Somoy TV
বাংলার আকাশে জ্ঞান, কর্ম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য সমন্বয়ে উদিত এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চট্টলার প্রখ্যাত প্রবীণ আলেমেদ্বীন, আত্মদর্শী আল্লাহওয়ালা, সমাজ সংস্কারক ও দুনিয়াবিমুখ দাঈ ইল্লাল্লাহ–আল্লামা শাহ জালাল উদ্দীন (রহ.)।যিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ইতিহাসবিদদের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নীরব কর্মযজ্ঞের আবরণে যিনি নির্মাণ করেছেন গৌরবময় দীপ্ত ইতিহাস, যার অনুরণন আজও সমাজের অন্তঃস্থলে ধ্বনিত। জন্ম ও বেড়ে ওঠা: চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত পাহাড়ি প্রান্তবর্তী উপজেলা লোহাগাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ১৫ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা, জনাব হাজী নূর মোহাম্মদ (রহ:) ছিলেন এলাকার আলোকিত ব্যক্তিত্বদের একজন। সমাজসেবায় নিবেদিত প্রাণ, অসহায়-অনাথদের আপনজন, ধর্মনিষ্ঠ ও সংযমী চরিত্রের অধিকারী, এবং সৎ-সদাচারের প্রজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তার মাতা, হাজেরা খাতুন ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহভীরু, দ্বীনদার ও পরহেজগার এক রত্নগর্ভা নারী। এমন ধার্মিক ও স্নেহময় পিতা-মাতার ছায়ায় আশ্রয় পেয়ে শৈশব থেকেই তার অন্তরে দুনিয়াবিমুখতা, দীনের প্রতি ভালোবাসা এবং ইলম-আমলের প্রতি গভীর টান গড়ে ওঠে। ফলে জীবনের প্রথম পর্ব থেকেই তিনি হয়ে উঠেন দীনের খেদমতে নিবেদিত এক আলোকবর্তিকা। আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন শিক্ষা জীবন: শৈশবে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় চরম্বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অতঃপর কৈশোরে পদার্পণ করতেই তিনি অগ্রসর হন লোহাগাড়ার সুপ্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজঘাটা হুসাইনিয়া আজিজুল উলুমে। সেখানে মাধ্যমিক স্তরের পাঠ সম্পন্ন করে ভর্তি হন এশিয়ার ইতিহাস-গৌরবে ভাস্বর দ্বীনি শিক্ষায়তন জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ায়। পটিয়া মাদ্রাসার সেই রুহানি পরিবেশে, জগদ্বিখ্যাত পীর-বুজুর্গদের সাহচর্য ও স্নেহময় ছায়ায় তিনি আমল-আখলাকে হয়ে ওঠেন একজন সভ্য, মার্জিত ও দায়িত্বশীল যুবক। অসাধারণ মেধা, নিষ্ঠা ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে তিনি ১৯৮০ সালে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পঠন-পাঠনের পরিসমাপ্তি ঘটে। যাদের পরশে ধন্য তিনি পটিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে তিনি বহু বিদগ্ধ বুজুর্গ ও আধ্যাত্মিক সাধকের সান্নিধ্য লাভ করেন। বিশেষত; হযরতুল আল্লাম মাওলানা আহমদ (ইমাম সাহেব হুজুর রহ.), শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত মাওলানা শায়খ ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর রহ.), হযরতুল আল্লাম মাওলানা শায়খ হারুন ইসলামাবাদী সাহেব (রহ.), হযরতুল আল্লাম মাওলানা নুরুল ইসলাম কদীম সাহেব (রহ.), হযরতুল আল্লাম মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভী সাহেব (রহ.), এবং বিশ্ববিখ্যাত ভাষা-সাহিত্যিক, বিদগ্ধ মুহাদ্দিস ও স্বভাবকবি আল্লামা মুহাম্মদ সুলতান যওক নদভী (রহ.) এদের মতো যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও আধ্যাত্মিক মহাপুরুষদের নিকট তিনি ইলমে দ্বীন, ইহসান, ইকরাম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার গভীর শিক্ষা ও দীক্ষায় সমৃদ্ধ হন। তার শিক্ষা-গুরুদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ছিল বিস্ময়কর। পরম ভক্তি ও সম্মানের কারণে তিনি তাদের নাম উচ্চারণ না করে বরং উপাধি দিয়েই সম্বোধন করতেন। কখনো কখনো শিক্ষকদের কথা স্মরণে আসলে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠত। অন্যদিকে, হযরত নিজেও ছিলেন উস্তাদদের অনন্য স্নেহ-স্নিগ্ধতার পাত্র। তাদের স্নেহমাখা দৃষ্টি, দোয়া ও মায়ামমতার ছায়ায় তিনি হয়ে ওঠেন সত্যিকার ইলমের ধারক ও আধ্যাত্মিকতার সাধক। আরও পড়ুন: এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ.