Collector
সাগরপথে রঙিন স্বপ্ন, বাস্তবে মুক্তিপণের শিকলে বন্দি রোহিঙ্গা তরুণরা | Collector
সাগরপথে রঙিন স্বপ্ন, বাস্তবে মুক্তিপণের শিকলে বন্দি রোহিঙ্গা তরুণরা
Somoy TV

সাগরপথে রঙিন স্বপ্ন, বাস্তবে মুক্তিপণের শিকলে বন্দি রোহিঙ্গা তরুণরা

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরগুলোতে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। আশ্রিত জীবনের অনিশ্চয়তা আর উন্নত জীবনের প্রলোভনকে পুঁজি করে রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতে প্ররোচিত করছে দালালরা। তবে মাঝপথেই অনেককে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ।উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা কালা পুতুর ২০ বছর বয়সী ছেলে হামিদ উল্লাহ ১০ম শ্রেণিতে পড়ত। গত মাসে স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে সে আর ফেরেনি। ১৪ দিন পর পরিবার জানতে পারে, হামিদ সাগরপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। এখন অজ্ঞাত স্থান থেকে দালালরা তাকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৪ লাখ টাকা দাবি করছে।হামিদ উল্লাহর মা কালা পুতু (৪০) জানান, আর্থিক কষ্টের মধ্যেও তিনি ছেলেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। তবে সংসারে টাকার অভাব দেখা দেওয়ায় তিনি ছেলেকে পড়ালেখা বন্ধ করে দুই বোনের বিয়ের জন্য কাজ করতে বলেন। কিন্তু হামিদ পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী ছিল।তিনি আরও বলেন, একদিন স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে আর ফিরে আসেনি হামিদ। পরে কিছু লোক এসে জানায়, তার ছেলে জীবিত রয়েছে, তবে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি। অনেকদিন পেরিয়ে গেলেও ছেলের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে কেউ কেউ বলছে সে থাইল্যান্ডে থাকতে পারে, তবে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। এদিকে ছেলেকে ফিরে পেতে এখন ৪ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।একই চিত্র শুধু কালা পুতুর পরিবারেই নয়; খায়রুল বশর ও নূর হাবার সন্তানরাও সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পর দালালদের হাতে আটক রয়েছে। মুক্তির জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।নুর হাবা (৩২) জানান, ক্যাম্পে এসে এক বন্ধু পরিচয়ে তার ছেলেকে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে অপরিচিত স্থানে নিয়ে যায় এবং পরে জোরপূর্বক মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। প্রায় ১৪-১৫ দিন ধরে তার ছেলের কোনো খোঁজ নেই।তিনি বলেন, একদিন হঠাৎ একটি অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। সেখানে তার ছেলেসহ আরও তিন শিশুর ছবি দেখানো হয় এবং ফোনে তাদের কণ্ঠ শোনানো হয়, যেখানে তারা মা-বাবাকে ডেকে টাকা দিয়ে মুক্ত করার জন্য অনুরোধ করছে। বর্তমানে দালাল চক্র ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দাবি করছে।নুর হাবা আরও জানান, তার ছেলে ঠিক কোথায় আছে-মালয়েশিয়া না থাইল্যান্ডে-তা নিশ্চিত নয়। তিনি আশঙ্কা করছেন, নির্যাতনের ভয়ে তার সন্তান দালালদের কথামতো কথা বলতে বাধ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি চরম উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।খায়রুল বশর (৩৭) জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে তার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সে কোথায় গেছে-মালয়েশিয়ায় পাচার হয়েছে নাকি অপহরণের শিকার-তা তিনি নিশ্চিত নন।তিনি বলেন, ক্যাম্পে অনেকে ধারণা করছেন, তার ছেলে সাগরপথে ট্রলারে করে মালয়েশিয়ায় চলে গেছে। দালাল চক্র সরাসরি ক্যাম্পে না এসে বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ওঁৎ পেতে থাকে এবং সুযোগ বুঝে তরুণদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যায়। তার ছেলে ১০ম শ্রেণিতে পড়ালেখা করছিল, কিন্তু বর্তমানে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মানবপাচার চক্রের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ রোহিঙ্গাদের। চাকরির প্রলোভনসহ নানা আশ্বাসে তরুণ-তরুণীদের সাগরপথে ট্রলারে তুলে দিচ্ছে দালালরা।ক্যাম্প-৪, সি-৭ ব্লকের বাসিন্দা ফরমিনা (২৬) জানান, দালালরা সরাসরি ক্যাম্পে কাজ না করে বাইরে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। রোহিঙ্গা তরুণরা ক্যাম্পের বাইরে গেলে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এবং মোবাইলের মাধ্যমে আগে মালয়েশিয়ায় যাওয়া লোকদের সঙ্গে কথা বলিয়ে প্রলোভন দেখানো হয়। তাদের বোঝানো হয়, সাগরপথে সহজেই মালয়েশিয়ায় যাওয়া যায় এবং সেখানে ভালো আয় করা সম্ভব, কোনো ঝুঁকি নেই।