Collector
সমাজ বদলের কারিগর ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী | Collector
সমাজ বদলের কারিগর ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
Jagonews24

সমাজ বদলের কারিগর ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী

মা, মাটি ও মানুষ এই তিনে মিলেই জীবনের পুরো সময় কাটিয়েছেন একজন মানুষ। পরিবারের বড় ভাইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের ‘বড়ভাই’ আর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ। নাম তার ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বকশীবাজারের নবকুমার ইন্সটিটিউশন থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস (প্রাইমারি) পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তী জীবনে কোনো দলীয় রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন লন্ডনে এফআরসিএস অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলেন। দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকে তিনি সম্ভাবনাময় কর্মজীবন ও উচ্চতর শিক্ষার মায়া ত্যাগ করে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। ভারতে আগরতলার মেলাঘরে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সম্মুখ যুদ্ধে যোগ দেন। নিজের অর্জিত জ্ঞানকে হাতিয়ার করে যুদ্ধ করেছিলেন, নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সাভারে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। ১৯৭১ সালের সেই অস্থায়ী যুদ্ধকালীন অস্থায়ী চিকিৎসা শিবিরের সূচনা থেকে পথচলা সময়ের প্রবাহে এটি রূপ নেয় দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ও অলাভজনক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে। প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তিনি নগরের কোলাহল ছেড়ে সাভারের মাটিতেই গড়ে তোলেন এই প্রতিষ্ঠান। শুধু স্বাস্থ্যসেবার গণ্ডিতেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না, মানবকল্যাণের বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে ছিল তার দৃষ্টি। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘শিক্ষা ও চিকিৎসা’ হলো উন্নত সমাজের ভিত্তি। ফলে তিনি দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়’। পাশাপাশি গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ফিজিওথেরাপি কলেজ, প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেন। পাশাপাশি ঔষধ নীতি প্রণয়নের তার ছিল বিরাট অবদান। তার এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ স্বাস্থ্যখাতকে করে তোলে আরও স্বনির্ভর ও সম্ভাবনাময়। আরও পড়ুন:  ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী: জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের নক্ষত্র সাদাকালো ক্যানভাসে স্মৃতিময় গল্প: একজন জাফরুল্লাহ চৌধুরী তার প্রতিষ্ঠিত কোন প্রতিষ্ঠানের মালিকানা গ্রহণ করেননি। তিনি ট্রাস্টি হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতা করে গেছেন। তার প্রতিটি চিন্তায় প্রতিফলিত হয়েছে মানবতার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। পাশাপাশি সমাজ থেকে অবহেলিত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্যও তিনি কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। যা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এনেছে আমুল পরিবর্তন। সারাজীবন তিনি ছিলেন মানুষের অধিকারের পক্ষে এক নির্ভীক উচ্চারণ। দলীয় রাজনীতির সীমানার বাইরে থেকেও নাগরিক ও রাজনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নে কখনো নীরব থাকেননি তিনি। জীবনের অন্তিম প্রহরেও লুঙ্গি পরিহিত, হুইলচেয়ারে বসেই অংশ নিয়েছেন প্রতিবাদের মিছিলে, যেন অবিনাশী এক চেতনার জাগ্রত প্রতীক। তার অবস্থান ছিল আপসহীন, আর কণ্ঠ ছিল সর্বদা মানুষের পক্ষে দৃপ্ত। অবশেষে, ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তার স্বপ্ন ও সৃষ্ট কর্মধারা আজও নিঃশব্দে বেঁচে আছে মানুষের কল্যাণে। সময়ের স্রোত পেরিয়েও তার আদর্শ যেন অনুপ্রেরণার নাম। জেএস/

Go to News Site