Jagonews24
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সামিনা লুৎফা। নাট্যাঙ্গনে তিনি ‘নিত্রা’ নামে পরিচিত। মুহম্মদ আলী হায়দারের নির্দেশনায় ‘খনা’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে শিল্পী হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন তিনি। একইসঙ্গে নাট্যকার হিসেবেও অর্জন করেছেন স্বতন্ত্র পরিচিতি। ‘খনা’ নাটকের শততম প্রদর্শনীকে সামনে রেখে দুদিনের উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। সমাজে খনার প্রভাব ও নারীর অগ্রগতির অন্তরায় কী, সেসব নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন এই শিল্পী। জাগো নিউজ: গল্পটা অনেক পুরোনো, তবু ‘খনা’ নাটকটি এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক? সামিনা লুৎফা: প্রায় ১৫০০ বছর আগের গল্প! এত পুরোনো স্টোরি হওয়ার পরও এই গল্প এখনো প্রাসঙ্গিক। আমরা দেখি নাটকে কথা বলার অপরাধে খনার জিহ্বা কেটে দেওয়া হয়। কথা বলার অপরাধে! আমরা দেখছি নারীরা যখন বলে, বিশেষ করে রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে, তখন অনেক সময় তাদের চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এখনো যখন নারীরা কথা বলে, বিভিন্নভাবে তাদের স্বর স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা আমরা আজও দেখি। এই জায়গাটার সঙ্গে সেই সময়ের ঘটনার একটি স্পষ্ট মিল রয়েছে। দর্শকদের কাছ থেকে আমরা যে প্রতিক্রিয়া পাই, তাতে বোঝা যায়, আজকের নারীরাও এই নাটক থেকে অনুপ্রেরণা পান। এটি তাদের লড়াইয়ের শক্তি যোগায়। এত কিছু ঘটার পরও খনা কিন্তু পিছিয়ে যায়নি। সেই জায়গা থেকেই নারীরা খনার কাছ থেকে শক্তি পায়, লড়াই চালিয়ে যাওয়ার রসদ পায়। জাগো নিউজ: নাটক কি ব্যক্তিজীবনে কোনো প্রভাব ফেলে?সামিনা লুৎফা: আমার মনে হয়, অবশ্যই প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে যারা এতে অভিনয় করেন তাদের জীবনে এর প্রভাব আরও বেশি। আমি নিজেই এই নাটকের সঙ্গে ২০০১ সাল থেকে যুক্ত। এই দীর্ঘ সময়ে আমার কথা বলার ধরন, চিন্তাভাবনা, এমনকি প্রতিবাদী হয়ে ওঠার পেছনেও এই নাটকের চরিত্রগুলো বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক কিছুই আমি চরিত্রের ভেতর থেকে শিখেছি। পাশাপাশি, আমার পরিচিত অনেক অ্যাক্টিভিস্ট আছেন, যারা আমাকে অনুপ্রাণিত করেন। তারা বিশ্বাস করেন, কথা বলা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সবসময়ই থাকবে, কিন্তু আমাদের কথা বলতে হবে। আমাদের আগের প্রজন্মের নারীরা কথা বলেছেন বলেই আজ আমরা কিছু অধিকার পেয়েছি। তাই আমরা যদি আমাদের অবস্থান থেকে কথা বলে যাই, তাহলে আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ও সমানাধিকারের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে। জাগো নিউজ: নারীরা এখনো অনেক বাধার মুখে পড়েন। কোন কোন জায়গা থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করেন?সামিনা লুৎফা: প্রথমত, নারীর সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আমাদের সংবিধানে সমান অধিকারের কথা বলা আছে, আন্তর্জাতিক অনেক চুক্তিতেও আমরা স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু বাস্তবে সেই অধিকার সব জায়গায় নিশ্চিত হয় না। এই বিষয়টি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নারীর নিজের আয়ের ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বল্পশিক্ষিত বা শ্রমজীবী অনেক নারীর ক্ষেত্রে দেখা যায় তাদের উপার্জিত অর্থ বাবা, স্বামী বা ভাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এই বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এছাড়া, নারীর বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। জেন্ডার বৈষম্য এখনো বড় একটি সমস্যা, যা মূলত পরিবার থেকেই শুরু হয়। তাই পরিবার থেকেই সমতা ও সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সমাজে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দরকার। যেমন যৌতুক প্রথা বন্ধ করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা এবং নারীর শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। শিক্ষার পাশাপাশি নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়াতে হবে, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে। জাগো নিউজ: আমাদের মঞ্চনাটক কি যুগোপযোগী হতে পেরেছে?সামিনা লুৎফা: মঞ্চনাটক অনেক ক্ষেত্রে এগুলেও এখনো পুরোপুরি এখনকার যুগোপযোগী হতে পারেনি। এর পেছনে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের দেশের অধিকাংশ অভিনেতা ও কলাকুশলী পারিশ্রমিক পান না। ফলে কাজটা পেশাদার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। আমরা অনেকেই মূল পেশা হিসেবে অন্য কাজ করি, অফিস শেষ করে তারপর মঞ্চে সময় দিই। কিন্তু মঞ্চনাটক তো একটি সাধনার জায়গা। এখানে ভালো করতে হলে সর্বক্ষণিকভাবে যুক্ত থাকা দরকার। সেই সুযোগ না থাকায় প্রফেশনাল মান অনেক সময় কমে যায়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো অবকাঠামো। নিয়মিত মহড়ার জন্য উপযুক্ত জায়গার অভাব রয়েছে। অনেক জেলায় শিল্পকলা একাডেমি থাকলেও সেগুলোর অবস্থা ভালো নয়। আলো, মঞ্চ বা অন্যান্য সুবিধা যথেষ্ট নয়, অনেক জায়গা ভেঙেচুরে গেছে। আবার কিছু নতুন জায়গা তৈরি হলেও সেগুলো দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে মানুষ সেখানে যেতে আগ্রহ পায় না। জাগো নিউজ: কিন্তু সরকার তো এসবের পেছনে বেশ কিছু ব্যয় করেছিল?সামিনা লুৎফা: সরকার এই খাতে অনেক টাকা ব্যয় করেছে, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এই জায়গায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া খুব জরুরি। একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হতে পারে স্কুলগুলোকে ব্যবহার করা। আমরা দেখি, স্কুলগুলো বিকেলের পর খালি থাকে। এই সময় স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে মহড়া বা সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য সেই স্থানগুলো ব্যবহার করতে দেওয়া যেতে পারে। এতে শিশুদেরও ছোটবেলা থেকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এভাবে কমিউনিটির সঙ্গে সংস্কৃতির একটি সংযোগ তৈরি হবে। তখন সংস্কৃতি আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সবার অংশগ্রহণে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে যা মঞ্চনাটকের জন্য খুবই ইতিবাচক হবে। এমআই/আরএমডি
Go to News Site