Somoy TV
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী ১টি ট্রলারে ছিলেন প্রায় ২৮০ জন যাত্রী-স্থানীয় ও রোহিঙ্গা নাগরিক। মাঝ সমুদ্রে খাবার ও পানির সংকট নিয়ে হৈ-চৈ, যার পরিণতি ট্রলারে ৪টি গোপন কক্ষে আটকে রেখে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। পরে ট্রলারটি উল্টে গিয়ে আরও বহু যাত্রীর সলিল সমাধির আশঙ্কা তৈরি হয়। বেঁচে ফেরা দুইজন যাত্রীর জবানবন্দিতে উঠে এসেছে মানবপাচার চক্রের ভয়াবহ চিত্র। উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে সেই রহস্য উন্মোচন করেছে সময় সংবাদের প্রতিবেদক।কক্সবাজারের উখিয়ার ৬ নম্বর ক্যাম্পের রফিকুল ইসলাম। টেকনাফ বন্দরে কাজের প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে তাকে একটি গুদামঘরে আটকে রেখে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। পরে রাতের আঁধারে ছোট ট্রলারে তুলে, সেখান থেকে মাঝ সমুদ্রে বড় ট্রলারে স্থানান্তর করা হয়।মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলেও টানা চার দিন ট্রলারে চলে নির্যাতন। শেষমেষ আন্দামান সাগরে ট্রলার ডুবে গেলে দুই দিন এক রাত পানির ড্রামে ভেসে থাকার পর একটি বাংলাদেশি জাহাজ তাকে উদ্ধার করে এবং কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে।ক্যাম্পে ফিরে এসেও সেই ভয়াবহ স্মৃতি ভুলতে পারছেন না রফিকুল ইসলাম। ট্রলারে থাকা ২৮০ জনের কী পরিণতি হয়েছে-সে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছেন সময় সংবাদকে।উখিয়ার ক্যাম্প-৬, এ-৫ ব্লকের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (২৭) জানান, ক্যাম্পের এক পরিচিত যুবক তাকে টেকনাফ বন্দরে কাজের প্রলোভন দেখায়। ৬০০ টাকা মজুরির আশ্বাসে ২ এপ্রিল বিকেলে তিনি ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যা ৭টার দিকে টেকনাফে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে নিয়ে তাকে একটি গুদামঘরে আটকে রাখা হয়। কাজের কথা জিজ্ঞেস করলে দালালরা তাকে মারধর করত। দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হতো।তিনি বলেন, তাদেরকে টেকনাফের রাজারছড়া গ্রামের ভেতরে রাখা হয়েছিল। পরে রাতে বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে বিজিবি ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে ১০-২০ জন করে ছোট ট্রলারে তুলে সাগরের চামেলী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বড় ট্রলারে রাত ৯টার দিকে তোলা হয় এবং সব যাত্রী ওঠার পর রাত ১২টায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়।রফিকুল জানান, ট্রলারে মোট প্রায় ২৮০ জন ছিল-পুরুষ ২৪০ জন, নারী ২০ জন, শিশু ৪ জন এবং স্টাফ ১৩ জন। খাবার ও পানির সংকট ছিল চরম। দিনে মাত্র দুবার অল্প খাবার দেওয়া হতো এবং পানি দেওয়া হতো খুবই সীমিত। কেউ পানি চাইলে বা হইচই করলে দালালরা তাদের ট্রলারের নিচে মাছ বা বরফ রাখার গোপন কক্ষের মধ্যে ঢুকিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে দিত।তিনি বলেন, ট্রলারে এমন চারটি গোপন কক্ষ ছিল। প্রতিটিতে সাধারণত ২০-২৫ জন রাখা সম্ভব হলেও, ঘটনার দিন একেকটিতে প্রায় ৪০ জন করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ৭ এপ্রিল রাত ২টার দিকে পানির জন্য প্রতিবাদ করলে তাদের গোপন কক্ষের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে শ্বাস নিতে না পেরে অনেকে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তিনটি গোপন কক্ষ খুলে ৩৩ জনকে মৃত অবস্থায় বের করে সাগরে ফেলে দেওয়া সিদ্ধান্ত নেয় দালালরা।এর আধা ঘণ্টা পর আন্দামান সাগরের কাছে পৌঁছানোর পর ট্রলারটি কয়েকবার ঢেউয়ের ধাক্কা খেয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। একপর্যায়ে একটি বড় ঢেউয়ের আঘাতে ট্রলারটি উল্টে যায়। রফিকুল জানান, ট্রলারের একটি অংশ কিছুক্ষণ ভাসমান ছিল এবং তিনি প্রায় এক ঘণ্টা সেটি ধরে ছিলেন। পরে সেটিও ডুবে গেলে তিনি সাগরে ভেসে থাকতে থাকেন।