Somoy TV
কোরআন কারিম আল্লাহ তাআলার পবিত্র কালাম। মুজিযাপূর্ণ ঐশী বাণী। এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি মহান নেয়ামত। কুরআন কারীমের প্রতি বান্দার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে।সেসবের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল কুরআন কারীমের তাদাব্বুর। অর্থাৎ শিক্ষাগ্রহণের নিয়তে জাগ্রত হৃদয় নিয়ে কুরআন কারীম থেকে উপলব্ধিপূর্ণ তিলাওয়াত করা। কুরআন কারীমের তাদাব্বুর, মুমিনের ঈমানকে সতেজ করে। কেননা, এর শব্দ বাক্যে রয়েছে আসমানী নূরের ছটা ও অলৌকিক দ্যুতি। একজন মুমিন কুরআন কারীমের তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে দিবানিশি স্নাত হতে থাকে অপার্থিব স্নিগ্ধ আলোয়। ঈমানী নূরে বিধৌত হয় তার দেহ মন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ আর যখন তাদের সামনে কুরআনের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ঈমান আরো বাড়িয়ে দেয় এবং তারা আপন রবের ওপর নির্ভর করে। (সুরা আনফাল: ২)সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মাহর পূর্বসূরি সালাফের জীবনী পাঠ করলে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, তারা নিয়মিত তাদাব্বুরের সঙ্গে কুরআন কারীমের তিলাওয়াত করতেন। কুরআনের অপার্থিব মাধুর্য ও অনিন্দ্য লালিত্যে বিমোহিত থাকতেন তারা। কুরআন কারীমের জীবন্ত তিলাওয়াত তাঁদের হৃদয়কে সজীব ও আত্মাকে আত্মাকে আলোকিত করে তুলতো। সে আলোয় তাঁরা চারপাশকে করে তুলতেন আলোকিত। খলীফায়ে রাশেদ হযরত উসমান রা. বলেন,لو أن قلوبنا طهرت ما شبعنا من كلام ربنا যদি আমাদের অন্তরগুলো (হৃদয়) পবিত্র হতো, তবে আল্লাহ তাআলার কালাম (কুরআন) থেকে আমরা কখনও তৃপ্ত হতাম না। (অর্থাৎ আমরা অনবরত তা পড়তেই থাকতাম)। (আল ই’তিকাদ বাইহাকী, পৃ.: ১০৫) আরও পড়ুন: পড়াশোনার নামে নির্যাতন: কী বলে ইসলাম? হযরত আলী রা. বলেন, ولا خير في قراءة ليس فيها تدبر. তাদাব্বুর ও চিন্তা ভাবনাহীন তিলাওয়াতে (পরিপূর্ণ) কল্যাণ নেই। (মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল, পৃ: ১৪৮) বস্তুত কুরআন কারীমের তিলাওয়াতের পূর্ণ স্বাদ পেতে হলে তাদাব্বুরের বিকল্প নেই। আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী রহ. (মৃত্যু: ৭৯৪হি.) বলেন,ومن لم يكن له علم وفهم وتقوى وتدبر لم يدرك من لذة القرآن شيئا যে ব্যক্তির মাঝে ইলম, বুঝ বুদ্ধি, তাকওয়া ও তাদাব্বুরের সিফাত থাকবে না, সে কুরআন কারীমের স্বাদ মোটেও পাবে না। (আল বুরহান ফী উলূমিল কুরআন ২/১৫৫) কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হল, বর্তমান সময়ে ব্যাপকভাবে আমাদের কওমী মাদরাসাসমূহের অবস্থা হল (অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) যে আমদের নেসাবের মধ্যে কুরআন কারীমের বিষয়টি বড়ই অবহেলিত। কুরআন কারীমের ইলমার্জনের জন্য শিক্ষাজীবনের বিরাট একটি অংশ নাহব, সরফ, মানতেক, উর্দূ, ফারসী ইত্যাদি শেখাতেই চলে যায়। কিন্তু সরাসরি কুরআন হাদিস চর্চার সময় আসলে তখন আর হাতে সময় থাকে না। বরং