Collector
ডক্টর মাওলানা মুস্তফা আজমি: একজন কীর্তিমান মনীষার জীবনালেখ্য | Collector
ডক্টর মাওলানা মুস্তফা আজমি: একজন কীর্তিমান মনীষার জীবনালেখ্য
Somoy TV

ডক্টর মাওলানা মুস্তফা আজমি: একজন কীর্তিমান মনীষার জীবনালেখ্য

ইসলামি জ্ঞানচর্চার বিশাল ভুবনে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা নিজস্ব মেধা, শ্রম ও গবেষণার দীপ্তিতে একেকটি যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। ডক্টর মুহাম্মদ মুস্তফা আজমী তেমনই এক আলোকবর্তিকা হাদিসচর্চার ইতিহাসে যাঁর অবদান একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান।১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের উত্তর প্রদেশের মউ অঞ্চলে তাঁর জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি জ্ঞানান্বেষণের যে অন্তর্গত তাড়নায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন, তা পরবর্তীতে তাঁকে পৌঁছে দেয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ-এ। ১৯৫২ সালে সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি যে বৌদ্ধিক ভিত্তি অর্জন করেন, সেটিই তাঁর পরবর্তী গবেষণাজীবনের মৌলিক কাঠামো নির্মাণে সহায়ক হয়। পরবর্তী পর্যায়ে তার জ্ঞানযাত্রা বিস্তৃত হয় মিসরের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়-এ, যেখানে ১৯৫৫ সালে তিনি ‘আলিমিয়্যাত’ ডিগ্রি লাভ করেন। এই সময়েই তার চিন্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর ঘটে প্রচলিত জ্ঞানধারার সঙ্গে তুলনামূলক ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির সংলাপ শুরু হয়। কাতারে অবস্থানকালে একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণাপ্রবণ মনকে আরও প্রগাঢ় করে তোলে; পান্ডুলিপির নিঃশব্দ জগতে তিনি আবিষ্কার করেন হাদিসশাস্ত্রের বিস্মৃত স্তরগুলো। আরও পড়ুন: মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ. যেমন ছিলেন তার জ্ঞানতাত্ত্বিক অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৪ সালে তিনি সেখানে পিএইচডি গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রখ্যাত দুই প্রাচ্যবিদ এ জে আরবেরি এবং আর বি সার্জেন্ট-এর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন তাঁর গবেষণা “প্রাথমিক যুগের হাদিসশাস্ত্র অধ্যয়ন”—পশ্চিমা সমালোচনামূলক ধারার মুখোমুখি হয়ে হাদিসের ঐতিহাসিকতা ও প্রামাণিকতা নিয়ে এক সুসংহত প্রতিপাদ্য নির্মাণ করে। এখানে তিনি কেবল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকেননি; বরং একটি ‘ক্রিটিক্যাল অ্যাপোলজেটিক্স’-এর মডেল দাঁড় করিয়েছেন, যেখানে প্রমাণ, পদ্ধতি ও যুক্তির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে ওঠে। ডক্টরেট শেষ করে তিনি কাতারে ফিরে আসেন এবং সেখানে দুই বছর জাতীয় পাবলিক লাইব্রেরির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি মক্কার উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটিতে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৩ সালে তিনি কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদিস স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯১ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নিজেকে নিছক গড়পড়তা পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং তিনি জ্ঞানঐতিহ্যে ঋদ্ধ ও প্রাজ্ঞ একদল গবেষক তৈরি করার কাজে আত্মমগ্ন ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হওয়া অসংখ্য গবেষণা প্রকল্প হাদিসশাস্ত্রকে নতুন প্রশ্ন, নতুন পদ্ধতি ও নতুন আলোচনার দিকে উন্মুক্ত করেছে। তার একাডেমিক সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক পরিসরেও বিস্তৃত ছিল। তিনি সৌদি আরব ও বহির্বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, ১. চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব ইসলামিক স্টাডিজ, শিক্ষা অনুষদ, কিং সউদ ইউনিভার্সিটি ২. অতিথি অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান, অ্যান আরবার, মিশিগান, আমেরিকা (১৯৮১-১৯৮২) ৩. ভিজিটিং ফেলো, সেন্ট ক্রস কলেজ, অক্সফোর্ড, ইংল্যান্ড (১৯৮৭) ৪. অতিথি অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো, বোল্ডার, কলোরাডো, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৮৯-১৯৯১) ৫. বাদশা ফয়সাল অতিথি অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, নিউজার্সি (১৯৯২) ৬. সদস্য, প্রমোশন কমিটি, ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়া। ৭. অনারারি অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস, ইংল্যান্ড। মিশিগান, অক্সফোর্ড, কলোরাডো, প্রিন্সটন, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে একটি বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এই বিস্তৃতি প্রমাণ করে, তার চিন্তা কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল এক আন্তঃসাংস্কৃতিক বৌদ্ধিক সংলাপের অংশ। ১৯৮০ সালে বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ তাঁর কর্মজীবনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্বীকৃতি। তবে প্রকৃত অর্থে তার সাফল্য এই পুরস্কারে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি হাদিসশাস্ত্রকে যে পদ্ধতিগত দৃঢ়তা ও ঐতিহাসিক সচেতনতার সঙ্গে পুনর্নির্মাণ করেছেন, সেটিই তাঁর স্থায়ী অবদান। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভ Studies in Early Hadith Literature একটি মাইলফলক। এই গ্রন্থে তিনি হাদিসশাস্ত্রের প্রাথমিক যুগকে কেবল বর্ণনামূলকভাবে উপস্থাপন করেননি; বরং একটি ‘হিস্টোরিওগ্রাফিক্যাল রিভিশন’ সম্পাদন করেছেন। প্রাচ্যবিদদের সেই বহুল উচ্চারিত ধারণা হাদিস দেরিতে সংকলিত ও গঠিত—এর বিপরীতে তিনি দলিল, পাণ্ডুলিপি ও প্রাথমিক উৎসের নিরীক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিপাদ্য দাঁড় করান। ফলে গ্রন্থটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক অঙ্গনে একটি ‘কাউন্টার-ডিসকোর্স’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আরও পড়ুন: এক নিভৃতচারী সাধক ছিলেন ফেনীর মুফতি আবদুল আযীয রহ. এই ইংরেজি অভিসন্দর্ভের আরবি রূপ দিরাসাত ফিল হাদিসিন নববি ওয়া তারিখু তাদবিনিহি মূলত সেই গবেষণারই বিস্তৃত সংস্করণ। এখানে তাঁর পদ্ধতি আরও সুসংহত, বিশ্লেষণ আরও গভীর। তিনি হাদিসের উৎপত্তি, সংরক্ষণ ও সংকলনকে একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন—যা ‘টেক্সচুয়াল ট্রান্সমিশন’-এর একটি সুস্পষ্ট মডেল তৈরি করে। মানহাজুন নাকদ ইনদাল মুহাদ্দিসিন গ্রন্থে আমরা দেখি তাঁর গবেষণার আরেকটি দিক পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ। এখানে তিনি হাদিসবিশারদদের সমালোচনামূলক পদ্ধতিকে বিশ্লেষণ করেছেন, যা আধুনিক ‘ক্রিটিক্যাল মেথডোলজি’-র সঙ্গে তুলনীয়। এই কাজটি প্রমাণ করে, প্রাচীন মুহাদ্দিসগণ কেবল বর্ণনাকারী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সূক্ষ্ম বিশ্লেষক, যাঁদের পদ্ধতি আজকের একাডেমিক মানদণ্ডেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। Studies in Hadith Methodology & Literature এই গ্রন্থে তিনি উসুলুল হাদিসের মৌলিক কাঠামো ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি