হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন দেশ ও জাতির একনিষ্ঠ সেবক, আধুনিক উন্নয়নের রূপকার এবং একজন অসাধারণ কর্মবীর ও শিক্ষাবিদ। ধর্ম ও রাজনীতির মাঝে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধনকারী হিসেবে এবং মোল্লা ও মিস্টারকে রাজনীতির একই মঞ্চে ঐক্যবন্ধ করার রূপকার হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব অসামান্য। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের সারাংশ এখানে তুলে ধরা হলো: প্রাথমিক জীবন তার জন্ম ১৩০৯ হিজরি মোতাবেক ১৮৯১ খিষ্টাব্দে কোনো এক জুমা রাতে-তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার থানাধীন ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত ও দীনদার পরিবারে। তাঁর পূর্বপুরুষগণ ছিলেন ইরানি। পিতা মৌলভি আজিম খান, মাতা মোসাম্মৎ আতেরা বিবি। তাঁর পিতা ছিলেন একজন পরহেজগার ও মুত্তাকী ব্যক্তি। তিনি গ্রামের মসজিদে ইমামতি ও মকতবের শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই ও তিন বোন। তাঁর পিতৃপুরুষ ও ভ্রাতৃবৃন্দের সকলেই ছিলেন অত্যন্ত দীনদার ও সুশীলশ্রেণির মানুষ। আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন শিক্ষাজীবন অতি শৈশবে গ্রামের মকতবে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু। মুহতারাম পিতার সযন্ত্র তত্ত্বাবধানে কুরআন শরিফের নাজেরা সমাপ্ত করেন। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন ঝিঙ্গাবাড়ি আলিয়া মাদরাসায়। সেখানে মাওলানা ইবরাহিম তশনা রহ. ও মাওলানা আবদুল বারি রহ.-এর মতো সরল-সহজ ও আধ্যাত্মপ্রাণ বুজুর্গের সুহবতে ধন্য হন এবং আরবি শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায় সমাপ্ত করেন।  মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন মাদরাসায়ে কাসেমিয়া শাহী মুরাদাবাদ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর ও মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে। অতঃপর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য তিনি গমন করেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ মাদারে ইলম দারুল উলুম দেওবন্দে। সেখানকার ইলমি ও আমলি পরিবেশে প্রথিতযশা উলামা-মাশায়েখের একান্ত সুহবতে তাফসির, হাদিস, ফিকাহ, উসূল, দর্শন, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। হাদিস শাস্ত্রে তাঁর উসতাদ ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম, মুহাদ্দিসকুল শিরোমণি আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ.।  এ ছাড়াও শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ., শায়খুল মাকুলাত আল্লামা রাসুল খান হাজরাবী রহ., মাহিরুল মুহাদ্দিস আল্লামা ইবরাহিম বালিয়াবী রহ. ও শায়খুল ফিকহ ওয়াল আদব আল্লামা ইজাজ আলী রহ. প্রমুখের কাছ থেকে ইসলামি ইলম ও ফুনুনের ওপর প্রভূত জ্ঞান অর্জন করেন। আধ্যাত্মিক দীক্ষা দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করে তিনি আত্মশুদ্ধির প্রতি মনোনিবেশ করেন। এ উদ্দেশ্যে বাইয়াত হন চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর পবিত্র হাতে। কঠোর পরিশ্রম ও মুজাহাদার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির নানান স্তর পাড়ি দেন। এরপর ১৩৩৮ হিজরির শাবান মাসে হজরত থানতি কাষতে ইজাজত লাভে ধন্য হন। কথিত আছে যে, হজরত থানভি রহ: তাঁকে খেলাফত প্রদান করে মিষ্টি বিতরণের ব্যবস্থা করেছিলেন। কর্মজীবন জাহেরি ও বাতেনি ইলমে সমৃদ্ধ হওয়ার পর তিনি নিজ দেশে ফিরে আসেন। প্রথমে নিজ গ্রাম ঘুঙ্গাদিয়ায় ইলমে হাদিসের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে সিলেট জেলার প্রাচীন ও বিখ্যাত ঝিঙ্গাবাড়ি আলিয়া মাদরাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতি এতই চমৎকার ও আকর্ষণীয় ছিল, অল্পদিনের মধ্যেই এর সুখ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।  