Somoy TV
আজকের বিশ্বে বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকার সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতিসঙ্ঘ তাদের হিউম্যান রাইটস চ্যাপ্টারে উপরের সারিতে রেখেছে বাকস্বাধীনতাকে। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে এর প্রায়োরিটি বেশি। কারো বক্তব্য বা মত ধর্ম, বিশ্বাস, সর্বজন স্বীকৃত বিষয় ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বের বিপরীতে গেলেও কোনো পরোয়া নেই তাতে।মত প্রকাশ ও কথা বলার অবাধ স্বাধীনতার কথা বলা হলেও কার্যত সকল স্তরের মানুষ সব বিষয়ে কি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারে? তাদেরকে কি কথা বলার স্বাধীনতা দেওয়া হয়? নাকি শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ন্যায়সঙ্গত কথা বললেও টুটি চেপে ধরা হয়? রুদ্ধ করে দেওয়া হয় তাদের কণ্ঠ? আমরা দেখতে পাই, এই বাক স্বাধীনতার আওতা থেকে সব সময়ই বাইরে থেকে যায় শাসকগোষ্ঠি ও কর্পোরেট শক্তি। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ থাকে না সাধারণ মানুষের। কথা বললেই নেমে আসে নির্যাতন ও নিপীড়নের স্টীম রোলার। এটা কি তাহলে প্রকৃত বাকস্বাধীনতা হল, নাকি বাকস্বাধীনতার নামে বক-স্বাধীনতা? মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ভন্ডামি ও প্রতারণা? ধর্মীয় স্বীকৃত বিশ্বাস ও স্রষ্টা কর্তৃক সিদ্ধান্তকৃত বিষয়গুলোর বাইরে সবকিছুতে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার অধিকার দিয়েছে ইসলাম। এমনকি শাসকও যদি অন্যায় করে তার প্রতিবাদে সরব হওয়ার নজির আছে ইসলামে। শাসককে বলে দেওয়া হয়েছে যে, প্রজা তাঁর সমালোচনা করতে পারা তাঁর জন্য কল্যাণকর। হযরত আবু বকর রা. স্বীয় খেলাফতের অভিষেক ভাষণে বলেছিলেন যে, I have been given the authority over you, and I am not the best of you. If I Do well, help me; and if I do wrong, set me right. Sincere regard for truth is loyalty and disregard for truth is treachery. The weak amongst you shall be strong with me until I have secured his rights, if God will : and the strong amongst you shall be weak with me until I have wrested from him the rights of others, if God will. Obey me for so long as I obey God and His Messenger. But if I disobey God and His Messenger, you owe me no obedience. (The Prophet Muhammad, Barnaby Rogerson) আমাকে তোমাদের উপর কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নই। আমি সঠিক কাজ করলে আমাকে সহায়তা দিয়ো; আর ভুল করলে, শুধরে দিয়ো। সত্যের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধাই আনুগত্য আর অশ্রদ্ধা বিশ্বাসঘাতকতা। আমি আধিকার নিশ্চিত না করা পর্যন্ত আমার কাছে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতম ব্যক্তিই হবে শক্তিশালী; যদি আল্লাহ চান, আর তোমাদের মাঝে সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হবে দুর্বলতম, যতক্ষণ আল্লাহর ইচ্ছায় তার কাছ থেকে অন্যের অধিকার মুক্ত না করি। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণ করি, ততক্ষণ তোমরা আমরা অনুসরণ করবে। আর আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্য হলে আমাকে অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই তোমাদের। আরও পড়ুন: যুগ শ্রেষ্ঠ শিক্ষা সংস্কারক আল্লামা সুলতান যওক নদভী শাসক জাহান্নামী কী না সেটি নির্ণয়ের জন্য আল্লাহর রাসুল সা. বলছেন, ‘যে শাসকের অনিয়ম দেখলে মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারবে সে শাসক জাহান্নামী নয়। আর যে শাসক প্রকাশ্যে অন্যায় করলেও তার সামনে প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পায় না, সে জাহান্নামী।আবু কাবিলের সূত্রে বর্ণিত, তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রা. সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে, একবার শুক্রবারে মুআবিয়া রা. মিম্বরে আরোহণ করলেন এবং খুতবায় বললেন,إنما المال مالنا والفيء فيئنا، فمن شئنا أعطيناه ومن شئنا منعناه সাধারণ মাল যেমন আমাদের, গনীমতের মালও কেবল আমাদের। আমরা যাকে ইচ্ছা দেব, যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করব।’ মুআবিয়া রা. এর এই বক্তব্যের প্রতিবাদ বা বিরোধিতা কেউ করল না। দ্বিতীয় শুক্রবারে তিনি আবারও একই বক্তৃতা দিলেন। এবারও কেউ প্রতিবাদ করল না। তৃতীয় শুক্রবারেও যখন তিনি একই কথা বললেন, তখন মসজিদে উপস্থিত এক লোক দাড়িয়ে প্রতিবাদ করে বললেন, كلا إنما المال مالنا والفيء فيئنا فمن حال بيننا وبينه حاكمناه إلى الله بأسيافنا না, আপনার এই বক্তব্য সঠিক ও যথার্থ নয়। মাল এবং গনীমত উভয়টিই আমাদের। যে কেউ আমাদের মাঝে এবং এই সম্পদের অধিকারের মাঝে প্রতিবন্ধক হবে, তরবারি দিয়ে আল্লাহর সামনে তার বিচার করব। মুআবিয়া রা. মিম্বর থেকে নেমে গিয়ে কিছুক্ষণ পর প্রতিবাদকারী লোকটিকে দরবারে তলব করলেন। সবাই ভাবল, শাসকের মুখের উপর কথা বলেছে সে। এবার তো তার মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত। কিন্তু না, সবাই দেখতে পেল এক অবাক কাণ্ড। লোকটি মুআবিয়া রা. এর সাথে রাজকীয় বিছানায় বসে আছে। মুআবিয়া রা. উপস্থিত লোকদের বললেন, ‘আমি তো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলাম। এই লোকটি আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছে।, আল্লাহ যেন তাকেও দীর্ঘজীবী করেন! আমি আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘আমার পরে এমন কিছু শাসকের আগমন ঘটবে, যারা অন্যায় কথা বলবে। অথচ (প্রশাসনিক ক্ষমতার কারণে) ভয়ে কেউ তাদের প্রতিবাদ করবে না। এরা বানরের মতো জাহান্নামে ছুটে যাবে। আমি সেই সকল শাসকের অন্তর্ভুক্ত কী না, তা যাচাইয়ের জন্য প্রথম দিন শরীয়ত বিরোধী অন্যায় সেই দাবি করেছিলাম, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করেনি। আমি ভীত হয়ে পড়লাম। তারপর দ্বিতীয় শুক্রবারে একই কথা বললাম। তখনও কেউ প্রতিবাদ করল না। ধরেই নিয়েছিলাম আমি সেই সকল জাহান্নামি শাসকদের একজন। অতঃপর তৃতীয় শুক্রবারে আবার যখন আমি সেই বক্তব্য দিলাম এবং এই লোকটি উঠে আমার কথার প্রতিবাদ করল, কেমন যেন সে আমাকে নবজীবন দান করল। এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে রক্ষা করুন, দীর্ঘজীবী করুন! [তবারানি ও আবু ইয়ালা ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। এর বর্ণনাকারী সবাই নির্ভরযোগ্য। শাসক আর সাধারণ মানুষ তো পরের কথা; আজকাল আলেম, বুজুর্গ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগণ পর্যন্ত সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। হক কথা বললেও বেয়াদব ট্যাগ দিয়ে অহংকারবশত অপব্যাখ্যা করেন। এগুলো মূলত পোপতন্ত্রেরই উত্তরাধিকার। যাকে ইংরেজিতে থিয়োক্রাসি বলে। পোপদের সেই থিয়োক্রাসির সীমালঙ্ঘন থেকেই আজকের সেক্যুলারিজমের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। পুঁজিবাদের স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যনীতিই মার্কসবাদের জন্ম দিয়েছিল। এটাই ঐতিহাসিক সত্য। কারণ একটি চরমপন্থাই আরেকটি চরমপন্থার জন্ম দেয়। অন্যায়, জুলুম, নিপীড়ন, বৈষম্য, সমাধানহীনতা উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেয়। ফারুকে আজম হযরত উমর রা. বলেছিলেন, رحم الله امرأ أهدى إلي عيوب نفسي তার প্রতি আল্লাহ রহম করুন, যে আমার দোষগুলো আমাকে ‘হাদিয়া’ দেয়। হযরত উমর রা. ‘দোষ ধরিয়ে দেয়া’কে ‘হাদিয়া দেয়া’ বলে উল্লেখ করেছেন। হযরত উমর রা. আরো বলেন, لا خير في قوم ليسوا بناصحين، ولا خير في قوم لا يحبون الناصحين. ‘তাদের মধ্যে কোনো খায়র নেই, যারা নিজেরা কল্যাণকামী নয়, আবার কোনো কল্যাণকামীকে তারা দেখতেও পারে না। আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও পরিবার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের শীর্ষ ব্যক্তিরা শুধু একচেটিয়া প্রশংসা, তোষামোদ আর খুশামোদি পছন্দ করা বর্তমান যুগের এক বড় ফেতনা। হক কথার তিক্ততা এবং প্রতিবাদের ভাষা বরদাশত করার মত সৎ সাহস তাদের মাঝে খুব কমই পরিলক্ষিত হয়। এর কারণে মানবসমাজ দুইদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হয়:১। কিছু অসাধু লোক এসব তোষামোদি ও অতিরঞ্জনমূলক প্রশংসাকে অবলম্বন করে শীর্ষ ব্যক্তিদের নিকটে চলে যায়। অতঃপর বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হয়ে বড়দের অজান্তেই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক সেজে বসে। এই অবৈধ কর্তৃত্বপনার কথা যতক্ষণে বুঝে আসে ততক্ষণে জল গিয়ে গড়ায় অনেকদূর। পূর্ণ হয়ে পড়ে সর্বনাশের ষোলকলা। ইতিহাসে অনেক বড় বড় ব্যক্তি শুধুমাত্র তার পর্দার আড়ালের নিয়ন্ত্রকের কারণে বিতর্কিত হয়েছেন। মন্দ উপাধিতে ভূষিতও হয়েছেন অনেকেই।২। এসকল শীর্ষ ব্যক্তির চিন্তা ও কর্মে কোনো ভুল থাকলে সেটি সংশোধনের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। ফলে সত্য ও কল্যাণকর বিষয়টি অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। তাই পরমত সহিষ্ণুতা খুব জরুরি। গঠনমূলক আলোচনা ও সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিৎ। মানুষের বাকস্বাধীনতা হরন ও আলোচনা-সমালোচনার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিষয়গুলো বোঝার তাওফিক দান করুন! লেখক: মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ, এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Go to News Site