তখন সময় অনেকটা সংকুচিত হয়ে আসে। যার ফলে সমানভাবে সবার ক্ষেত্রে দরসের মধ্যে কুরআন হাদিসের সরাসরি চর্চার সুযোগটি খুব বেশি একটা হয়ে ওঠেনা। তবে কোনো কোনো চিন্তাশীল উলামায়ে কেরাম ও আহলে মাদারিস এ বাস্তবতাকে যথাযথ অনুধাবন করতে পেরে কিছু কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছেন। নিঃসন্দেহে তাঁদের চেষ্টা মেহনত প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা তাঁদের জাযায়ে খায়ের দান করুন। এর মধ্যে অন্যতম হল যা বৃহত্তর চট্টগ্রামের অন্যতম সুপ্রসিদ্ধ ইলমী প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়া আযীযুল উলূম পোকখালী, কক্সবাজার এর আসাতিযায়ে কেরাম আবিস্কার করেছেন। সেটি হচ্ছে কুরআন কারীম কেন্দ্রীক একটি ব্যতিক্রমধমীর্ বিতর্কানুষ্ঠান। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে (শাওয়াল মাসে) প্রায় মাদরাসার তালিবে ইলমরা যখন ভর্তি হয়ে বাড়িতে অবস্থান করে, ওই সময় তালিবে ইলমদের সময়কে কাজে লাগানোর জন্য তাঁরা ধারাবাহিকভাবে কুরআন কারীমের কিছু অংশের উপর বিগত প্রায় ৩ দশক ধরে তাফসীরী ও নাহবী সরফী বিশ্লেষণকেন্দ্রীক একটি বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছেন। পরবতীর্তে পোকখালী মাদরাসার কয়েকজন কৃতী সন্তানের মাধ্যমে এ আয়োজনটির পূর্ণতা লাভ করে ফেনীর ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া সিলোনিয়া মাদরাসায়। এ আয়োজনটিকে কেন্দ্র করে মাদরাসার লাইব্রেরীতে সংগ্রহ করা হয়েছে কুরআন কারীমের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার ওপর বহু জরুরি কিতাব। তালেবে ইলমরা এর প্রস্তুতি হিসেবে কুরআন কারীমের অনুবাদ, তাফসীর, ভাষাশৈলী ও নাহব সরফ বিষয়ক আরবি উর্দূ ও বাংলা ভাষায় লিখিত কিতাবাদি ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে মুতালাআ করে থাকে। এর মাধ্যমে কুরআন কারীমের প্রতিটি শব্দ বাক্যের জ্ঞান সাগরে ডুব দিয়ে কিভাবে মণি মুক্তা কুঁড়িয়ে আনতে হয়, তালেবে ইলমরা হাতে কলমে এর প্রশিক্ষণ নেয়। বিশেষত: এ আয়োজনটিতে কুরআন কারীমের প্রতিটি শব্দ ও বাক্যের নাহবী, সরফী, তাফসীরী ও ভাষাগত বিশ্লেষণ এবং অনুবাদ পর্যালোচনার দক্ষতা অর্জনের ওপরই বেশি জোর দেয়া হয়। এর জন্য তালিবে ইলমদের এসব বিষয়ে ব্যাপক মুতালাআ করতে হয়। ফলে দরসে নেযামীতে পড়াকালীনই তালিবে ইলমদের কুরআন কারীম কেন্দ্রীক বিভিন্ন ইলমী ও শাস্ত্রীয় কিতাবাদির উসলুবের সঙ্গে পরিচিতি লাভের সুযোগ তৈরি হয়, যা সাধারণতঃ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাখাসসুস ও বিশেষায়িত পড়াশোনা ছাড়া অর্জিত হয়না। এছাড়া এর সবচেয়ে বড় উপকারিতার দিক হল, কোনো তালিবে ইলমের নাহবী, সারফী ও কিতাব বোঝার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা থাকলে শিক্ষাবর্ষের শুরুতে এর মাধ্যমে সেটিও কাটিয়ে ওঠার বিরাট সুযোগ তৈরি হয়। অনুষ্ঠানটির শেষে অন্য মাদরাসা থেকে আগত নতুন তালেবে ইলমদের থেকে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া শোনা হয়। এবং তাদের কোনো পরামর্শ থাকলে সেটিও সাদরে গ্রহণ করা হয়। সমষ্টিগতভাবে জামিয়ার সকল তালেবে ইলমের অনুভূতি হল, ইলমী জীবনে পথচলার ক্ষেত্রে এ আয়োজনটির উপকারিতা ব্যাপক। মোটকথা, কুরআন কারীমের একটি আয়াত থেকে কতভাবে যে মণিমুক্তা আহরণ করা যায় তা এ আয়োজনটি না দেখলে বোঝা যাবে না। এ বিতর্কানুষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে “কাশফুল আসরারিন নাহবিয়্যাহ ফীল আয়াতিল কুরআনিয়্যাহ” নামে দু’ খন্ডের একটি ইলমী কিতাবও তৈরি হয় আলহামদুলিল্লাহ। যা উপমহাদেশের ইলমী মহলে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। কিতাবটি সংকলন করেন জামিয়া মাদানিয়া ফেনীর সাবেক সিনিয়র শিক্ষক, বিতর্কানুষ্ঠানটির দায়িত্বশীল (বর্তমান শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম) হযরত মাওলানা নাসিরুদ্দীন। কিতাবটির প্রথম খন্ড প্রকাশিত হওয়ার পর যখন দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক শাইখুল হাদীস আল্লামা সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রহ. এর হস্তগত হয়, হযরত দেখে অত্যন্ত খুশি হন। এবং সংকলককে ফোন করে কিতাবটির অত্যন্ত প্রশংসা করেন ও উৎসাহ দেন। এবং এভাবে পুরো কুরআন কারীমের ওপর কাজ করার জোর তাগিদ দেন। আরও পড়ুন: হজ ও ওমরার সওয়াব পাওয়া যায় ৫ আমলেএছাড়া উপমহাদেশের অনেক মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম এ আয়োজনটি পরিদর্শন করে এর উপকারিতার বিষয়ে মতামত পেশ করেছেন। বিশেষতঃ শাইখুল ইসলাম আল্লামা আহমদ শফী রহ., পটিয়া মাদরাসার সাবেক শাইখুল হাদীস আল্লামা আইয়ুব রহ., ইন্ডিয়ার ফিকহ একাডেমীর সেক্রেটারী জেনারেল শাইখ মুফতী উবায়দুল্লাহ আসআদী দা.বা., আল্লামা নূরুল ইসলাম আদীব দা.বা., আল্লামা আবদুল হালীম বুখারী রহ., বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়্যাহর নাহু—সরফ প্রশিক্ষক মাওলানা শিব্বির আহমাদ রহ., পটিয়া মাদরাসার শাইখুল হাদীস, আল্লামা মুফতী শামসুদ্দীন জিয়া দা.বা. ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা ওবায়েদুল্লাহ হামযাহ দা.বা.সহ দেশবরেণ্য বহু উলামায়ে কেরাম। অভিজ্ঞতার আলোকেও দেখা গেছে কুরআন কারীমকেন্দ্রীক এ আয়োজনটি তালিবে ইলমদের ইলমী ও আমলী যিন্দেগীতে বিরাট পরিবর্তন সাধন করতে সম্ভব। তাই জামিয়ার ফাযেলদের প্রতি আসাতিযায়ে কেরামের দাবী হল খেদমতের জীবনে যেখানেই যাওয়ার সুযোগ হয়, প্রত্যেকে যেন ছোট পরিসরে হলেও তালেবে ইলমদের নিয়ে কুরআন কারীম কেন্দ্রীক এ ধরনের মেহনত চালু করে। জামিয়ার ফুযালায়ে কেরামের অনেকে বিভিন্ন জায়গায় এ আয়োজনটি চালু করেছেন। এবং তা সংশ্লিষ্ট মহলে সাড়াও জাগিয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা আশাবাদী, এদেশের উলামায়ে কেরাম ও আহলে মাদারিস এ বিষয়ে ফিকির করবেন। আল্লাহ তাআলা সংশ্লিষ্ট সকলের মেহনতকে কবুল করুন। আমীন। লেখক: উস্তাযুল হাদীস ওয়াল ফিকহ, জামিয়া দারুল ঈমান (বেগম মসজিদ) চাঁদপুর। খিররীজ, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়াহ ঢাকা। ফাযেল, জামিয়া মাদানিয়া ফেনী।
Go to News Site