Collector
উত্তরে নিখোঁজ ৫০ নদী! | Collector
উত্তরে নিখোঁজ ৫০ নদী!
Somoy TV

উত্তরে নিখোঁজ ৫০ নদী!

নদ-নদীতে পড়ে মানুষ বা অন্যান্য জিনিস নিখোঁজ হয়, এটা সবারই জানা। কিন্তু সময় সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর উল্টো চিত্র। যেখানে পাওয়া গেছে, নদ-নদীই নিখোঁজ’র চাঞ্চল্যকর তথ্য। তাও একটি/দুটি নয়, দেশের উত্তরের জনপদে নিখোঁজ হওয়া নদ-নদীর সংখ্যা ৫০! আর এ তথ্য জানে না সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরও।রংপুর বিভাগে নিখোঁজ নদীগুলো খুঁজতে সরকারের তিনটি সংস্থার সঙ্গে কথা বলে সময় সংবাদ। তাদের কাছে প্রশ্ন ছিল, রংপুর বিভাগে নদ-নদীর সংখ্যা কত? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনটি সংস্থা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর। তার মানে তাদের কারো কাছেই সঠিক সংখ্যা নেই!বিষয়টি সরেজমিন দেখতে চলতি মাসের ৪ থেকে ৮ তারিখ পর্যন্ত টানা পাঁচদিন রংপুর বিভাগের ৮ জেলার বেশ কিছু এলাকা চষে বেড়ায় ‘টিম সময় সংবাদ’। স্থানীয় প্রবীণ, নদীকর্মী ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে মেলে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেসব তথ্যে যাবার আগে একটু পেছন ফিরে তাকানো যাক।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০১১ সালে দেশের নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে একটি বই প্রকাশ করে। এতে রংপুরের ৮ জেলায় নদীর সংখ্যা দেখানো হয় ৮৪ টি। পরবর্তীতে ২০২৪ এ জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন ‘বাংলাদেশের নদ-নদীর সংজ্ঞা ও সংখ্যা’ নামে একটি বই প্রকাশ করে। সেই বইয়ে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় নদীর সংখ্যা বলা হয় ১২৫টি।আরও পড়ুন:  খুলনাঞ্চলে খাল খননে চ্যালেঞ্জ মৃতপ্রায় নদীগত বছর সরকারের বেশ কয়েকটি সংস্থা মিলে বড় আকারে সারা দেশের নদ-নদীর তালিকা তৈরি করে। এতে রংপুরের নদীর সংখ্যা দেখানো হয় ২৫২ টি। কিন্তু বাস্তবতা হলো ২৫২টি ছাড়াও আরও অন্তত ৫০ টি নদী আছে যেগুলোর নাম তালিকাভুক্ত হয়নি এমন কথা বলছেন নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদ।নদী গবেষক তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী নিয়ে দীর্ঘ আলাপে চণ্ডীমারী নামে একটি নদীর নাম জানতে পারে সময় সংবাদ। গত ৮ মার্চ রংপুর শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় যায় ‘টিম সময় সংবাদ’। সেখানে ঠাঁটমারী নামে একটি স্থান আছে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঠাঁটমারী ব্রিজের নিচে বহু মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী।জনশ্রুতি আছে, নিরীহ মানুষকে হত্যার পর ব্রিজের নিচে নদীতে লাশগুলো ফেলা দেয় হানাদার বাহিনী। যে নদীতে লাশগুলো ফেলা হয় সেটিই চণ্ডীমারী নদী। নদীটি তিস্তার একটি উপধারা। এটি ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিলিত হয়েছে। ভরা বর্ষায় এখনও নদীর দুপাশ প্লাবিত করে চণ্ডীমারী। তবে শেষ চৈত্রের দহন আর উজানের তিস্তার পানি স্বল্পতায় চণ্ডীমারীর এখন ‘মরো মরো’ দশা।