Somoy TV
ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সবার প্রাণের উৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির ঐক্যের প্রতীক, এখানে সাম্প্রদায়িকতার যেমন কোনো স্থান নেই তেমনি ধর্মকেও এখানে টেনে আনার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করারও কোনো সুযোগ নেই। ইসলাম সহজ সরল শান্তি আর সম্প্রীতির ধর্ম। কোনো দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের আনন্দ-উৎসবকে ইসলাম কখনই বাঁধা দেয় না।হাদিস থেকে জানা যায়, একবার আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে হাবশিদের রণকৌশলের খেলা দেখে হজরত রাসুল করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশংসা করে বলেছেন, ‘কত সুন্দর এ আনন্দ!। হাদিসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, কোনো এক ঈদের দিন হজরত রাসুল (সা) আমাকে হাবশীদের খেলা দেখার জন্যে ডাকলেন। মসজিদের ভেতর তারা বর্শা চালনায় নিজেদের নৈপুণ্য প্রদর্শন করছিলো। হজরত রাসুল (সা) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম: হ্যাঁ। তারপর আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। তিনি এমনভাবে নীচু হয়ে দাঁড়ালেন যেন তাঁর কাঁধে আমার থুতনি রাখতে পারি। আমি তাঁর গালের সাথে গাল লাগিয়ে খেলা দেখতে লাগলাম। এমনকি হজরত রাসুল করিম (সা) কয়েকবার দেখা ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করলেও আমি বললাম, ‘আরেকটু অপেক্ষা করেন!’ সত্যি বলতে কি, খেলা দেখার প্রতি আমার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। সেদিন বরং আমি চেয়েছিলাম, বিশেষ করে, নারীরা জানুক তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক কেমন। তাই, তোমরা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের প্রতি তরুণীদের আগ্রহকে সুদৃষ্টিতে দেখো।’ (সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম) -এ থেকে বোঝা যায় যদি ইসলামবিরোধী না হয় আর বান্দা ও আল্লাহর হকের ক্ষতির কারণ না হয়, তবে যে কোনো ধরনের আনন্দ-উৎসব জায়েজ। হজরত ইমাম আবু হানিফা (রহ.)এর দাদা তার পিতাকে পারস্যের নওরোজের দিন অর্থাৎ নববর্ষের দিন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়া বা তৌহফা পেশ করেছিলেন। তখন হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম’ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব নিকাশ করবে এবং নবউদ্যমে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে। আরও পড়ুন: ভূমিকম্প আল্লাহপাকের সতর্ক সংকেত ইসলাম আমাদেরকে কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ি না করার শিক্ষা দেয়। প্রতিটি জাতির নিজস্ব উৎসব আছে। কোনো জাতি ইসলাম গ্রহণ করলে তার সব সংস্কৃতি ছেড়ে দিতে হবে, এমন কোনো নির্দেশনা আদৌ কোথাও আছে কিনা তা আমার জানা নেই। অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাদের পুরানো হিসাবনিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। এ উপলক্ষ্যে তারা নতুন-পুরাতন খদ্দেরদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মিষ্টি বিতরণ করতেন এবং নতুনভাবে তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করতেন। চিরাচরিত এ অনুষ্ঠানটি আজও পালিত হয়। মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে। পাকিস্তান শাসনামলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের। আর ষাটের দশকের শেষে তা বিশেষ মাত্রা পায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনের মাধ্যমে। এ সময় ঢাকায় নাগরিক পর্যায়ে ছায়ানটের উদ্যোগে সীমিত আকারে বর্ষবরণ শুরু হয়। আমাদের মহান স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এই উৎসব নাগরিক জীবনে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। কালক্রমে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এখন শুধু আনন্দ-উল্লাসের উৎসব নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি শক্তিশালী ধারক-বাহক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা যে বাঙালি, বিশ্বের বুকে এক গর্বিত জাতি, পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণে আমাদের মধ্যে এই স্বাজাত্যবোধ এবং বাঙালিয়ানা নতুন করে প্রাণ পায়, উজ্জীবিত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে বাংলা নববর্ষ সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। লেখক: কলামিস্ট
Go to News Site