Somoy TV
রংপুরের পীরগঞ্জের জাফর পাড়া গ্রামের মকবুল হোসেনের বাড়ির উঠোনটা আজও খাঁ খাঁ করে। যে ছেলেটি ছিল পুরো পরিবারের মধ্যমণি, বাবা মায়ের শেষ ভরসা সে আজ সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে নিথর। মা মনোয়ারা বেগম এখনো মাঝে মাঝে বাড়ির সদর দরজায় চেয়ে থাকেন, ভাবেন সাঈদ বুঝি ফিরল! কিন্তু সাঈদ ফেরে না, ফেরে শুধু তার রক্তমাখা স্মৃতি আর অপেক্ষায় থাকা বিচারের দীর্ঘশ্বাস।আজ বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়কে ঘিরে এখন পুরো দেশের চোখ আদালতের দিকে হলেও, আবু সাঈদে বাবা মায়ের অপলক দৃষ্টি ছেলের কবরের দিকে।সকালে পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামের জাফর পাড়ায় আবু সাঈদের কবরের পাশে দেখা যায় তার বাবা মকবুল হোসেন ও মা মনোয়ারা বেগমকে। সাঈদের কবরের পাশে গড়ে তোলা লোহার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মনোয়ারা বেগম আর মকবুল হোসেন, যেন ছেলের সঙ্গে বাবা-মায়ের সেই পুরনো নিস্তব্ধ আলাপন চলছে আজও। মাঝে মাঝেই চোখের পানি মুছছেন দুজনেই।কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনোয়ারা বেগম সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমার ছাওয়া (ছেলে) তো কারো কোনো ক্ষতি করে নাই। ওকে কেন এভাবে মারল? আমি তো আর আমার ছাওয়াক ফিরি পাব না, কিন্তু যাদের জন্য হামরা বাবাক হারাইছি তাদের বিচার দেখি মরবার চাই। আইজ না কি রায় আছে আমি চাই যারা দোষী তারা যানি কঠিন শাস্তি পায়।’আরও পড়ুন: কিছু আসামিকে মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে: আবু সাঈদের ভাইশহীদ আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনের চোখেমুখে এখন কেবলই বিষাদ। সময় সংবাদকে তিনি জানান, সাঈদ শুধু তাদের সন্তান নয়, ছিল গোটা পরিবারের পথপ্রদর্শক। পরিবারে তার মতো শিক্ষিত আর নেই। পুরো গ্রামের মানুষ সাঈদকে খুব ভালোবাসতো।কান্না জড়িত কণ্ঠে মকবুল হোসেন বলেন, ‘আমার বাঁচি থাকি কি লাভ বাবা। ছাওয়াটা আমার কবরে শুয়ে আছে। কবরের পাশে আসলে কি যে কষ্ট হয়। মনে হয় বুকটা ফাটি যায়। ছাওয়াটা বাঁচি থাকলে ওকে একবার দেখলে কলিজাটা শান্তি পাইল হয়।’আজকের রায়কে ঘিরে প্রত্যাশা জানতে চাইলে মকবুল হোসেন বলেন, ‘আদালত কি রায় দেবে জানি না। কিন্তু আমি চাই আমার ছাওয়াক যারা নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করছে তাদের সবার যেন ফাঁসি হয়। কেউ যেন ছাড়া না পায়।’বাড়ির বাইরে বিষণ্ণ মনে বসে থাকতে দেখা যা সাঈদের দুই ভাই আবু হোসেন ও রমজান আলীকে। ভাই হত্যার রায় নিয়ে প্রত্যাশা জানতে চাইলে রমজান আলী বলেন, ‘সাঈদ ছিল আমাদের পরিবারের কলিজা। সেই কলিজা ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে। আমরা আদালতের কাছে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই। যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।’আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলার ৬ আসামি ট্রাইব্যুনালে, রায় দেখানো হবে বিটিভিতেআরেক ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়। এখন আমরা অপেক্ষায় আছি আমার ভাই হত্যার সঠিক বিচারের। আশা করি আদালত আমাদের ন্যায় বিচার দেবে।’এ দিকে আবু সাঈদ হত্যার রায়কে ঘিরে সরব বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।আসিকুর রহমান আসিক, শামসুর রাহমান সুমন, আরমান, নয়নসহ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে আবু সাঈদের বেশ কয়েকজন সহযোদ্ধার সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, ‘১৬ জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ সরাসরি গুলি করে আমাদের সহপাঠী, ভাই, বন্ধু আবু সাইদকে হত্যা করেছে। তারপরও হত্যার সঙ্গে জড়িত অনেক পুলিশ সদস্যের নাম মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। আমরা চাই যারা প্রকৃত দোষী তার যেন কঠিন শাস্তি পায় আর যারা নিরপরাধ তারা যেন অযথা শাস্তি না পায়। অর্থাৎ অপরাধ বিবেচনায় যেন সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হয়।আরও পড়ুন: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে যারা ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাদের বিচার যেন দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।’উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে তীব্র প্রতিবাদ করেন শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। এ সময় তাকে লক্ষ্য করে পুলিশ গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ।আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় সেই বছরের ১৮ আগস্ট ১০ পুলিশ সদস্য এবং ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তাসহ ১৭ জনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন তার বড় ভাই রমজান আলী। যদিও সেই মামলা স্থগিত করে ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।পরে এই মামলায় আসামি করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ ৩০ জনকে। গত বছরের ৩০ জুন অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-২।
Go to News Site