ঠাঁটমারী থেকে দুই কিলোমিটার দূরে টগরাইহাট বাজার। সেই বাজারকে পেছনে ফেলে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে চণ্ডীমারীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় টিম সময় সংবাদের সদস্যরা। কথা হয় কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে। তারা জানালেন, এক সময় এই নদীই ছিল এ এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় চন্ডীমারী দিনকে দিন তার জৌলুস হারিয়েছে।নদী গবেষক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের রংপুর অঞ্চলের নদ-নদী নামক একটি বই এর ৭৩ পাতায় চণ্ডীমারী সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য মেলে। অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদের বইয়ের সূত্র ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের করা নদীর তালিকা নিয়ে বসে ‘সময় সংবাদ’। সেখানে চণ্ডীমারীর কোনো নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি।এমনকি গুগল ম্যাপ ও উইকিপিডিয়াতেও এ নদীর অস্তিত্ব মেলে না।অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘শুধু চণ্ডীমারী নয়, উত্তরাঞ্চলে এমন অন্তত ৫০ টি নদী আছে যেগুলো সরকারের কোনো নথি বা তালিকায় উল্লেখ নেই।’ আরও পড়ুন: নাব্য হারিয়ে মরা খালে পরিণত ঝিনাইদহের নদ-নদীগুলোএকইভাবে রংপুর শহর থেকে মোটর সাইকেলে একশ কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাট জেলার দহগ্রাম আঙ্গরপোতার কাছাকাছি সাঁকোয়া নামক একটি নদী দেখতে যায় ‘টিম সময় সংবাদ’।এটি মূলত পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত একটি সীমান্তবর্তী নদী। নদীটি লালমনিরহাটের অন্যান্য নদী যেমন তিস্তা, ধরলা, রত্নাই, সানিয়াজান প্রভৃতির মতোই আঞ্চলিক জলজ পরিবেশের অংশ। এটি বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পানি বৃদ্ধির জন্য পরিচিত। এটি একটি ভাঙনপ্রবণ নদীও বটে। তবে সরকারের সবশেষ তালিকাসহ কোনো তালিকাতেই স্থান পায়নি সাঁকোয়া। যদিও সাঁকোয়ার ভাঙনে প্রতি বছরই সর্বস্বান্ত হন বহু মানুষ।মন্ত্রণালয়ের সবশেষ যে তালিকা পাওয়া যায়, সেটা ২০২৫ সালের। সেখানে লালমনিরহাটে নদীর সংখ্যা বলা আছে ১৬ টি। কিন্তু নদী গবেষকরা বলছেন, লালমনিরহাটের সাঁকোয়া, মালদাহা ও চুঙ্গাদ্বারাসহ আরও ২৪ টি নদীর নাম নেই সরকারি তালিকায়।রংপুর পানি উন্নয়ন সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব বলছেন, তালিকায় স্থান না পাওয়া নদীগুলোর বিষয়ে তথ্য পেলে তা নিয়ে কাজ করবেন তারা। প্রয়োজনে পাউবোর তৈরিকৃত ওয়েবসাইটে নতুন করে সন্ধান মেলা নদীগুলোর নাম যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি। আরও পড়ুন: প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহীর চার নদ-নদীhttp://nodi.bwdb.gov.bd/ এই ওয়েব সাইটে বর্তমানে রংপুরের ৮ জেলার ২৫২টি নদীর তথ্য আছে বলে উল্লেখ করেন আহসান হাবীব।উল্লেখ্য, নদী নালা ও খাল বিল খনন বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী ইশতেহার ছিল। নদীকর্মীরা বলছেন যেসব নদীর নামই জানেন না সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কিংবা উত্তরের যে নদীগুলো তালিকাতেই নেই, সেই নদীগুলোর পরিচর্যা কীভাবে হবে কিংবা সেই নদীগুলো বাঁচবে কীভাবে তা নিয়ে শঙ্কিত উত্তরের সচেতন মহল।

Go to News Site