Somoy TV
৯,১১৩ দিন! ২০০১ সালের ৫ মে অ্যাস্টন ভিলার কাছে ৩-২ গোলের হারে প্রিমিয়ার লিগ থেকে ছিটকে পড়েছিল কোভেন্ট্রি সিটি। দীর্ঘ ২৫ বছর পর আবারও প্রিমিয়ার লিগে ফিরেছে মিডল্যান্ডসের ১৪২ বছর পুরনো ক্লাবটি।মাঝের সময়টা স্কাই ব্লুজরা পার করেছে কঠিন সময়। ১১ বছর ইএফএল চ্যাম্পিয়নশিপে থাকার পর তাদের নেমে যেতে হয়েছিল ইংলিশ ফুটবলের তৃতীয় স্তর ইএফএল লিগ ওয়ানে। ২০১৩ সালে পড়েছিল প্রশাসনিক সংকটেও।এমনকি দুইবার নিজেদের হোম ম্যাচ নর্দাম্পটন ও বার্মিংহ্যামে গিয়ে খেলতে বাধ্য হয়েছিল স্কাই ব্লুজরা। অপছন্দের মালিকানা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিকবার বিক্ষোভ এবং সংসদ পর্যন্ত বিষয়টি ওঠা; সব মিলিয়ে প্রিমিয়ার লিগে ফেরাটা তাদের জন্য ছিল দূরের স্বপ্ন।সমর্থকেরা মিছিল করেছেন, মাঠে ঢুকে প্রতিবাদ করেছেন। অবশেষে ২০২৩ সালে ডগ কিং ক্লাবটি কিনে নেন, মাঝের ১৩ বছরে ক্লাবটি ৫৯ বছরের মধ্যে প্রথমবার চতুর্থ স্তরেও নেমে গিয়েছিল।কোভেন্ট্রি সিটির পুনর্জাগরণ এসেছে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের অধীনে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) ব্লাকবার্ন রোভার্সের মাঠে ১-১ গোলের ড্রয়ে প্রিমিয়ার লিগে জায়গা নিশ্চিত করেছে কোভেন্ট্রি। আরও পড়ুন: ১৮ পয়েন্ট কাটার পর আবার শাস্তি, দুঃসময় কাটছেই না ওয়েন্সডেরমজার বিষয় হলো, ক্লাবের ভেতর থেকেও এত দ্রুত সাফল্য কেউ আশা করেনি। মৌসুমের শুরুতে কিছুটা আশাবাদ থাকলেও এত বড় অর্জন আসবে, তা ভাবেনি অনেকে। তবে, সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল প্রাক-মৌসুমেই। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মার্ক রবিন্সের জায়গায় কোচের দায়িত্ব নেন ল্যাম্পার্ড। কিংবদন্তি এই মিডফিল্ডারের শান্ত ও স্থির নেতৃত্ব কোভেন্ট্রির এই সাফল্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।ব্রাইটন থেকে ধারে আসা কার্ল রুশওয়ার্থ সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছেন। এছাড়া জানুয়ারিতে রোমান ইজি ও ফ্র্যাঙ্ক ওনিয়েকা যোগ দিলেও দলে বড় পরিবর্তন হয়নি।ক্লাবের ভেতরের লোকজন মুগ্ধ ল্যাম্পার্ড যেভাবে গত মৌসুমের হতাশা কাটিয়ে দলকে এগিয়ে নিয়েছেন। শুরুতে লক্ষ্য ছিল স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতি, পরে যখন শীর্ষ দুইয়ে জায়গা পাকা হয় তখন লক্ষ্য বদলে শিরোপাকে পাখির চোখ করা হয়।কিং-ল্যাম্পার্ড যেভাবে বদলে দিলেন ক্লাবটিকে:কোচ হিসেবে ল্যাম্পার্ড নিয়োগ পেয়েছিল সাবেক খেলোয়াড় জন ইউস্টাসকে পেছনে ফেলে। মালিক ডগ কিং ছিলেন তার বড় ভক্ত। এই সাফল্যের পেছনে লাগাতার উৎসাহ দিয়ে গেছেন কিং। নিয়মিত ট্রেনিং গ্রাউন্ডে যান তিনি। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নাম জানেন এবং স্টাফদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। তাকে প্রায়ই ক্যান্টিনে কফি বানাতে এবং রাঁধুনির সঙ্গে গল্প করতে দেখা যায়। ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছে কোভেন্ট্রি সিটি। ছবি: রয়টার্সক্লাবটি গড়ে উঠেছে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে, যেখানে মূল দলের জন্য আলাদা কোনো জায়গা নেই। খেলোয়াড়দের জন্য ট্রেনিং গ্রাউন্ড দলীয় বন্ধন গড়ার জায়গা। উন্নত ও বড় জিমে এখন সবাই একসঙ্গে অনুশীলন করতে পারে। আগে পুরোনো জিমে পালা করে ছোট ছোট দলে অনুশীলন করতে হতো।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে যাওয়ার পথটিও বদলে গেছে। আগের অগোছালো ঘাসে ভরা ঢালু জায়গার বদলে এখন সেখানে আধুনিক, পেশাদার ও আলোকিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।কোভেন্ট্রি সিটির বিবর্তনে ল্যাম্পার্ডের বিশেষ ভূমিকা আছে। ক্লাব ফুটবলের সম্ভাব্য সব শিরোপা তার ঝুলিতে আছে। একজন বড় মাপের খেলোয়াড় হিসেবে তার প্রভাবেই অনেক খেলোয়াড় অন্য প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও কোভেন্ট্রিতে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন।ল্যাম্পার্ডের কাজের বড় একটি অংশ ছিল দলে থাকা সব খেলোয়াড়কে, সে নতুন হোক বা পুরোনো; খেলার সুযোগ কম পেলেও যেন দলের অংশ মনে হয়, তা নিশ্চিত করা।তিনি ব্রেন্ডন থমাস-অ্যাসান্তের মতো খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছেন। গত বছর যিনি ব্লাকবার্ন রোভার্স বা ডার্বি কাউন্টিতে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তিনিই এবার গত মৌসুমের তুলনায় দ্বিগুণ গোল করেছেন। স্যালফোর্ড সিটির সাবেক এই ফরোয়ার্ডের মনোভাব ও পরিশ্রম দেখে ল্যাম্পার্ড বিশ্বাস করেছিলেন, তাকে আরও ভালো খেলোয়াড় বানানো সম্ভব।ক্লাব সূত্র জানিয়েছে, গত মৌসুমে সান্ডারল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তে হৃদয়ভাঙা হারের পর ল্যাম্পার্ড অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যেও নতুন বিশ্বাস তৈরি করেছেন।গ্রীষ্মে দলে খুব বেশি পরিবর্তন না হওয়ায় সেই হতাশা কাটাতে সময় লেগেছিল। তবে স্কোয়াডের ঘনিষ্ঠরা মনে করেন, নিজের সাম্প্রতিক খেলোয়াড়ি জীবন ও অভিজ্ঞতার কারণে ল্যাম্পার্ড সেই ব্যর্থতা সামলে দলকে সঠিক পরামর্শ দিতে পেরেছেন।তিনি জ্যাক বিডওয়েলকেও দলের কাছাকাছি রেখেছেন, যদিও তিনি ক্লাবের হয়ে প্রায় ১৫০ ম্যাচ খেলেও একাদশে নিয়মিত হতে পারেননি। একইভাবে সাত বছরে প্রায় ২০০ ম্যাচ খেলা অভিজ্ঞ জেমি অ্যালেনকেও দলের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছেন। গোলরক্ষক বেন উইলসনসহ এই তিনজন ড্রেসিংরুম ও সাইডলাইনে দারুণ অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। এতে স্কোয়াডের গভীরতা এবং ল্যাম্পার্ডের মানুষ সামলানোর দক্ষতা ফুটে ওঠে।অধিনায়ক ম্যাট গ্রিমসও দলকে অনুপ্রেরণামূলক বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে অন্যান্য শিরোপাজয়ী দলের গল্প শুনিয়ে তিনি দলকে উজ্জীবিত করেছেন, যা জানুয়ারির টালমাটাল সময়ে খুব কাজে এসেছে। শেষ পর্যন্ত, সব খেলোয়াড়ই ল্যাম্পার্ডের ওপর ভরসা করে, যদিও তারা জানে, প্রিমিয়ার লিগের প্রস্তুতির জন্য গ্রীষ্মে দলে পরিবর্তন আসবে।