তিনি আরও বলেন, এভাবে নানা প্রলোভনে তরুণদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরের দালালদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে আগেই ছেলেদের ‘বেচাকেনা’ করা হয়। পরে বেশি টাকার কাজের কথা বলে বাইরে নিয়ে গিয়ে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। এমন ঘটনার শিকার তারাও হয়েছেন বলে জানান তিনি।আরও পড়ুন: মুক্তিপণের ৫০ লাখ টাকা দিয়েও বাঁচল না জহিরুলমোহাম্মদ সিরাজ (২৭) জানান, ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা তরুণদের লোভ দেখিয়ে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারে তুলে দিচ্ছে দালাল চক্র। তিনি বলেন, এটি দ্রুত বন্ধ করা প্রয়োজন।তিনি আরও বলেন, অনেক পরিবারই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পাচারের পর এখন দালালরা মুক্তিপণ দাবি করছে, কিন্তু অধিকাংশ পরিবারেরই খাবারের টাকাও নেই। এ অবস্থায় ক্যাম্পের অনেক মা-বাবা সন্তানদের খোঁজ না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।আবু তৈয়ব (৩৭) জানান, ক্যাম্পে দালাল চক্রের তৎপরতা বেড়ে গেছে। তারা রোহিঙ্গা তরুণদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে গিয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করছে। আবার অনেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আটক হয়ে জেলখানায় রয়েছে বলেও তিনি জানান।তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনায় ক্যাম্পের হাজার হাজার বাবা-মা এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।এদিকে, প্রলোভন ও উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে সাগরপথে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে পাড়ি দিচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ধরা পড়লে তাদের ক্যাম্পে ফিরিয়ে এনে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানায় এপিবিএন।উখিয়াস্থ ৮ এপিবিএনের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সাগরপথে বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত জীবনের আশায় অনেকে নিজেরাও ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া বা অন্যান্য দেশে পাড়ি দিচ্ছে।তিনি আরও বলেন, আটক বা উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পে ফেরত এনে কাউন্সেলিং করা হয়। পাশাপাশি কেউ অভিযোগ করলে তার ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন বলছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় অনেকেই ক্যাম্প জীবন থেকে মুক্তি পেতে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথ বেছে নিচ্ছে।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ থানায় মানবপাচার সংক্রান্ত বহু মামলা রয়েছে, অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আরও মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ কারণে কক্সবাজারে মানবপাচার বিষয়ক বিশেষ আদালত স্থাপনের দাবি উঠেছে।তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক বা শরণার্থী মর্যাদা না পেয়ে রোহিঙ্গারা হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় ক্যাম্পে বসবাস করছে। ভবিষ্যৎ ও সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকায় তারা সহজেই প্রলোভনের শিকার হচ্ছে। এ সুযোগে মানবপাচার চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যেখানে কিছু ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাই টাকা জোগাড় করে দালালদের মাধ্যমে পাচারের পথে যাচ্ছে।তিনি আরও জানান, পাচারের গন্তব্য হিসেবে সাগরপথে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে নারীদের ভারতে পাচার ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়।এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আইওএম ও স্থানীয় সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের সচেতন করছে। পাশাপাশি পুলিশ, কোস্টগার্ড, বিজিবি ও নৌবাহিনী যৌথভাবে মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান।গত পাঁচ মাসে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় কক্সবাজার থেকে ৩৩৫ জনকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। একই সময়ে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত ৩০ জনকে আটক করা হয়েছে।

Go to News Site