Jagonews24
সরকারি চাকরিতে সব সময়ই খালি থাকছে লাখ লাখ পদ। ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সর্বনিম্ন দুই লাখ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ পর্যন্ত পদ খালি ছিল। দেশে উচ্চ বেকারত্বের মধ্যেও খালি থাকছে পদ। বিপুল সংখ্যক পদ খালি থাকায় সরকারি কাজে বিঘ্ন ঘটছে, জনগণ পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। বর্তমান সরকারের দায়িত্বশীলরা জানান, সরকারি চাকরিতে পদ শূন্য হওয়া ও পদ পূরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। কারণ প্রতিনিয়ত কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে যাচ্ছেন। আবার নিয়োগও চলছে। একই সঙ্গে নতুন পদ সৃষ্টিও হচ্ছে। তাই নিয়োগ কার্যক্রম জোরদার করা হলেও সব সময়ই অনুমোদিত পদের একটি অংশ খালি থাকবেই। সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর চরম বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে প্রশাসন। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকা সব কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তাই নিয়োগ কার্যক্রমও অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায় তখন। পরে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদগুলোতে নিয়োগ ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি। তাই বড় সংখ্যক পদ এখনো খালি। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার পদ খালি ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৫ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলমান। যে হারে নতুন পদ সৃষ্টি হয়েছে সে অনুপাতে নিয়োগ হয়নি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। এ কারণে প্রতি বছরই সৃষ্ট পদের বিপরীতে পাল্লা দিয়ে শূন্যপদের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২০১০ সালে ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৮২টি থাকলেও ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয় ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫১৮টি। দেশে কত মানুষ বেকার সরকারের কাছে এ বিষয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তবে গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে। গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশের বেকার জনগোষ্ঠী বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে। এর আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৪ লাখ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। শূন্য পদগুলো পূরণ হচ্ছে। শূন্যপদ পূরণ সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। পিএসসি থেকে শুরু করে সবাই নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কর্মকর্তারা অবসরে যাবেন, আবার পদ পূরণ হবে, এভাবেই চলতে থাকবে।-জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী চাকরিপ্রত্যাশীরা জানান, সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া মূলত খুবই ধীরগতির। মামলা-মোকদ্দমাসহ বিভিন্ন ধরনের জটিলতার কারণে সব প্রতিষ্ঠান চাইলেই নিজেদের মতো করে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিতে পারছে না। এছাড়া গত এক বছরের বেশি সময়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগ কার্যক্রম বলতে গেলে বন্ধ ছিল। সরকার যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ ও গতিশীল করে তবে এত পদ খালি থাকে না। দ্রুত নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে সরকারের কাজে যেমন গতি ফিরবে, তেমনি দেশের বেকার সমস্যার ক্ষেত্রে তা অল্প পরিসরে হলেও ভূমিকা রাখবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভ করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলটির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থায় পাঁচ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারীর পদ শূন্য। যত দ্রুত সম্ভব স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধাবী তরুণ-তরুণীকে শূন্যপদে নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা চেয়ে গত ৭ মার্চ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি পাঠায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও দপ্তর-সংস্থার শূন্যপদে নিয়োগের পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পাঠায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী জাগো নিউজকে বলেন, ‘শূন্য পদগুলো পূরণ হচ্ছে। শূন্যপদ পূরণ সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। পিএসসি থেকে শুরু করে সবাই নিয়োগের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। কর্মকর্তারা অবসরে যাবেন, আবার পদ পূরণ হবে, এভাবেই চলতে থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মোট পদের ১০ শতাংশ লিভ রিজার্ভ রাখতে হয়। এ বিষয়গুলো একটা সিস্টেমে চলে।’ সরকারি শূন্যপদের মধ্যে বড় অংশটিই হচ্ছে তৃতীয় (১৩ থেকে ১৬তম গ্রেড) ও চতুর্থ (১৭ থেকে ২০তম গ্রেড) শ্রেণির। প্রথম থেকে ১২তম গ্রেডের (আগের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) পদগুলোতে নিয়োগ দেয় সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি)। আর ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের (তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) পদে সরাসরি নিয়োগ দেয় মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর। সরকারি চাকরিতে ১৫ বছরে শূন্যপদের পরিসংখ্যান সরকারি চাকরির পদ, শূন্যপদসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি নিয়ে প্রতি বছর ‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিসংখ্যান’ শিরোনামে পুস্তক প্রকাশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সবশেষ ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান নিয়ে বই প্রকাশ করা হয়েছে। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি অফিসগুলোয় মোট শূন্যপদ ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে শূন্যপদ ৬৮ হাজার ৮৮৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি, তৃতীয় শ্রেণিতে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি, চতুর্থ শ্রেণিতে ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি এবং অন্য শ্রেণিতে শূন্যপদ ৮ হাজার ১৩৬টি। গত ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। সরকার শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ জোরদার করতে চাইছে। আমরাও তো সেটার অংশ। সুতরাং, আমরাও সেই প্রচেষ্টা নিচ্ছি। যাতে নিয়োগগুলো দ্রুত করা যায়।-পিএসসি চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শূন্যপদের সংখ্যা প্রতি বছরই বেড়েছে। সরকারি চাকরিতে ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬৭টি, ২০১১ সালে ২ লাখ ৫৪ হাজার ২০৫টি, ২০১২ সালে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৬৪টি, ২০১৩ সালে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৫৮৭টি পদ খালি ছিল। আরও পড়ুন দেশে মোট বেকার ২৬ লাখ ২০ হাজার: বিবিএসউচ্চশিক্ষিত বেকারত্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান: তারুণ্যের ভবিষ্যৎ কোন পথে? শূন্যপদের সংখ্যা ২০১৪ সালে ৩ লাখ ২ হাজার ৯০৪টি, ২০১৫ সালে ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩১১টি, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ২৬১ এবং ২০১৭ সালে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৯৭টি ছিল। ২০১৮ সালে ৩ লাখ ৯৩ হাজার ২৪৭টি, ২০১৯ সালে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি, ২০২০ সালে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫ এবং ২০২১ সালে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫টি, ২০২২ সালে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৭৬টি এবং ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৭৩ হাজার একটি পদ ফাঁকা ছিল। নিয়োগ গতিশীল-স্বচ্ছ করতে উদ্যোগ সফল হয়নি শূন্যপদগুলো আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে পূরণে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো সফল হয়নি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির আড়াই লাখেরও বেশি পদ খালি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সরাসরি নিয়োগযোগ্য এ পদগুলো দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে এসব পদে নিয়োগের এখতিয়ারাধীন মন্ত্রণালয়-বিভাগ ও দপ্তর-সংস্থাগুলোকে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এক মাসের মধ্যে এসব শূন্যপদে নিয়োগের অনুরোধ জানিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে পছন্দের লোক নিয়োগ, অর্থের বিনিময়ে নিয়োগসহ প্রায়ই নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদে দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগের জন্য একটি কমিশন গঠনের বিষয়টি সামনে আসে। কিংবা প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির মতো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগ পিএসসির মাধ্যমে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতি নির্ধারণে পিএসসিকে প্রস্তাব দিতে বলা হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সেই প্রস্তাব জমা দেয় পিএসসি। পরে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডে নতুন কোন কর্তৃপক্ষ ও পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়া হবে, এ বিষয়ে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) দেওয়া প্রস্তাব যাচাই করে সুপারিশ দিতে একটি কমিটিও করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে আট সদস্যের যাচাই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিটি পিএসসির মাধ্যমে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের নিয়োগের সুপারিশ করে। এ সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে বর্তমান সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু, পরবর্তীসময়ে সেই সুপারিশ আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম জাগো নিউজকে বলেন, \'সরকারের পক্ষ থেকে শূন্য পদের বিষয়ে যে রিকুইজিশন দেওয়া হয়, আমরা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। আমাদের তো এর বাইরে গিয়ে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সাধারণত দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিই। নন-ক্যাডারের ক্ষেত্রে যাতে বেশি নিয়োগ দেওয়া যায়, সেটার জন্য আমাদের চেষ্টাটা অব্যাহত থাকবে।’ সরকারি চাকরির পরীক্ষাপিএসসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘যে নিয়োগ সাড়ে তিন বছরে হতো, সেটি আমরা এক বছরের মধ্যে নিয়ে এসেছি। আমরা সেটা ১০ মাসেও পারবো। সেদিকেই আমরা যাচ্ছি। আগে আমরা একবছরটা শেষ করি, তারপর আমরা সেই উদ্যোগ নেবো।’ ‘সরকার শূন্য পদগুলোতে নিয়োগ জোরদার করতে চাইছে। আমরাও তো সেটার অংশ। সুতরাং, আমরাও সেই প্রচেষ্টা নিচ্ছি। যাতে নিয়োগগুলো দ্রুত করা যায়\', বলেন মোবাশ্বের মোনেম। বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটা বড় অংশই এখন বেকার। দীর্ঘদিন ধরেই বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বেশিরভাগই এখন সরকারি চাকরির জন্য অপেক্ষা করেন বছরের পর বছর। চাকরির পরীক্ষা দিয়ে দিয়ে অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়, কারণ যে পরিমাণ চাকরিপ্রত্যাশী তার তুলনায় চাকরির সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা চাকরির বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বেকারত্ব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশে বিপুল সংখ্যক সরকারি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকলেও তা পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি পদ খালি রয়েছে, যা ইচ্ছা করলে দুই বছরের মধ্যেই পূরণ করা সম্ভব। এসব পদ পূরণ করা গেলে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, অন্যদিকে লাখো পরিবারের আর্থিক স্থিতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।-অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। গত এক মাস ধরে কাজপ্রত্যাশী ও সবশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পান, তাদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংজ্ঞা। গত বছরের ১৮ মে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ প্রকাশ করে। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বেকারত্বের হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ঠেকেছে। গত অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। গত বছরের একই সময়ে বেকারত্বের হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। বেকারের এই নতুন হিসাবটি ১৯তম আইসিএলএস (পরিসংখ্যানবিদদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন) অনুযায়ী প্রস্তুত করে বিবিএস। ১৩তম আইসিএলএসে ডিসেম্বর শেষে দেশের বেকারত্বের হার ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ১৯তম আইসিএলএস অনুযায়ী দেশের বেকার জনগোষ্ঠী বেড়ে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৪ লাখ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার। তবে দেশে কর্মসংস্থানের যে পরিস্থিতি, সেই অনুযায়ী মাত্র ২৭ লাখ বেকার, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় সংশ্লিষ্টদের কাছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা সরকারের দেওয়া হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ওই সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। বেকারত্ব বাড়ার কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকা ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেশি হওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করার পর চাকরি খুঁজছেন রাজধানীর ডেমরার হাজিনগর এলাকার মোহাম্মদ আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বিক বেকারত্ব বিবেচনায় সরকারের শূন্য পদে নিয়োগে জোর দেওয়া উচিত। এখনো সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা একটা বড় সমস্যা। সরকারের উচিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গেই সময় নির্ধারণ করে দেওয়া, যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। তাহলে নিয়োগের ক্ষেত্রে গতি আসবে।’যোগাযোগ করা হলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে বিপুল সংখ্যক সরকারি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে থাকলেও তা পূরণে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি পদ খালি রয়েছে, যা ইচ্ছা করলে দুই বছরের মধ্যেই পূরণ করা সম্ভব। এসব পদ পূরণ করা গেলে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, অন্যদিকে লাখো পরিবারের আর্থিক স্থিতি ও জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। পাঁচ লাখ মানুষের চাকরি মানে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারি নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান- যেমন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন আগেই বিদ্যমান। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারে। সমস্যা মূলত ব্যবস্থাপনায় নয়, বরং সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতিতে।’ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে কারিগরি বা টেকনিক্যাল দক্ষতার ঘাটতি থাকতে পারে, তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যত সংখ্যক শিক্ষার্থী বের হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ এসব পদে কাজ করার মতো সক্ষমতা রাখে। যদি কোথাও ঘাটতি থেকেও থাকে, নিয়োগের পর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা পূরণ করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, বেকারত্বকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তবে এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ কম দেখা যায়। বেকারত্ব নিয়ে অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই গুরুত্ব প্রতিফলিত হয় না।’ আরএমএম/এএসএ/ এএমএফ
Go to News Site