তিনি বলেন, চারদিকে ভাসমান অবস্থায় মৃতদেহ দেখতে পান, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের। প্রায় দুই দিন এক রাত সাগরে ভেসে থাকার পর বেঁচে থাকা প্রায় ৫০ জনও ঢেউয়ের কারণে ছড়িয়ে পড়ে। পরে চারজন একত্র হলে একটি জাহাজকে সংকেত দিয়ে সাহায্য চান। জাহাজটি তাদের উদ্ধার করে এবং আরও পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করে। পরে মোট ৯ জনকে সেন্টমার্টিনে কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।রফিকুল আরও জানান, অজ্ঞান অবস্থায় তাকে ট্রলারের গোপন কক্ষ থেকে তুলে ইঞ্জিনের পাশে রাখা হয়। জ্ঞান ফেরার পরও তাকে সেখানে শুইয়ে রাখা হয়। ট্রলার ডুবে যাওয়ার সময় ইঞ্জিনের তেল তার শরীরে পড়ে, এতে শরীর জ্বলে যায়। পরে নোনা পানিতে পড়লে সেই জ্বালা আরও বেড়ে যায়।তিনি অভিযোগ করেন, ট্রলারে কেউ পানি খুঁজলে বা নড়াচড়া করলে দালালরা নির্মমভাবে মারধর করত। তাকে কোমরে আঘাত করা হয়েছে, বেল্ট ও কাঠের টুকরো দিয়েও পেটানো হয়েছে। একইভাবে অন্যদেরও নির্যাতন করা হয়েছে।আরও পড়ুন: আন্দামান সাগরে ট্রলারডুবি, বহু প্রাণহানির শঙ্কাআন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ৮ এপ্রিল ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। পরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড, যাদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ ও ১ জন নারী রয়েছেন। ১১ এপ্রিল তাদের পুলিশে হস্তান্তর করা হয়।বেঁচে ফেরা সেই নারীদের একজন উখিয়ার ১৫ নম্বর ক্যাম্পের রাহেলা বেগম। কাঠের টুকরো ধরে দুই দিন ভেসে থাকার পর প্রাণে বাঁচলেও, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।উখিয়ার ক্যাম্প-১৫, এফ-১৫ ব্লকের বাসিন্দা রাহেলা বেগম (২৫) জানান, তিনি ৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ট্রলারে যাত্রা করেন। ৮ এপ্রিল ট্রলারটি ডুবে যায়।তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর তিনি দুইদিন একরাত সাগরের পানিতে ভেসে ছিলেন। ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু ডুবে যাওয়ার পর কে কোথায় হারিয়ে গেছে-তা তিনি জানেন না।রাহেলা জানান, দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসতে ভাসতে একটি কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে সেটিও উল্টে গিয়ে হারিয়ে যায়। তখন তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে জ্ঞান ফিরে দেখেন একটি জাহাজ তাকে উদ্ধার করছে।তিনি আরও বলেন, ট্রলারে মোট ২০ জন নারী ছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র তাকেই জীবিত উদ্ধার করে বাংলাদেশে ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।ট্রলার ডুবির ঘটনায় জীবিত ফিরে আসা রফিকুল ইসলাম ও রাহেলা বেগমের ঘরে এখন মানুষের ভিড়। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের স্বজনদের খোঁজ নিতে ছুটে আসছেন।মালয়েশিয়াগামী উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের হরিণমারা এলাকার বাসিন্দা মো. আলীর ভাই গিয়াস উদ্দিন (৩৫) বলেন, গত শুক্রবার তারা জানতে পারেন তার ভাই মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, কোটবাজারের এক দালালের মাধ্যমে তাকে পাঠানো হয়েছে।তিনি বলেন, 'ভাই যখন চলে গেছে, তখন আর কিছু করার ছিল না। কিন্তু দুই দিন পর শুনি যে, যে ট্রলারে সে গিয়েছে সেটি ডুবে গেছে। উদ্ধারের তালিকা ও ছবিতে ভাইকে খুঁজে পাইনি।'এরপর ভাইয়ের খোঁজে দালালের কাছে গেলে সে জানায়, ট্রলার ডুবির ঘটনায় তার ভাই ছিল না; বরং অন্য একটি ট্রলারে রয়েছে, যেটি কোস্টগার্ড আটক করেছে। শিগগিরই তাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও আশ্বাস দেয় দালাল।গিয়াস উদ্দিন জানান, 'গত তিন দিন ধরে দালালের কাছে যাচ্ছি, কিন্তু সে একই কথা বলছে। আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। ১৩ দিন ধরে ভাইয়ের কোনো খোঁজ নেই।'