Jagonews24
মানিকগঞ্জে একটি সোনার চেইন ও কানের দুলের জন্য নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে আতিকা আক্তার (৭) নামের এক শিশুকে। এক কিশোরের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে মারা যান অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচা। তবে ওই দুজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে পরিবার থেকে দাবি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আতিকা আক্তার মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়নের বনপারিল দক্ষিণপাড়া গ্রামের সৌদি আরব প্রবাসী দুলু মিয়ার মেয়ে। সে একটি মাদরাসায় প্রথম শ্রেণিতে পড়তো। নিহত বাকি দুজন হলেন অভিযুক্ত কিশোরের বাবা পান্নু মিয়া ও চাচা ফজলু মিয়া। বর্তমানে দুই পরিবারে শোকের মাতম চলছে। স্থানীয়, পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে বাড়ির পাশে একটি বিয়েবাড়ির গায়েহলুদের অনুষ্ঠান শেষে খেলাধুলা করছিল শিশু আতিকা আক্তার। এসময় আতিকা গলায় সোনার চেইন ও কানে দুল পরে ছিল। তখন প্রতিবেশী পান্নুর মিয়ার ছেলে (১৫) কৌশলে তাকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে যায়। পরে দুই হাত-পা বেঁধে শিশুটিকে হত্যা করে চেইন ও কানের দুল নিয়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় আতিকার খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। নিখোঁজের পরপরই তার সন্ধানে এলাকায় মাইকিং ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার সন্ধান চেয়ে পোস্ট করে বিষয়টি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে আতিকার চাচাতো ভাই আলী জানান, তাকে প্রতিবেশী কিশোরের সঙ্গে দেখেছেন। পরে ওই কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে যায় এবং শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে এলাকাবাসী কিশোরের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পরে তার বাবা পান্নু, ভাই নাজমুল, চাচা ফজলু রহমান বাবুকে ধাওয়া করে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাদেরকে মারধর করতে করতে আতিকাদের বাড়ির সামনের পুকুরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে দুজনের মরদেহ ভাসতে দেখা যায়। আরও পড়ুন: মানিকগঞ্জে শিশুর মরদেহ উদ্ধার ঘিরে উত্তেজনা, গণপিটুনিতে নিহত ২ খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের দুজনের উদ্ধার করে। আহত নাজমুলকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আতিকার বড় চাচি রুশনারা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আতিকার কানের দুল বিক্রি করে টাকা ভাগাভাগির খবর পেয়ে আমাদের ছেলেরা ওই কিশোরকে ধরে আনে। মারধরের একপর্যায়ে সে হত্যার কথা স্বীকার করে। আমরা আমাদের ভাতিজিকে নিয়ে কান্নাকাটি করছিলাম। উত্তেজিত জনতা কখন কী করেছে তা আমরা জানি না।’ তবে অভিযুক্ত কিশোরের মা নারগিস বেগমের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে তার স্বামী ও দেবরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে ঘরের ভেতরে মারা হচ্ছিল, আর আমার স্বামী ও দেবরকে গাছের সঙ্গে বেঁধে পেটানো হয়েছে। আমি বাঁচাতে গিয়েও পারিনি।’ নারগিস বেগম বলেন, ‘এর আগে গাঞ্জা (গাঁজা) খাওয়া নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। তখন বিচার হয়েছিল, আমাদের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হয়েছিল। সেই শত্রুতার জের ধরে আমার স্বামী, দুই ছেলে ও দেবরকে মারা হয়েছে। আমার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’বনপারিল গ্রামের আব্দুল আজিজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এশার নামাজের সময় মাইকিং হয় একটি মেয়ে হারানো গেছে। পরে আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলাম। প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে জানতে পারি, মেয়েটি মারা গেছে। ভুট্টাক্ষেত থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আমরা ঘটনাস্থলে আসে এসে দেখি আরও তিনজনকে মেরে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পরে পুকুর থেকে তিনজনকে ওঠানো হয়। একজন জীবিত আর দুজন মৃত। পরে পুলিশ এসে মরদেহগুলো নিয়ে যায়।’ হাটিপাড়া গ্রামের নুজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘খবর শুনে এসে দেখি পুকুরে তিনটি মানুষ। এক প্রান্তে একজনের শুধু মাথা দেখা যাচ্ছে। দেখেই বুঝতে পেরেছি মারা গেছে। পুকুরের আরেক প্রান্তে দুজন শুধু মুখ ভাসিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিল। একটা ছেলে বাঁশ দিয়ে একজনকে মারছিল। তখন আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে ফিরাই এবং ওকে বলি, আইন নিজের হাতে তুইলা নিও না। প্রশাসনের লোক আছে, তোমরা বিপদে পড়ে যাবে। পরে সে ছেড়ে দেয় এবং সেখান থেকে চলে যায়। পরে আমি বাড়ির ভেতরে গিয়ে সেই মেয়ের লাশটা দেখি। তার গলায় গেঞ্জি প্যাঁচানো ছিল।’ এ বিষয়ে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মহরম আলী বলেন, ‘নিখোঁজ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর উত্তেজিত জনতা তিনজনকে গণপিটুনি দেয়। এতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ এসআর/এএসএম
Go to News Site