Collector
উপকূলে ভেসে আসছে মৃত ডলফিন, কারণ কী? | Collector
উপকূলে ভেসে আসছে মৃত ডলফিন, কারণ কী?
Jagonews24

উপকূলে ভেসে আসছে মৃত ডলফিন, কারণ কী?

সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী ডলফিন। পৃথিবীর সর্বত্রই ডলফিনের দেখা মেলে। বেশি দেখা যায় মহীসোপানের কাছে অগভীর সমুদ্রে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায়ও আছে ডলফিনের পদচারণা। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে ডলফিনের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটছে বঙ্গোপসাগরে। সমুদ্র উপকূলে মিলছে ডলফিনের মৃতদেহ। এতে পরিবেশবাদীরা চিন্তিত, কেন এমন মৃত্যু? ডলফিন মাংসাশী প্রাণী, মাছ এবং স্কুইড এদের প্রধান খাদ্য। ধারণা করা হয়, দশ মিলিয়ন বছর আগে মায়োসিস যুগে ডলফিনের উদ্ভব। পৃথিবীতে ১৭টি গণে প্রায় ৪০ প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। ডলফিনকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের কাতারে ধরা হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতার জন্য মানুষের কাছে ডলফিন খুব জনপ্রিয়। সমুদ্রে মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু বলা হয় ডলফিনকে। ১.২ মিটার (৪ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ৪০ কেজি (৯০ পাউন্ড) ওজন থেকে শুরু করে ৯.৫ মিটার (৩০ ফুট) দৈর্ঘ্য এবং ১০ টন ওজন পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের ডলফিন দেখা যায়। সম্প্রতি দেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বেশকিছু মৃত ডলফিন ভেসে আসার সংবাদ শোনা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের খবর বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সৈকতের বালুচর থেকে প্রায়ই মৃত্যু ডলফিন উদ্ধার করা হচ্ছে। হয়তো পরে এগুলো সঠিক নিয়মে মাটি চাপা দেওয়া হচ্ছে। ভেসে আসা সেসব ডলফিনের বেশিরভাগই সদ্য মৃত বলে মনে হয়েছে। এদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন থাকে। স্থানীয় একাধিক জেলেরা জানান, কিছু অসাধু ট্রলারমালিক তাদের ট্রলারে ট্রলিং জাল ব্যবহার করে। এসব জাল সমুদ্রে ফেলার জন্য ট্রলারে ক্রেনের মতো থাকে। ওই ক্রেন দিয়ে ট্রলারের দুই পাশে জাল ফেলা হয়। এসব ট্রলিং জালে সামুদ্রিক কচ্ছপ, ডলফিন, হাঙর ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আটকা পড়ে। এগুলো বিক্রি নিষিদ্ধ হওয়ায় তা আবার সাগরেই ফেলে দিয়ে আসে জেলেরা। এসব প্রাণীর মধ্যে যেগুলো মারা যায়, সেগুলোই পরে তীরে ভেসে আসে। কুয়াকাটার স্থানীয় সেচ্ছাসেবক দলনেতা ইব্রাহিম ওয়াহিদ জানান, গত কয়েক বছর ধরেই কুয়াকাটা সৈকতে মৃত ডলফিন ভেসে আসছে। এর আগে ২০২০ সালে ১৮টি এবং ২০২১ সালে ২৪টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে এই সৈকতে। তাছাড়া কুয়াকাটায় একাধিকবার মৃত ওলিভ রেডলি কচ্ছপও ভেসে এসেছে। মৃত প্রাণীগুলো মাটিচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী ও টেকসই কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হয়নি। উপকূলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, মৎস্য ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্রের নীল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিসের গবেষক সাগরিকা স্মৃতি। তার কাজের এলাকা পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া। ডলফিনের এমন মৃত্যু প্রসঙ্গে সাগরিকা স্মৃতির সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই উপকূলের সৈকতলাগোয়া জনপদগুলোতে একের পর এক মৃত ডলফিন ভেসে আসার ঘটনা ঘটেছে। অথচ কোনো প্রতিকার হয়নি।’ কী কারণে এত ডলফিন মারা যাচ্ছে? জানতে চাইলে সাগরিকা স্মৃতি বলেন, ‘নানা কারণে ডলফিনের মৃত্যু হচ্ছে। ধরুন, নানা সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময়গুলোতে ডলফিনরা ওদের গণ্ডির বাইরে অবাধে বিচরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেই জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য যত্রতত্র জাল ফেলছেন। এতে ডলফিনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। সাধারণত যেখানে মাছের বিচরণ বেশি, সেখানেই ডলফিন বিচরণ করে। আর মাছ যেখানে বেশি, জেলেরা সেখানে জাল ফেলে। সেসব জালে মাছের সঙ্গে ডলফিনও আটকে যায়। এক্ষেত্রে জেলেরা সচেতন হয়ে আটকা পড়া ডলফিন ছাড়িয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তারা তা করছেন না। মানুষের এমন অসচেতনতার কারণে ডলফিনগুলো মারা যাচ্ছে।’ সাগরিকা স্মৃতি আরও বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে সমুদ্রে প্রবল জোয়ার থাকে। এ সময় সমুদ্রে বিষাক্ত শৈবাল ও শামুক-ঝিনুক জন্মায়। সামুদ্রিক মাছ এসব বিষাক্ত শৈবাল খায়। ডলফিন যদি ওইসব বিষাক্ত শৈবাল খাওয়া মাছ খেয়ে থাকে, তবে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। এছাড়াও সুন্দরবন এলাকায় অনেক অসাধু জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরে। বিষ খাওয়া মাছ মরে সমুদ্রের পানিতে ছড়িয়ে যায়। এসব মাছ পেটে গেলে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রে চলাচল করা বড় জাহাজের আঘাতে ডলফিনের মৃত্যু হতে পারে। সমুদ্রে যত্রতত্র ছেঁড়া জাল, পলিথিনে ভেসে বেড়ায়। এসবের সঙ্গে পেঁচিয়েও ডলফিনের মৃত্যু হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের সংখ্যা অনেক। জেলেদের সচেতন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। জেলেদের বোঝাতে হবে, জালে ডলফিন, হাঙর, শাপলাপাতা মাছ, কাছিম-জাতীয় প্রাণী আটকা পড়লে ছেড়ে দিতে হবে। জেলেরা যাতে মাছ ধরতে গিয়ে ডলফিনের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন, তা তাদের বোঝাতে হবে। কীভাবে জালে আটকা পড়া প্রাণী ছেড়ে দিতে হবে, তার কৌশলও জেলেদের শেখানো দরকার। পাশাপাশি ডলফিনের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে হলে ডলফিনের ময়নাতদন্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য মৃত ডলফিনের অন্ত্র, জিভ, দেহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দ্রুত সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত করার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ডলফিন কেন মারা যাচ্ছে, তা বের করতে হলে যথাযথ ময়নাতদন্ত ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার, ঢাকায় বন অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে ময়নাতদন্ত করা যায়। তা ছাড়া দেশে যে ভেটেরিনারি হাসপাতালগুলো আছে, সেখানেও ময়নাতদন্তের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘ডলফিনগুলোর মারা যাওয়ার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। সমুদ্রে জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করাও জরুরি বলে আমি মনে করি। সমুদ্র এবং সমুদ্রের জীব বাঁচাতে হলে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একযোগে কাজ করতে হবে।’ আরও পড়ুনপহেলা বৈশাখে মিষ্টিমুখ, ক্রেতা-বিক্রেতার বন্ধন টিকে আছে যুগ যুগ ধরেগ্রামবাংলার ঐতিহ্য হারিকেন-কুপিবাতির অতীত কেএসকে

Go to News Site