Collector
কদর হারিয়েছে মাটির খেলনা, প্লাস্টিকের দখলে শৈশব | Collector
কদর হারিয়েছে মাটির খেলনা, প্লাস্টিকের দখলে শৈশব
Jagonews24

কদর হারিয়েছে মাটির খেলনা, প্লাস্টিকের দখলে শৈশব

‘ছোটবেলা থেকেই আমরা মাটির খেলনা বানিয়ে বড় হয়েছি। একসময় গ্রামের হাট-বাজারে মাটির পুতুল, বাচ্চাদের হাঁড়িপাতিল, গরু, ঘোড়া, হাতি এসব খেলনার দারুণ কদর ছিল। বাচ্চারা সেগুলো নিয়েই আনন্দে মেতে থাকত। কিন্তু বর্তমানে সময় সব বদলে গেছে। বাজার ভরে গেছে রঙিন প্লাস্টিকের খেলনায়। যেগুলো দেখতে চকচকে, টেকসই আর সহজে পাওয়া যায়। তাই বাচ্চারাও এখন মাটির খেলনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। এতে আমাদের তৈরি জিনিসের কদর যেমন কমেছে, তেমনি এই পেশাটাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন মৃৎশিল্পী সরস্বতী রাণী। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার পালপাড়ায় একসময় সকাল শুরু হতো মাটির হাঁড়ি-পাতিলের ঠুনঠুন শব্দে। কারিগরের নিপুণ হাতে তৈরি হতো নানান তৈজসপত্র ও খেলনা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। প্লাস্টিক ও মেলামাইনের সস্তা পণ্যের দাপটে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প। পালপাড়ার ছোট ছোট অন্ধকার ঘর আর জীর্ণ টিনের চালার নিচে এখন আর আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। একসময় যে চাকা অবিরাম ঘুরত, তা এখন থেমে যাওয়ার উপক্রম। আধুনিকতার ভিড়ে মাটির পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক কারিগর পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন। আরও পড়ুন- সংকটের মধ্যেও ঐতিহ্যের টানে কর্মব্যস্ত মৃৎশিল্পীরাপহেলা বৈশাখ ঘিরে কর্মব্যস্ত কুমারপাড়াবিলুপ্তপ্রায় মৃৎশিল্প প্রাণ ফিরে পায় পহেলা বৈশাখে এই সংকটের পেছনে রয়েছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি। আগের সহজলভ্য মাটি এখন কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। পাশাপাশি বেড়েছে জ্বালানি ও রঙের খরচ। কিন্তু বাজারে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারায় মাটির পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না কারিগররা। স্থানীয় নারী কারিগর রিনা পাল বলেন, আগে সারাদিন কাজ করলেও বিক্রি ভালো ছিল। এখন অনেক কষ্ট করে পণ্য বানাই, কিন্তু বিক্রি হয় না। সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে। কারিগর রঞ্জিত পাল বলেন, বাপদাদার এই পেশায় এখনো আছি, কিন্তু এতে ভবিষ্যৎ দেখি না। তাই নিজের কষ্ট হলেও সন্তানদের অন্য পেশায় পাঠিয়েছি, যেন তারা ভালো থাকতে পারে। দুলাল চন্দ্র পাল বলেন, এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজ করার কথাও ভাবছি। কারণ এই কাজে এখন আর পরিবার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আগে বৈশাখ এলে পাইকাররা অগ্রিম টাকা দিত, এখন হাতে গোনা কিছু পাইকার আসে, তাও বাকিতে মাল নিয়ে যায়। আরও পড়ুন- বাঁশ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় কয়েকটি পরিবারপ্রায় বিলীনের পথে মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য২০০ বছরের মৃৎশিল্পের টিকে থাকার লড়াই রতন পাল বলেন, সরকার যদি আমাদের প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা বাড়ায়, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিনে দেয়, তাহলে হয়তো আমরা এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে পারবো। দুই সন্তানের জনক হাফিজুর রহমান সুমন বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন মাটির খেলনা ছাড়া প্লাস্টিকের খেলনা খুব একটা পাওয়া যেত না। আমরাও মাটির খেলনাই কিনতাম। কিন্তু এখন আমার দুই সন্তানের পছন্দ প্রায় সবই প্লাস্টিকের খেলনা। এগুলো দেখতে রঙিন ও আকর্ষণীয়, আবার টেকসই হওয়ায় অভিভাবকেরাও এগুলোর দিকেই ঝুঁকছেন।” বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, পরিবেশবান্ধব মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারলেই প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো সম্ভব। এই শিল্পকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি করতে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি দেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিকলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তি জানান, এরইমধ্যে ৬ জন কারিগরকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কিছু কারিগরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। এফএ/এএসএম

Go to News Site