শেষমেষ ট্রলার ডুবি থেকে ফিরে আসা রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৬ এর রফিকুল ইসলামের কাছে গেলে তিনি ছবিতে গিয়াস উদ্দিনকে শনাক্ত করেন এবং জানান, তিনি একই ট্রলারে ছিলেন। তবে ট্রলার ডুবির পর তাকে আর কোথাও দেখা যায়নি।এ অবস্থায় গিয়াস উদ্দিন বলেন, 'আমার ভাই বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে-কিছুই জানি না। ভাইয়ের জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।'রাহেল ভাই মো. আয়াছ (২৭) বলেন, 'রাহেলা বেগম ঘরে আসার পর প্রতিদিনই স্থানীয় এবং রোহিঙ্গারা আসছে। শুধু তাদের আত্মীয়-স্বজন ওই ট্রলারে ছিল কিনা এটা জিজ্ঞেস করতে। অনেকেই অনেকভাবে ছবি দেখিয়ে রাহেলার কাছে জিজ্ঞেস করছে, কিন্তু আমার বোন কোনো উত্তর দিতে পারছে না। আজকেও ঘরে সেই জ্ঞান হারিয়েছে, অনেক অসুস্থ রাহেলা।'ট্রলার ডুবির ঘটনায় নিখোঁজ মোহাম্মদ আলমের ভাই মো. সেলিম বলেন, 'আমার ভাই দুনিয়াতে বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে আমরা বলতে পারি না। আমার ভাই যদি দুনিয়াতে বেছে থাকে বা মরে যায় তাহলে অন্তত জীবিত হোক বা মৃত আমরা খবরটা যেন পায়। দালালরা যে এভাবে মানুষজনকে নিয়ে গিয়ে সাগরের মাঝে মেরে ফেলছে, এসব দালালের আমরা শাস্তি চাই।'আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবপাচার চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ তুলে, তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, সাগরপথে শুধু মালয়েশিয়া নয়, আরও বিভিন্ন দেশে মানুষ পাচার করা হচ্ছে। এর পেছনে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রের সমন্বিত একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজ করছে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, এটি একটি সংগঠিত ‘ব্যবসা’, যেখানে প্রভাবশালী চক্র জড়িত।তিনি বলেন, 'মানবপাচারের যেসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসছে, সেগুলোর সঠিক তদন্ত করে কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কারা মূল হোতা-তাদের চিহ্নিত করতে হবে।'হেলাল উদ্দিনের মতে, এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে আইনের আওতায় আনা গেলে মানবপাচারের হার ধীরে ধীরে কমে আসবে।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি। তারা নিজ দেশে ফিরতে পারছে না, বরং এখনো নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। এতে একটি গভীর হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাগরপথে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিতে বাধ্য করছে।তিনি বলেন, 'এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। তা না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়বে।'আরও পড়ুন: লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ৪ যুবকের মৃত্যুসাম্প্রতিক ট্রলারডুবির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে সমুদ্রে আবহাওয়া টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে, এ সময় কাঠের নৌকায় এ ধরনের যাত্রা অত্যন্ত বিপজ্জনক।তিনি আরও জানান, সরকার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।মানবপাচারকারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, 'যারা এসব মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যদি তারা বাংলাদেশি নাগরিক হয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা আশা করি, দ্রুত মূল হোতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।'তিনি সবাইকে আহ্বান জানান, যেন কেউ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রায় অংশ না নেয় এবং মানবপাচার রোধে সবাই সচেতন ভূমিকা রাখে।এদিকে, এক যৌথ বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বলেছে, এই মর্মান্তিক ঘটনা রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি ও টেকসই সমাধানের অভাবের ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরেছে।
Go to News Site