Jagonews24
নিয়োগপত্রে জ্বলজ্বল করছে খোদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষর। পদ লেখা ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রকিউরমেন্ট অফিসার’। বেতন মাসে ৪০ হাজার টাকা। রিপোর্টিং কর্মকর্তা হিসেবে নাম রয়েছে আইনুল ইসলামের। এমন সরকারি চাকরি পাওয়ার আনন্দে যে কেউ খুশি হবেন এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পুরোটাই একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ। যেখানে ভুক্তভোগীদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া থেকে শুরু করে নামিদামি রেস্তোরাঁয় ভুয়া প্রশিক্ষণেরও আয়োজন করে। শেষে কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে গিয়ে ধরা পড়ে আসল ফাঁকি। আমরা এসব প্রতারকদের কঠিন শাস্তি চাই। কোনো মানুষ যেন আমাদের মতো প্রতারণার শিকার না হন সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাচ্ছি। আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা উদ্ধারসহ অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।- ভুক্তভোগী রিমন বিন হুমায়ুন চট্টগ্রামে এমনই এক প্রতারণা চক্র পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে আরেফিন রহমান শাওন, মো. সাফায়েতুল ইসলাম ও জিদান আলম সোয়াদের বিরুদ্ধে। আরেফিন ও সাফায়েতুল সম্পর্কে মামাতো ও ফুফাতো ভাই। তাদের মধ্যে আরেফিন চকবাজারের মেহেদীবাগ ও সাফায়েতুল লোহাগড়ার ছগিড়াপাড়ার বাসিন্দা। জিদানের বাড়ি রাউজানের দলইনগরে। চক্রের সঙ্গে সাফায়েতুলের বড় দুই ভাই এস এম জাভেদ করিম ও রিয়াদ-উর-রেজাও জড়িত বলে অভিযোগ আছে। জিডি ও অভিযোগ দায়ের চক্রটির বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। সেই সঙ্গে গত ৩ মার্চ চট্টগ্রাম র্যাব-৭ এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ দেওয়া হয়। আরও পড়ুনবিমায় আগ্রহ নেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের, নেপথ্যে ‘আস্থার সংকট’বাণিজ্যের পথে বিপজ্জনক বাঁক, ঝুঁকির ওপর খাঁড়ার ঘা যানজটবৈধ চেয়ারম্যান অচল, ট্রাস্টি বোর্ডের বিভক্তিতে সংকটে বিশ্ববিদ্যালয় জিডি সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্তরা সুকৌশলে চার ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তাদের মধ্যে রিমন বিন হুমায়ুন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কানিজ ফতেমা ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, তন্ময় চৌধুরী ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও সামিন বিন হুমায়ুন ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেন। কর্মকর্তা পরিচয় ও ভুয়া প্রশিক্ষণ ভুক্তভোগী রিমনের তথ্য অনুযায়ী, চক্রের অন্যতম সদস্য জাভেদ নিজেকে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবু রেজা নদভীর কাছের মানুষ দাবি করে প্রভাব বিস্তার করতেন। অন্যদিকে, জিদান কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আরেফিন কাস্টম হাউসের ও সাফায়েতুল বন্দরের কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। জিয়াউল হক নামের আরেক ব্যক্তি জিদানের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। থানায় করা জিডি ও র্যাবের কাছে দেওয়া অভিযোগপত্রের কপি/ছবি: সংগৃহীত রিমন জানান, চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তাদের বিভ্রান্ত করতে চক্রটি গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচলাইশের অ্যারিস্টো রেস্টুরেন্ট এবং বন্দরের বোনানজা পোর্ট রেস্টুরেন্টে কয়েক দফায় নিজেদের লোক দিয়ে ভুয়া ট্রেইনিং সেশন পরিচালনা করে। এরপর কয়েকজনের হাতে ভুয়া পরিচয়পত্র এবং নিয়োগপত্র ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চাকরিতে যোগদানের বিষয়টি নিয়ে কালক্ষেপণ করা হতে থাকলে ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং নিজেদের টাকা ফেরত চান। এতে উল্টো তাদের রাস্তায় দেখলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে চাপে পড়ে আরেফিন দেড় লাখ টাকার একটি চেক দেন। তবে হিসাবে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চেকটি ডিজঅনার হয়। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। তারা যেভাবে বলেছে, বিষয়গুলো তেমন না। তাদের সবগুলো অভিযোগের ভিত্তি নাই। এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।