প্রাচ্যবিদদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোর জবাব দিয়েছেন। এখানে তার ভাষা আরও তর্কাত্মক, কিন্তু সেই তর্ক যুক্তিনিষ্ঠ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। ফলে এটি একটি ‘ডিফেন্সিভ রাইটিং’ হয়েও জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃঢ়তা হারায় না। তার বহুল আলোচিত কাজ The History of the Quranic Text from Revelation to Compilation কুরআনের পাঠসংরক্ষণের ইতিহাসকে একটি তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে। এখানে তিনি অন্যান্য আসমানী গ্রন্থের সংকলনপদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করে কুরআনের সংরক্ষণপ্রক্রিয়ার স্বাতন্ত্র্য ও নির্ভরযোগ্যতা তুলে ধরেছেন। প্রাচ্যবিদ জোসেফ শাখত-এর তত্ত্বের জবাবে লেখা On Schacht's Origins of Muhammadan Jurisprudence তার বৌদ্ধিক সাহসের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন। এখানে তিনি ফিকহের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে শাখতের উপস্থাপিত ধারণাকে খণ্ডন করে দেখিয়েছেন, ইসলামী আইনশাস্ত্র কোনো পরবর্তী উদ্ভাবন নয়; বরং তা প্রাথমিক যুগ থেকেই সুসংগঠিত ছিল। কিতাবুন্নবি গ্রন্থে তিনি ঐতিহাসিক সূত্রের পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন প্রস্তাব করেন—নবীজির যুগে লেখক সাহাবিদের সংখ্যা প্রচলিত ধারণার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এই কাজটি ‘সোর্স ক্রিটিসিজম’-এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে তিনি তথ্যের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নতুন সত্য উন্মোচন করেছেন। অন্যদিকে আল মুহাদ্দিসুন মিনাল ইয়ামামা ইলা ২৫০ হিজরি তাকরিবান এই গ্রন্থে তিনি আঞ্চলিক হাদিসচর্চার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। সব মিলিয়ে, ডক্টর মুহাম্মদ মুস্তফা আজমী-এর রচনাবলি একটি সুস্পষ্ট বৌদ্ধিক অভিমুখ নির্দেশ করে যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়। এছাড়া তার সম্পাদিত গ্রন্থতালিকায় রয়েছে মুয়াত্তা ইমাম মালিক, সুনানু ইবনে মাজাহ, সহিহ ইবনে খুজাইমা, মাগাযি রসুলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লি-উরওয়া ইবনে যুবায়ের, আল ইলাল লি-আলি ইবনে আবদুল্লাহ আল মাদিনি, Manuscript of Sahih Bukhari। আরও পড়ুন: মাওলানা আব্দুল আলী রহ.-এর জীবন ও সংগ্রামের গল্প ড. মুস্তফা আজমী সপরিবারে সৌদি আরবে বসবাস করতেন। তা সত্ত্বেও তিনি মাতৃভূমি ভারত ও মাতৃশিক্ষায়তন দারুল উলুম দেওবন্দকে কখনো ভুলে যাননি। যতদিন সুস্থ ছিলেন, সুযোগ পেলেই দেওবন্দে ফিরে আসতেন। ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর তিনি সৌদি আরবে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু ইসলামী জ্ঞানজগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তার রেখে যাওয়া কীর্তি প্রমাণ করে একজন প্রকৃত আলেম কখনো সম্পূর্ণরূপে বিদায় নেন না; তিনি তাঁর চিন্তা, তাঁর পদ্ধতি এবং তাঁর রচনার মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ জীবিত থাকেন। ডক্টর মুস্তফা আজমীর জীবন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে জ্ঞান কি কেবল সংরক্ষণযোগ্য নাকি তা পুনর্নির্মাণযোগ্য? তাঁর জীবনালেখ্য এই প্রশ্নের উত্তর দেয় একটি দৃঢ় উচ্চারণে: জ্ঞান তখনই জীবন্ত থাকে, যখন তা অনুসন্ধান, সমালোচনা ও পুনর্ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরাবিষ্কৃত হয়। তিনি সেই পুনরাবিষ্কারেরই এক উজ্জ্বল প্রতীক। লেখক: শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক

Go to News Site