কর্মজীবনে পদার্পণ চট্টগ্রামের রাজঘাটা হুসাইনিয়া আজিজুল উলুম মাদ্রাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়েই হযরত আল্লামা শাহ জালাল উদ্দীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কর্মজীবনের শুভ সূচনা ঘটে। পরে আহাল্লাল্লাহুল বাই'য়াকে মনে প্রাণে ধারন করে মধ্যবর্তী কিছুকাল প্রবাস জীবন আপন করে নেন। প্রবাস থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে উস্তাদপ্রেমে উদ্বেলিত হযরতের পদক্ষেপ ফিরে যায় তার হারানো শিক্ষাগুরুদের মাকবারায়। কবর জিয়ারত কালে বানিয়ে পটিয়া প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন হযরত আল্লামা মুফতি আজিজুল হক সাহেব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাহেবজাদা আল্লামা মাহবুব (রহ:) তাঁকে প্রত্যক্ষ করে ছুটে যান তাঁর কাছে, বাড়িতে ফেরার পূর্বেই নিয়ে যান আল্লামার সুপ্রতিষ্ঠিত জামেয়ায়। ইলমের প্রতি আগাধ ভালোবাসায় আসন গ্রহণ করেন দোহাজারীর নববী মসনদে। দোহাজারী আজিজিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসায় দীর্ঘ সতেরো বছরের অধিক অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষকতার পেশায় নিযুক্ত থাকেন। শিক্ষকতার সেই দীর্ঘ সময়ে তাঁর ইলমি গভীরতা, পরিশ্রম ও আন্তরিকতা ছাত্র-শিক্ষক মহলে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। পরবর্তীতে প্রিয় উস্তাদ হযরত মাওলানা শায়খ ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর রহ.) ও অন্যান্য উস্তাদদের সুপরামর্শে ইলমের আলো গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দিতে স্বীয় জন্মভূমি লোহাগাড়ায় মনোনিবেশ করেন এবং সেখানে তিনটি স্বনামধন্য শিক্ষায়তন, চরম্বা সিদ্দিকিয়া মাদিনাতুল উলুম, জামিয়া ফাতিমাতুয যাহরা (রা:) বালিকা মাদ্রাসা, খরাইয়ানগরস্থ মোহাম্মদীয়া তাজবীদুল কুরআন। আরও পড়ুন: মাওলানা আব্দুল আলী রহ.-এর জীবন ও সংগ্রামের গল্প ইলমের এই প্রাণকেন্দ্রত্রয়ে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় মহাপরিচালকের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। ইলমি যোগ্যতা, পরিচালনায় দক্ষতা, চরিত্রের পবিত্রতা ও শিক্ষকতার অনন্য শৈল্পিক গুণে তিনি সকলের কাছে পরম প্রিয় পরিচালকে পরিণত হন। সর্বশেষ এই মহামনীষী আল্লামা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) প্রতিষ্ঠিত সুলতানিয়া ইসলামিক অ্যাকাডেমির দায়িত্ব প্রতিষ্ঠাতার সাহেবজাদার সাথে সর্বান্তকরণে নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে পালন করে তাঁর কর্মজীবনকে পূর্ণতা দান করেন। আধ্যাত্মিক দীক্ষা ও ইবাদতের চর্চা ছাত্রজীবন থেকেই ইবাদত-বন্দেগী ও সুন্নতে রাসূল (সা.)-এর প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে আল্লামা শাহ জালাল উদ্দিন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর। তিনি সারাটি জীবন আত্মশুদ্ধির সাধনায় নিবেদিত থেকে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন এক আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার আত্মশুদ্ধির মহা কর্মযজ্ঞে বিশেষ প্রভাব রেখেছেন আল্লামা শাহ জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ.) এবং আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.), যারা ছিলেন তার আধ্যাত্মিক সাধক। তাদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি আত্মশুদ্ধির গভীর জ্ঞান অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে অসংখ্য দ্বীনদার মুসলমানকে সেই পথের দীক্ষা দেন।