এরপর কুমিল্লা জামিয়া মিল্লিয়ায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। বেশ কিছুদিন সেখানে অবস্থান করেন। অতঃপর নিজ মুরশিদ হজরত থানভী রহ.-এর নির্দেশে পাড়ি জমান কিশোরগঞ্জ। বৌলাই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে আগমন করে সেখানে দাওয়াত-তাবলিগ ও আত্মশুদ্ধির কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিছুদিন থাকার পর মুরশিদের অনুমতি নিয়ে ফিরে যান নিজ দেশে। তারপর আবারো তাঁর মুরশিদের নির্দেশে কিশোরগঞ্জ আসেন। হয়বতনগরের জমিদারবাড়িতে অবস্থান করে চালিয়ে যান দীনি শিক্ষার কার্যক্রম। দাওয়াত ও তাবলিগের ব্যাপক তৎপরতার ফলে অল্পদিনের মধ্যে সকলের শ্রদ্ধেয় হয়ে উঠেন। কিন্তু জমিদারবাড়িতে একটি শরিয়তবিরোধী কাজ সংঘটিত হওয়ায় নিদারুণ মর্মাহত হন। আরও পড়ুন: এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ. ভাঙা মনে হয়বতনগর ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে পড়েন রেলস্টেশনের দিকে। পথিমধ্যে পুরানথানা মসজিদের তাঁর কিছু ভক্ত-মুরিদ তাঁর পথ আগলে দাঁড়ান। কিছুদিন এখানে অবস্থান করার জন্য তাঁরা তাঁকে বিশেষ অনুরোধ জানান। তিনি সাময়িকভাবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে নিজ মুরশিদের কাছে পত্র লিখেন। মুরশিদের পক্ষ থেকে এখানেই স্থায়ীভাবে থাকার নির্দেশপ্রাপ্ত হন। এখান থেকেই তাঁর কর্মবহুল জীবনের সূত্রপাত ঘটে। রাজনৈতিক জীবন পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন নিজ উসতাদ আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ.-এর নির্দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এ সময় তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করেন। সিলেট ও সীমান্ত প্রদেশের রেফারেন্ডাম নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান অপরিসীম। সেখানে ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে ১৯৫০ সালে আদর্শ প্রস্তাব গৃহীত হয়।  ১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনে তিনিও সংগ্রামী ভূমিকা রাখেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য জোরালো দাবি জানান। ১৯৫৩ সালে দেশের উলামা-মাশায়েখ ও দীনদার রাজনীতিবিদদের নিয়ে 'নেজামে ইসলাম পার্টি' নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সেইসঙ্গে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামীলীগ, কৃষকপ্রজা পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি ও নেজামে ইসলাম পার্টির সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্টে শরিক হয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রাদেশিক এসেম্বলির সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।  এতে তাঁর নেতৃত্বে নেজামে ইসলাম পার্টি জাতীয় এসেম্বলিতে ৪ টি এবং প্রাদেশিক এসেম্বলিতে ৩৬ টি আসন লাভ করে। তাঁর দলের পাঁচজন সদস্য শুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী ও স্পিকার নিযুক্ত হন। তিনি নিজেও এমএনএ ও এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে সংবিধানে ইসলামি ভাবধারা সৃষ্টির পেছনে তাঁর ভূমিকা অবশ্যই স্বীকার করার মতো। ইসলামি রাষ্ট্রের ২২ দফা মূলনীতি প্রবর্তনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।  ১৯৬৫ সালের নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঘোরতর বিরোধিতা করেন। এজন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়। ১৯৬৯ সালে গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। জেনারেল ইয়াহইয়া খানের মার্শাল ল'-র মধ্যে সুস্পষ্ট বিরোধিতা করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তাঁর দল নেজামে ইসলাম পার্টি রাজনৈতিক ময়দানে গতিশীল ভূমিকা রাখে। এসময় কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টি প্রায় সকল নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী মনোনয়ন