নিজের পক্ষ থেকে ল্যাম্পার্ড খেলোয়াড়দের ওপর চাপ পড়তে দেননি। তিনি বলেন, 'আমি বিষয়টা সহজ ও সরাসরি রাখতে চাই। বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। ১৫ বছর আগে বড় ম্যাচে আমার পরিস্থিতি তাদের চেয়ে আলাদা ছিল, কিন্তু দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে কোচ হওয়ায় একটা সুবিধা হলো আমি এসব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছি।'তিনি আরও বলেন, 'আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলতে পারি, যা খেলোয়াড়দের প্রভাবিত করে। আমি আগে এসব দেখেছি। প্রতিটি ম্যাচই ফাঁদ হতে পারে, যদি সঠিকভাবে না খেলো—হয় তুমি বেশি নিশ্চিন্ত হয়ে পড়বে, নয়তো চাপ তোমাকে গ্রাস করবে। তাই আমি সহজ রাখার চেষ্টা করি। আর যদি মনে হয় একটু ধাক্কা দেওয়া দরকার, আমি সেটা দিই। আমি মনে করি খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক আছে। তাই কখনো কখনো সেই ধাক্কাটাও দিতে পারি।''এই মৌসুমে সেই ধাক্কার খুব বেশি দরকার হয়নি। তারা শুধু একবার টানা দুই লিগ ম্যাচ হেরেছে, জানুয়ারিতে নরউইচ সিটি ও কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্সের কাছে, যখন ১০ পয়েন্টের লিড হারিয়ে যায়,'–তিনি যোগ করেন।জানুয়ারির শেষে মিডলসব্রোরও কোভেন্ট্রির সমান ৫৮ পয়েন্টে ছিল। এরপর কোভেন্ট্রি ১৩ ম্যাচে মাত্র একবার হেরেছে, জিতেছে ৮টি। ফেব্রুয়ারিতে মিডলসব্রো শীর্ষে উঠলেও কোভেন্ট্রি তাদের ৩-১ গোলে হারিয়ে আবার নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত ৯৯ মৌসুমে কোভেন্ট্রি মাত্র পাঁচবার টানা পাঁচ ম্যাচ জিতেছে, এর মধ্যে তিনবারই এসেছে এই মৌসুমে ল্যাম্পার্ডের অধীনে। আরও পড়ুন: বিশ্বকাপ ফাইনালের ১২ ডলারের পথের ভাড়া ১৫০ ডলার, ক্ষোভে ফুঁসছেন সমর্থকরাএ নিয়ে তিনি মজা করে বলেন, 'স্বাগতম! অবশ্যই আমি খুশি। তবে কৃতিত্বটা খেলোয়াড় ও স্টাফদেরই। আমি, ক্রিস জোন্স আর জো এডওয়ার্ডস দেড় বছর আগে এখানে এসেছিলাম, তখন সবই আমাদের জন্য নতুন ছিল। আমরা উপভোগ করেছি, কিন্তু ছেলেরা ও সবাই খুব কঠোর পরিশ্রম করেছে। মাঠে ফল তো খেলোয়াড়রাই দেয়।'ল্যাম্পার্ডের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল স্কাই ব্লুজদের হতাশাবাদী মানসিকতা বদলে দেওয়া। গত এক দশকে মাঠের ভেতরে ও বাইরে এত ধাক্কা খাওয়ার পর কোভেন্ট্রি সমর্থকদের হতাশ হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আবার শীর্ষ লিগে ফেরা তাদের বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছে।ল্যাম্পার্ড বলেন, 'আমি দেখেছি তারা কীভাবে নিচের লিগে নেমে গেছে। হয়তো সমর্থকদের এমন মানসিকতা থাকার অধিকার আছে। এটা মানুষের স্বভাব। হয়তো ব্রিটিশ সংস্কৃতিও এমন, সবসময় ভাবা সামনে খারাপ কিছু আছে। কিন্তু আমি বুঝি। এটাই ফুটবলের আনন্দের অংশ। শুনতে আনন্দের মতো না লাগলেও, ভালো সময় উপভোগ করতে হলে কষ্ট সহ্য করতেই হয়।'
Go to News Site