- অভিযুক্ত আরেফিন রহমান শাওন ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া কিছু হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশটে দেখা যায়, অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে চাকরি ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নিয়মিত বিভ্রান্তিকর তথ্য আদান-প্রদান করতেন। রিমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিনের পর দিন আমাদের ঘোরানো এবং ভুয়া কাগজ দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। আমরা বর্তমানে এই সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং চট্টগ্রাম র্যাব-৭ অধিনায়ক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। আমরা এসব প্রতারকদের কঠিন শাস্তি চাই। কোনো মানুষ যেন আমাদের মতো প্রতারণার শিকার না হন সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাচ্ছি। আমাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া টাকা উদ্ধারসহ অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ আরও পড়ুনভূমধ্যসাগরে সলিল সমাধি, তবুও থামছে না লিবিয়া-ইতালি মরণযাত্রামামলায় ঝুলে আছে এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ‘মন্দ ঋণ’জনবল সংকটে বিপর্যস্ত পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে, বন্ধ ৪৩ ট্রেন-৬৭ স্টেশন আরও দুই ভুক্তভোগী লোহাগাড়ার পদুয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ এহসান জাগো নিউজকে জানান, গত জানুয়ারি মাসে আরেফিন ও সাফায়েতুল নিজেদের চট্টগ্রাম বন্দরের প্রভাবশালী কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাকে অফিস সহকারী পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। তাদের কথায় বিশ্বাস করে তিনি বিভিন্ন সময়ে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। পরে তাকে একটি নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। তবে সেটি নিয়ে বন্দরে যোগদান করতে গেলে কর্তৃপক্ষ জানায়, নিয়োগপত্রটি জাল। এহসান অভিযোগ করেন, এরপর অভিযুক্তরা তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। টাকা ফেরত চাইলে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের লোগো/ ফাইল ছবি মোহাম্মদ তাসমীর নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, একই সময়ে আরেফিন ও সাফায়েতুল তাকে স্টোর কিপার পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দেন। তারা বিভিন্ন সময় তার কাছ থেকে মোট ৬৫ হাজার টাকা নেন। টাকা নিয়ে তাকে যে নিয়োগপত্রটি দেওয়া হয় সেটি নিয়ে বন্দরে যোগদান করতে গেলে জানতে পারেন এটি জাল। তাসমীরও টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন জানিয়ে তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। আমরা সাধারণ ডায়েরির বিষয় অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ বিষয়ে এখনই আর কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।- পাঁচলাইশ থানার এসআই মো. নুরুজ্জামান অভিযুক্তদের ভাষ্য অভিযোগের বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে আরেফিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। তারা যেভাবে বলেছে, বিষয়গুলো তেমন না। তাদের সবগুলো অভিযোগের ভিত্তি নাই। এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।’ এই বলে তিনি কল কেটে দেন। সাফায়েতুল বলেন, ‘এসবের সঙ্গে আমি জড়িত না। আমি এরকম কিছু করি নাই।’ আরেক অভিযুক্ত জিদানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। তবে অন্য নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তিনি দাবি করেন, বিষয়টি পারিবারিক। দুই পরিবারের মধ্যে এটি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। দেখা করে এ বিষয়ে সবকিছু বলবেন জানিয়ে তিনি কল রেখে দেন। আরও পড়ুনওসি পদায়নের নামে প্রতারণা, সতর্ক করলো ঢাকা রেঞ্জডিজিএফআই পরিচয়ে প্রতারণা, সতর্ক থাকার আহ্বান আইএসপিআরেরমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা সেজে ডিসির সঙ্গে প্রতারণার চেষ্টা, গ্রেফতার ৩ জাবেদ বলেন, ‘রিমন বিন হুমায়ুন আমার কাজিন। চাকরির বিষয়ে আমি কিছু জানি না। কে কোথায় কী অভিযোগ দিছে সেটা তো বলতে পারি না।’ পুলিশ-র্যাব যা বলছে যোগাযোগ করা হলে জিডির তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. নুরুজ্জামানের জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সাধারণ ডায়েরির বিষয় অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ বিষয়ে এখনই আর কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।’ অন্যদিকে, র্যাব-৭ এর সহকারী পুলিশ সুপার ও সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন জানান, এ বিষয়ে তারা কাজ করছেন। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। এমআরএএইচ/একিউএফ
Go to News Site