Collector
নিরন্তর সংগ্রামী চেতনার পথিকৃৎ ছিলেন মুফতি আমিনী রহ. | Collector
নিরন্তর সংগ্রামী চেতনার পথিকৃৎ ছিলেন মুফতি আমিনী রহ.
Somoy TV

নিরন্তর সংগ্রামী চেতনার পথিকৃৎ ছিলেন মুফতি আমিনী রহ.

কিছু মানুষ পৃথিবীর বুকে আসে সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ার আকাশচুম্বী স্বপ্ন নিয়ে। তারা ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা বদলে দিতে নিজেকে উজাড় করে নিরন্তর সংগ্রাম করে যায়।এই মানুষগুলো নিঃস্বার্থভাবে মানবতার মুক্তির বার্তা ফেরি করে বেড়ায় পথে-প্রান্তরে। অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তারা বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর হয়ে রুখে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের বহুল আলোচিত ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক সাংসদ মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. ছিলেন এমনই একজন মানুষ – যিনি আমৃত্যু লড়াই করেছেন অন্যায়, অবিচার আর শোষণের বিরুদ্ধে। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি তিনি, বরং আজীবন মাথা তুলে বুক চিতিয়ে বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। বাংলাদেশের ইসলামী চিন্তাজগতের আলোচিত প্রতিভা, সমাজসংস্কারক ও সাবেক সাংসদ মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. ছিলেন এমনই এক মানুষ। তিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। যিনি আমৃত্যু লড়াই করেছেন অন্যায়, অবিচার আর শোষণের বিরুদ্ধে। কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি তিনি, বরং আজীবন মাথা তুলে বুক চিতিয়ে বলিষ্ঠ কন্ঠে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন সকল অন্যায়, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জবরদস্তি এবং শোষণের বিরুদ্ধে। জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি ন্যায়পরায়ণতার জয়ধ্বনি হয়ে উঠেছেন। মুফতি আমিনীর জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আমিনপুর গ্রামে। তিনি পড়াশোনা করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন দীনি বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইউনুসিয়া, ঢাকার লালবাগস্থ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া ও মুন্সিগঞ্জের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায়। ১৯৬৯ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি উপমহাদেশের কিংবদন্তি ইসলামী চিন্তাবিদ ও হাদিসবিশারদ মাওলানা সাইয়িদ মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়া বানুরী টাউনে উচ্চতর হাদীস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন।  আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন ১৯৭০ সালে তিনি উলুমুল হাদীসের উপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর শিক্ষকগণের মধ্যে মুজাহিদে আযম মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ., মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ., মাওলানা আবদুল ওয়াহাব পীরজী হুজুর রহ., মাওলানা হেদায়াতুল্লাহ মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর রহ., মাওলানা আবদুল মজিদ ঢাকুবী হুজুর রহ., শাইখুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক রহ. প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। ঢাকার কামরাঙ্গীরচর জামিয়া নুরিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদরাসা বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মুন্সিগঞ্জের মোস্তফাগঞ্জ মাদরাসায় গিয়ে কুরআন হিফজ করতে শুরু করেন। মাত্র নয় মাসে তিনি হিফজ সম্পন্ন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি লালবাগ জামিয়া কুরআনিয়া আরাবিয়া-য় শিক্ষক ও সহকারী মুফতি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে নায়েবে মুহতামিম (উপাধ্যক্ষ) ও প্রধান মুফতি হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে তিনি লালবাগ জামিয়ার মুহতামিম ও শাইখুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আমৃত্যু তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। এছাড়াও তিনি বড় কাটারা আশরাফুল উলুম মাদরাসাসহ আরো বেশ কিছু দীনি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. এর রাজনীতিতে অভিষেক হয়েছিল আশির দশকে। তাঁর প্রিয় উস্তাদ ও শশুর মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল খেলাফত আন্দোলন বাংলাদেশ-এর মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান হন এবং আমৃত্যু তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এছাড়াও তিনি আরো কিছু রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চার দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর জামাতা। ১৯৭০ সালে তিনি হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর আদরের এক মেয়ে হাফেজা মুবারকাকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির চার মেয়ে ও দুছেলে। ২০১১ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি অঘোষিতভাবে গৃহবন্দী ছিলেন। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত প্রায় সোয়া বারোটার দিকে রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোক করেছেন। মানসিক চাপের সঙ্গে সঙ্গে শারীরিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ১১ ডিসেম্বর দিনভর তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করেছেন। মাগরিবের পর মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিসের তালিবুল ইলমদের সহিহ বুখারির দরস দিয়েছেন। একবার বলেছেন, শরীর খারাপ লাগছে। কিন্তু এরপরও তিনি যথারীতি পাঠদান করেছেন।  ইশা পড়ে একজন মৃত ব্যক্তির জানাযায় ইমামতিও করেছেন। এরপর দলের কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ নসিহত করেছেন। রাত এগারোটার দিকে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আর সেখানেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। ১৩ ডিসেম্বর জাতীয় ঈদগাহে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন তাঁর আশৈশব সহপাঠী ও সহকর্মী মাওলানা আবদুল হাই । পরে তাঁকে লালবাগ শাহী মসজিদ প্রাঙ্গণে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আরও পড়ুন: এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ. তিনি ছিলেন বিপ্লবী ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একজন মানুষ। তাকে দেখতে যতটা গম্ভীর মনে হতো, আসলে তিনি ছিলেন অত্যন্ত রসবোধসম্পন্ন একজন হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণের কারণে তাঁকে অনেকে আটপৌরে, রাগী ও কড়া মেজাজের মানুষ বলে মনে করতেন। কিন্তু তাঁর কাছের লোকজন জানেন, তিনি কতটা দিলখোলা স্বভাবের ছিলেন। মানুষের সঙ্গে অবলীলায় মিশতেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব উদার, সদালাপী ও অতিথিপরায়ণ ছিলেন। মৃত্যুকে কখনো পরোয়া করেননি তিনি। দৃপ্তকন্ঠে বলেছেন, কুরআনের জন্য আমি ফাঁসির মঞ্চে যেতেও প্রস্তুত। আসলে যারা প্রকৃত অর্থে বিপ্লবী তারা স্বভাবত এমনই হয়ে থাকেন। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানেন এবং বিশ্বাস করেন, বিপ্লবীদের মৃত্যু নেই। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ছিলেন বিস্ময়কর এক অধ্যয়নপ্রিয় মানুষ। শৈশবে মসজিদে বসে স্ট্রিট লাইটের আলোয় সারারাত বই পড়ার কথা তার সমসাময়িকদের মুখ থেকে শোনা যায়।  এমনকি পরিণত বয়সেও তিনি তার এ নিরন্তর পাঠাভ্যাস ধরে রেখেছিলেন। অনেক সময়ই তিনি বিভোর থাকতেন গভীর অধ্যয়ন ও পাঠনিমগ্নতায়। নতুন নতুন কিতাব সংগ্রহ করার অসাধারণ নেশা ছিল তাঁর। ইসলাম-সংশ্লিষ্ট আলোচিত নতুন কোন বই তার অপঠিত থাকত না। লালবাগ মাদরাসার সুবিশাল পাঠাগারে সংরক্ষিত প্রাচীন অসংখ্য কিতাবের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পেন্সিল দিয়ে লেখা তাঁর নোটের দেখা মেলে। মুফতি আমিনী রহ. রাজনীতির ক্ষেত্রে খুব বিচক্ষণ ছিলেন। বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ এ প্রসঙ্গে বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে, মুফতি আমিনী রহ. যে আন্দোলনই করতেন, তার পরিণতি সম্পর্কে তিনি সচেতন থাকতেন।… আমরা হয়তো দেখছি, তিনি গরম গরম বক্তৃতা দিচ্ছেন, আবেগী করে তুলছেন সবাইকে। কিন্তু তার মধ্যে তখনও পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছিল।… দেখা গেছে, বিভিন্ন আন্দোলন তিনি একটা জায়গায় এসে ছেড়ে দিতেন। সেটা নিয়ে আর কাজ করতেন না, তিনি আসলে জানতেন, কোথায় থামতে হয়। এটা জানার কারণেই অনেক বিপর্যয় তখন ঘটেনি। বাংলাদেশের প্রখ্যাত গবেষক আলেম ও বহুপ্রজ মনীষা মাওলানা মুসা আল হাফিজ মুফতি আমিনী রহ. এর রাজনৈতিক দূরদর্শীতা সম্পর্কে বলেছেন, “রাজনীতির গতিপথ বুঝতেন মুফতি আমিনী, বুঝতেন সময়ের প্রয়োজন এবং চাহিদা, তিনি বাস্তবতার আলোকে, চাহিদার প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। অনেকে বলেন, তিনি ‘গরম গরম বক্তব্য’ দিতেন। হ্যাঁ, তিনি দিতেন।  কিন্তু সেটা অবাস্তব কোনো বক্তব্য হতো না। তিনি যখনই কোনো হুংকার দিয়েছেন, এই হুংকারকে যথাযথভাবে কাজেও লাগিয়েছেন। অবাস্তব কোনো হুংকার তিনি দেননি। আমি বলছি না রাজনৈতিক পরিক্রমায় তিনি কখনো ভুল করেননি। মানুষ হিসেবে ভুল করতেই পারেন। কিন্তু জেনে বুঝে কখনো ভুলের পথে পা বাড়াননি। ভুল করেছেন ভুলক্রমে। মুফতি আমিনী ইসলামের মহান চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করতে আমৃত্যু লড়াই করে গিয়েছেন। তাঁর তিমিরবিনাশী চেতনা আমাদের জন্য অফুরান প্রেরণার উৎস। লেখক: শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক

Go to News Site