দেন। এছাড়াও মুসলিম জাতিকে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সবধরনের সংকট থেকে উদ্ধার করার জন্য তাঁকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিপ্লবী পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ১৯৫০ সালে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ভারত সরকারকে মুসলিম নির্যাতন বন্ধে বাধ্যকরণ, ১৯৫১ সালে সামাজ্যবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে মুসলিম দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি ব্লক কায়েমের সিদ্ধান্ত প্রভৃতি তাঁর উদ্ধার প্রচেষ্টার প্রকৃত উদাহরণ। সমাজসেবা পাকিস্তান আমলে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে তিনি নিজেকে সমাজসেবায় নিয়োজিত করেন। দেশের উন্নয়ন ও দীনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণে তাঁর ছিল অদম্য উৎসাহ। তাঁর সময়কালে কিশোরগঞ্জ ছিল ধর্ম ও রাজনীতির রাজধানীর মতো। তাঁর অবদানে এ অখ্যাত শহরটি হয়ে ওঠে সুপরিচিত। অনেক মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়।  তাঁর অবদানেই এ শহর বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, পাকা রাস্তাঘাট ও বহুমুখী উন্নয়নের মুখ দেখতে পায়। নরসুন্দা নদীর পরিচ্ছন্ন অভিযানে জামিয়ার ছাত্রদের নিয়ে তিনি নিজে নেমে অংশগ্রহণ করেন। নরসুন্দাকে বন্দর করারও পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। জামিয়ার পাঁচতলা ভবন নির্মাণকালে ছাত্রদের সঙ্গে নিজে ঢালাইয়ে কাজ করেন। সহজ যোগাযোগের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন জামিয়া ইমদাদিয়া পোস্ট অফিস। অমর কীর্তিরাজি তাঁর দীনি ও সামাজিক অবদানের কয়েকটি অমর কীর্তি: জামিয়া ইমদাদিয়া তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল-ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া আদর্শ জাতি গঠন সম্ভব নয়। তাই তিনি ইসলামি আন্দোলনের সিপাহসালারের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে কিশোরগঞ্জ শহরের মূলকেন্দ্রে ১৯৪৫ সালে 'ইমদাদুল উলুম' নামে একটি ছোট মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উন্নত চিন্তাধারা, পূতপবিত্র মানসিকতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের বদৌলতে কয়েক বছরের মধ্যেই একে জামিয়া ইমদাদিয়া নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেন। সেইসময়ে গোটা উপমহাদেশে যা ছিল একটি শীর্ষস্থানীয় দীনি বিদ্যাপীঠ।  তখন তিনি জামিয়ার শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন, যা উপমহাদেশের কওমি অঙ্গনে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অসংখ্য আলেম, মুহাদ্দিস, মুফতি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও ইসলামি চিন্তাবিদ বের হয়ে আসে। শহীদী মসজিদ ১৯৩৮ সালে তিনি পুরানখানা মসজিদের ইমাম ও মোতাওয়াল্লি নিযুক্ত হন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে এটি হয়ে উঠে শহরের প্রধান জামে মসজিদ। তারপর ১৯৪২ সালে শহরের একদল উগ্রপন্থি হিন্দু নামাজের সময় মসজিদের সামনে দিয়ে বাদ্য বাজিয়ে রথযাত্রা নিয়ে যাবার চেষ্টা করে। এতে মুসল্লিরা বাধা দিলে তারা হাঙ্গামা বাধিয়ে দেয়। তখন পুলিশের গুলিতে কয়েকজন মুসল্লি শহিদ হন। এরপর থেকে এটি 'শহীদী মসজিদ'নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। নূর মসজিদ ১৯৭১ সালের পরবর্তী প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি বাসার নিকটে শহরের বড় রাস্তার পাশে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। নাম দেন- নূর মসজিদ। তাঁর দাদাপীর বিশিষ্ট বুজুর্গ মিয়াজি নূর মুহাম্মদ রহ.-এর নামে। এটিই ছিল তাঁর কিশোরগঞ্জ শহরে জীবনের শেষ অবদান। কওমি মাদরাসার শিক্ষাবোর্ড ১৯৬২ সালে তিনি দেশের মাদরাসার প্রধানদের জামিয়ায় দাওয়াত দেন। তাঁদের নিয়ে মজলিস করে কওমি মাদরাসাগুলোর একটি বোর্ড গঠন করেন। নাম দেন-মুতামারে মাদারিসিল কওমিয়া, পূর্বপাকিস্তান। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার কারণে কিছুদিন পর সেটা অবলুপ্ত হয়ে যায়। জামিয়া ইসলামিয়া এর পূর্ব নাম দারুল উলুম মাদরাসা। মোমেনশাহী চড়পাড়ার এ ছোট মাদরাসাটিকে তিনি জামিয়া ইসলামিয়ায় রূপান্তরিত করেন। কয়েক কোটি টাকার প্রকল্প হাতে যখন বিদ্যুৎ বেগে কাজ চালিয়ে যান, তখনই তার চিরবিদায়ের ডাক এসে যায়। এটিই ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ অমর কীর্তি।রচনা ও সংকলনতাঁর নিজস্ব রচনাবলি:১. কুরআন বুঝিবার পথ (বাংলা)২. নেজামে ইসলামের আলোতে (বাংলা)৩. মালফুজাতে হাকিমুল উম্মত (উর্দু)৪. দরসে কাশ্মীরি (উর্দু)তাঁর তত্ত্বাবধানে রচিত ও অনুদিত গ্রন্থাদি:১. পর্দা ও ইসলাম (ইংরেজি)২. আল উজরু ওয়ান নুজরু (উর্দু-বাংলা)৩. ইসলামি শাসন কেন চাই (বাংলা)৪. বাস্তব ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্র (বাংলা)৫. ইসলামের অর্থবণ্টন ব্যবস্থা (বাংলা) তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ও প্রচারিত পত্রিকা-ম্যাগাজিন:১. দৈনিক নাজাত২. সাপ্তাহিক নেজামে ইসলামএ দুটো প্রকাশিত হতো ঢাকা থেকে।৩. মাসিক আল-মুনাদী। এটি প্রকাশিত হতো কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ার প্রকাশনা ও প্রচার বিভাগ থেকে। পারিবারিক জীবন স্ত্রী: তিনি তিনটি বিয়ে করেছিলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। তৃতীয় স্ত্রী তার ইন্তেকাল পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে খেদমত করে গেছেন। সন্তানাদি: প্রথম স্ত্রীর গর্ভে এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে দুই কন্যা ও চার পুত্র জন্মগ্রহণ করে। পুত্র চারজন শৈশবে ইন্তেকাল করেন। কন্যা দুজন তাহেরা ও ফাতেমা। তৃতীয় স্ত্রীর গর্ভে পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে রশিদ নামে এক পুত্র শিশু অবস্থায় ইন্তেকাল করে। বাকি চারজন হলেন-১. আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ., ২. মৌলভি আখতার শাহ রহ., ৩. মৌলভি আশরাফ আলী দা. বা.. ৪. মাওলানা শাব্বির আহমদ রশিদ দা. বা.। কন্যাদের সবারই সুযোগ্য আলেমদের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। ইন্তিকাল ১০ শাওয়াল ১৩৯৬ হিজরি মোতাবেক ৬ অক্টোবর ১৯৭৬ সালে রোজ মঙ্গলবার রাত ৮ টা ৫৫ মিনিটে ৮৬ বছর বয়সে দেশ ও জাতির রাহবার, আরিফবিল্লাহ, মুহিউস সুন্নাহ এ নশ্বর জগতের বন্ধন ছিন্ন করে পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে চিরপ্রস্থান করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন... আরও পড়ুন: মাওলানা আব্দুল আলী রহ.-এর জীবন ও সংগ্রামের গল্প পরদিন বাদ জোহর ময়মনসিংহ ঈদগাহ মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ. কিছু কথা বলতে চাইলেও মানসিক বিপর্যয়ের দরুন দুয়েকটির বেশি কথা বলতে পারছিলেন না। এমতাবস্থায় ময়মনসিংহ বড় মসজিদের ইমাম মাওলানা ফয়জুর রহমান রহ.কে জানাজা পড়ানোর অনুরোধ করা হলে তিনি শাহ সাহেব রহ.-এর এমন অবস্থা দেখে রাজি হলেন। এভাবে এক শায়খে কামেলের জানাজা আরেক শায়খে কামেল পড়ালেন। জানাজার পর তাঁর লাশ নিয়ে আসা হলো জামিয়া ইসলামিয়ায়। হেফজ বিভাগের সামনে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে এ মহান আলমবরদারকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁর কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করুন। আমিন। মুজাহিদে মিল্লাত, শায়খুল ইসলাম আল্লামা আতহার আলী রহ. সত্যিকার অর্থেই একজন যুগস্রষ্টা মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁর বহুমুখী কর্মসাধনা দ্বারা এ দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, তালিমী ও ইসলাহী ময়দানের পূর্ণ একটি শতাব্দীর ইতিহাস বিধৃত হয়েছে। লেখক: সাবেক ছাত্র, জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জ

Go to News Site