Somoy TV
রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১১৮টি কিশোর গ্যাং। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরেই সক্রিয় ১৬টি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন ভয়াবহ তথ্য। তথ্য বলেছে, একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে তারা আরও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে।গত ১২ এপ্রিল বিকেল চারটা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী রোড বেড়িবাঁধ এলাকায় কিশোর গ্যাং আরমান-শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা চড়াও হয় এলেক্স ইমন গ্রুপের ওপর। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পালানোর চেষ্টা করলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ইমন। পরে একা পেয়ে তাকে কুপিয়ে গোড়ালি কেটে নেয় আরমান-শাহরুখ গ্রুপের সদস্যরা। হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়। এর আগে রাজধানীর আদাবরে ফিল্মি স্টাইলে এক কুরিয়ার কর্মীকে কুপিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয় আরেক কিশোর গ্যাং। চাপাতির মুখে রাস্তায় থাকা অন্যদের মোবাইল ও নগদ টাকাও ছিনিয়ে নেয় তারা। আরও পড়ুন: ঢাকার সন্ত্রাসীদের হাতে গুপ্ত অস্ত্র ‘পেন গান’! একের পর এক কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াবহতায় মোহাম্মদপুর-আদাবর এখন আতঙ্কের নাম। দিন যত গড়াচ্ছে, ততই নৃশংস হয়ে উঠছে এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা। একসময় কব্জিকাটা আনোয়ার গ্যাং ছিল মোহাম্মদপুরের আতঙ্ক। এখন নতুন আতঙ্ক হিসেবে উঠে এসেছে গোড়ালি কাটা আরমান-শাহরুখ গ্রুপ। সম্প্রতি এক কিশোর গ্যাং সদস্যকে কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর আবারও তাদের অপতৎপরতা সামনে এসেছে। ডিএমপির গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, এলেক্স ইমন ও আরমান-শাহরুখ ছাড়াও পাটালি, লেভেল হাই, কব্জিকাটা আনোয়ার, আর্মি আসলাম-নবী, ডাইলা, আকবর, গাঙচিল, টক্কর লওসহ মোট ১৬টি গ্রুপ সক্রিয়। এলাকাবাসী বলছেন, মোহাম্মদপুরে এত কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী আর মাদক থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। তারা চান সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। শুধু মোহাম্মদপুর নয়, কিশোর গ্যাং আতঙ্কে মিরপুরবাসীও। পহেলা বৈশাখ রাত আটটার দিকে মিরপুর চলন্তিকা মোড়ে কিশোর গ্যাং সজিব ও দিপ্ত-মুন্না গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সিসিটিভি ফুটেজে সজীবকে চাপাতি ছিনিয়ে নিতে দেখা যায়। পরে দীপ্ত-মানিক গ্রুপের সদস্যরা সজীবকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘পোলাপান ৮–১০ জন চাপাতি আর চাবুক নিয়ে আসে। এলাকায় সবাই ভয়ে থাকে; কখন কী হয় বলা যায় না। তবে সজীবের স্বজনদের দাবি, সজীব গ্যাংয়ের সদস্য নয়। তারা দীপ্ত-মানিক গ্রুপের বিচার চান। তারা বলেন, ‘সে কোনো গ্যাং চালায়; এমন কোনো প্রমাণ নেই। যদি তার কোনো সম্পৃক্ততা থাকে, আমরা তাকে নিজেরাই আইনের হাতে তুলে দিতাম। কিন্তু আমরা এই অন্যায় আঘাতের বিচার চাই।’ মিরপুর ১০ নম্বর ওয়াবদা বিল্ডিং এলাকার আতঙ্ক কিশোর গ্যাং বাহুবলি গ্রুপ। তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়। এলাকার সিটি করপোরেশনের পরিত্যক্ত ভবনটি তাদের আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভুক্তভোগীরা বলেন, বাইরে থেকে আসা কিশোরদের দৌরাত্ম্যে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত। গত ১০ এপ্রিল খাবার কিনতে গিয়ে বাহুবলি গ্রুপের হাতে জিম্মি হন শামীম নামের এক দিনমজুর। টাকা না পেয়ে তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। স্থানীয়রা জানান, এই গ্যাংয়ের কারণে পুরো এলাকা আতঙ্কে থাকে। ডিএমপির বিভাগওয়ারি তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে ৩২টি, তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি এবং রমনা বিভাগে ৬টি গ্যাং সক্রিয়। থানা হিসেবে মোহাম্মদপুরে ১৬টি, পল্লবীতে ১৪টি, দারুস সালাম ও বনানীতে ৬টি করে গ্যাং রয়েছে। আরও পড়ুন: কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিক শেল্টার দিলেই কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি এমপি মাজেদের ডিএমপি জানায়, কিশোর আইনের জটিলতায় অনেকেই জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হয়ে কারাগারে ছিল। কিন্তু পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। কোর্টের মাধ্যমে যেন জামিন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়, সেই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় এসব গ্যাং বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তবে নতুন করে তারা রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে অনেকেই যুক্ত ছিল, যা পুরো ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করেছে। সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, কিশোর অপরাধ দমনে রাজনৈতিক মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
Go to News Site