Somoy TV
দীর্ঘ ৬ বছর পর করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতে কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ (ইআরপিপি) প্রকল্পের কেনাকাটায় ১২ কোটি ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা লুটপাটের তথ্য পেয়েছে সংস্থাটির অনুসন্ধান টিম।করোনা মহামারিতে ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সুযোগে ভাইরাসের মতোই ছড়িয়ে পড়েছিল অনিয়ম-দুর্নীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেনাকাটায় দুর্নীতি নিয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে জমা দেয় বিশ্বব্যাংক। যা নিয়ে সময় সংবাদে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনুসন্ধানে নামে সংস্থাটি। সেখানে বলা হয়, ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ যৌথভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করে। এতে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত মেলে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক ডা. ইকবাল কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা মাস্ক, পিপিই ও অ্যাপ চালুসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক অনিয়মে জড়ান। গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মাস্ক সরবরাহ, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রীর কোম্পানিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও ওঠে। অনুসন্ধানে নেমে কেনাকাটায় ১২ কোটি ৩ লাখ টাকা লুটপাটের তথ্য পায় দুদক। এই দুর্নীতির সঙ্গে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ ৩৮ জনের সংশ্লিষ্টতার পেয়েছে সংস্থাটি। যোগসাজশে ছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানও। যাদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা করার সুপারিশ পায় কমিশন। আসামিদের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল, অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ এবং কাজ না করেই অর্থ উত্তোলনের মতো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম মামলা: অনুসন্ধান প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম মামলায় কেএন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ক্রয় বাবদ ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় আটজনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন— সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার ও জাদিদ অটোমোবাইলসের মালিক কাজী শামীমুজ্জামান। আরও পড়ুন: জাহিদ মালেকের ছিল নিজস্ব বাহিনী, গড়েছেন সম্পদের পাহাড় দ্বিতীয় মামলা: এ মামলায় হাসপাতালের ইলেকট্রিক বেড ক্রয়ের প্যাকেজে ১ কোটি ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এতে ছয়জনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়। তারা হলেন— প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার এবং ইনশা ট্রেড করপোরেশনের মালিক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তৃতীয় মামলা: এ মামলায় কেএন-৯৫ মাস্ক ক্রয়ের প্যাকেজে ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এখানেও আটজনকে আসামি করার সুপারিশ রয়েছে। তারা হলেন— সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সহকারী পরিচালক ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত, স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক মেডিকেল অফিসার (প্ল্যানিং) ডা. অনির্বাণ সরকার এবং এসআরএস ডিজাইন অ্যান্ড ফ্যাশন লিমিটেডের মালিক মো. সাইফুর রহমান। চতুর্থ মামলা: এ মামলায় ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ এবং সচেতনতামূলক টিভিসি প্রচার না করেই ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে দুদক টিম চারজনকে দায়ী করেছে। তারা হলেন— প্রকল্প পরিচালক ডা. ইকবাল কবীর, এডিজি (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা এবং ই-মিউজিকের প্রধান নির্বাহী মো. হোসনী ইয়ামিন। আরও পড়ুন: করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক জালিয়াতি, দুদকের তদন্ত কমিটি গঠন পঞ্চম মামলা: এ মামলায় মেডিকেল ও সার্জিক্যাল পণ্য ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে ২ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এখানে ছয়জনকে আসামি করার সুপারিশ দিয়েছে। তারা হলেন— ডা. ইকবাল কবীর, ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, ডা. মো. শরীফুল হাসান, ডা. মোহা. আনোয়ার সাদাত ও ডা. অনির্বাণ সরকারের পাশাপাশি সিম করপোরেশনের ম্যানেজিং পার্টনার মো. মোস্তফা মনোয়ারকে। ষষ্ঠ মামলা: এ মামলায় করোনা বিষয়ক মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব-অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামে ৩ কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে পাঁচ জনকে আসামি করার সুপারিশ রয়েছে। তারা হলেন— ডা. ইকবাল কবীর, ডা. তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা, সিম করপোরেশনের ম্যানেজিং পার্টনার মো. মোস্তফা মনোয়ার এবং ব্রেইন স্টেশন ২৩ লিমিটেডের মালিক রইসুল কবীর। দুদকের উপ-পরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, ‘দুদকের অনুসন্ধানী দল প্রাথমিক সত্যতা পায়। পরে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নিম্নমানের কোভিড সামগ্রীর ক্রয় সংক্রান্ত এবং শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল।’ করোনাকালে মাস্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জেএমআই গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল দুদক, যদিও পরবর্তীতে আসামীদের অব্যাহতি দেয় সংস্থাটি। স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারির সময় একটি সিন্ডিকেট পকেট ভারী করলেও, দুদকের সখ্যতায় ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন সম্পর্কিত জাতীয় কমিটি সভাপতি ডা. রশীদ ই মাহবুব বলেন, ‘প্রতিটা সংকটে এক দল ভোগান্তিতে পড়ে, আরেক দলের ভাগ্য খোলে। দুদকে সমাজের এলিট শ্রেণির লোকজনের সখ্যতা রয়েছে। যার কারণে আপরাধ থাকলেও ম্যানেজ হয়ে যায়।
Go to News Site