তার জীবন ছিল ইবাদতনির্ভর, নিয়মিত জিকির-আজকার, কোরআন তেলাওয়াত ও নফল ইবাদত ছিল তার নিত্যসঙ্গী। বার্ধক্যের ক্লান্তি সত্ত্বেও তাহাজ্জুদ, তাসবিহ, ইলম, ইবাদত, সবই ছিলো তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি জীবনের অন্তিম প্রহরে অসুস্থ অবস্থায় শয্যায় থেকেও নামাজ ও জিকিরে নিমগ্ন থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার অন্তরে সদা জাগ্রত ছিল। ইন্তেকাল হযরত (রহ.) ২৪ জামাদিউস সানি ১৪৪৬ হিজরি, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং, শুক্রবার বিকেলে ইন্তেকাল করেন। যদিও তা ছিল শুক্রবারের বিকেল, তবুও বিকেলটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন নিঃশব্দ, থমকে যাওয়া, আধাঁরের ঘন কালো আবরণে মোড়া, এক শূন্যতা-বিধুর বেদনাময় বিকেল। সে বিকেলে আল্লামার মেজো ও ছোট ছেলে (শাহাদত এবং হুজাইফা) ছিল চৌহদ্দির বদ্ধ বাসায়, ব্যক্তিগত ব্যস্ততায় নিমগ্ন। এমন মুহূর্তে অকস্মাৎ ডাক আসে, আস্তার পথিক প্রিয় বাবার। যিনি বটবৃক্ষের ন্যায় সারা জীবন ছাঁয়া দিয়েছেন, সুখে-দুখে সঙ্গ দিয়েছেন নিজেকে উজাড় করে দিয়ে। ভালোবেসেছেন নিজের সবটুকু আবেগ-অনুভূতি দিয়ে। আনন্দঘন মুহূর্তে ছিলেন হাস্যজ্জল চেহারাতে আনন্দের আশ্রয়স্থল হয়ে, বেদনার নির্মমকালে ছিলেন দুঃখ দূরীকরণের দ্রব্যময় হয়ে।ছেলেরা জানত না—সে ডাক যে বাবার চিরতরে হারিয়ে যাবে বলার ছিলো, শেষ বিদায়ের অন্তিম কালের ডাক ছিলো। সাহেবজাদা সাড়া দিতে তিব্র গতিতে ছুটে গিয়ে দেখলেন, বাবার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে আছে; যন্ত্রণার কঠিন ব্যধিতে ভুগছেন তিনি। সবেমাত্র নামাজ পড়ে বসেছেন, তখনো হাতে তসবিহ, মুখে রবের নাম। ছেলে যেতেই হযরত বললেন; আব্বু! আমার খুব খারাপ লাগছে, আমাকে একটু শুইয়ে দাও!" বাবার এমন মলিন চেহারা দেখে, ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল ছেলেরা, কিন্তু তাদের দেখে বাবাও যেন ভেঙে না পড়েন। যন্ত্রণার জাল বিস্তৃত হলেও মনের সাহসটুকু যেন অন্তত পান। সে ভাবনায় মনকে মাতিয়ে বাবার আদেশ মানার নিমিত্তে নিজেদেরকে দ্রুত সামলিয়ে নিল। তার কথা মতো শুইয়ে দিতে গিয়েই শুরু হলো জীবনের সবচেয়ে করুণ শোকে বলি করার মূহুর্ত অনন্ত শূন্যতার দ্বারপ্রান্ত। কালের দুর্বিপাকে বিপদ তার সমস্ত গুণাবলি নিয়ে হাজির হলো, রবের নাম জপতে জপতে স্বীয় জীবনের পাঠ চুকাতে বাবার নিথর দেহ অযাচিতে ঢলে পড়লো কলিজার টুকরো ছেলেমেয়েদের কাঁধে। এভাবেই পরিবার-পরিজনকে বেদনায় বিপন্ন করে, শোকে কাতর করে পরপারে পাড়ি জমালেন আল্লামা শাহ জালাল উদ্দিন (রহ:)। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে শায়খের বয়স ছিল ৬৬ বছর। পরদিন শনিবার সকাল ১০টায় হযরতের পরিচালিত চরম্বা সিদ্দিকীয়া মদিনাতুল উলুম মাদরাসা মাঠে তাঁর বিশাল নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় অসংখ্য আলেম, শিক্ষার্থী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগমে জানাজা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অতঃপর তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামিয়া ফাতিমাতুয যাহরা (রা:) মাদ্রাসা সংলগ্ন মাকবারায় দাফন করা হয়। জানাযার ইমামতি করেন হযরতের সুযোগ্য বড় সন্তান মাওলানা মাহমুদুল হাসান (হাফিজাহুল্লাহ)। অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন তাঁরই সুযোগ্য সাহেবজাদা, জামিয়া ফাতিমাতুয যাহরা (রা:) মাদ্রাসার সম্মানিত পরিচালক, মাওলানা মোহাম্মদ বিন জালাল (হাফিজাহুল্লাহ)। পারিবারিক জীবন মৃত্যুর সময় হযরত (রহ.) সহধর্মিনী, চার পুত্রসন্তান, চার কন্যাসন্তানসহ অসংখ্য উত্তরসূরী ও গুণগ্রাহী রেখে যান। কন্যা চারজন উম্মে হাফসা, নুসাইবা আক্তার, তাহমিনা সুলতানা ও সুমাইয়া সুলতানা। পুত্র চারজন হলেন-১. মাওলানা মাহমুদুল হাসান, ২. জনাব শাহাদত হোসাইন, ৩. মাওলানা মোহাম্মদ বিন জালাল, ৪. হাফেজ মোহাম্মদ হুজাইফা (দারুল মা'আরিফ অধ্যায়নরত)। আলহামদুল্লিাহ পরিবারের সকলে আলিম ও তালিবুল ইলম। আল্লাহ তা’আলা সকলকে তার রেখে যাওয়া দ্বীনি ও ইলমী ধারা অটুটভাবে বহন ও সংরক্ষণ করে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়ার তাওফীক দান করুন। আমিন।চরম্বা, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
Go to News Site