Collector
রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনে শোকের বছর | Collector
রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনে শোকের বছর
Jagonews24

রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনে শোকের বছর

নবুওয়াতের দশম বছরটি রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনের এক বিশেষ তাৎপর্যময় এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এ বছরটি একদিকে যেমন ছিল গভীর দুঃখ-কষ্টে পরিপূর্ণ, অন্যদিকে ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সান্ত্বনা, মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক উচ্চতায় উন্নীত হওয়ার এক অপূর্ব সময়। এই বছরকে নবীজি (সা.) নিজেই ‘আমুল হুযন’ বা ‘শোকের বছর’ নামে অভিহিত করেছেন। এই বছরের শুরুতেই রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি বড় ব্যক্তিগত শোকের সম্মুখীন হন। প্রথমত, তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী, সহানুভূতির আশ্রয়, এবং ইসলামের প্রথম বিশ্বাসী হজরত খাদিজার (রা.) ইন্তেকাল ঘটে। তিনি শুধু একজন স্ত্রীই ছিলেন না; বরং নবীজির দাওয়াতি জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে ছিলেন শক্তির উৎস। নবুয়তের সূচনালগ্নে যখন সবাই তাঁর বিরোধিতা করেছিল, তখন খাদিজা (রা.) নিঃশর্তভাবে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেন। তার ইন্তেকাল রাসুলুল্লাহর (সা.) হৃদয়ে গভীর শোকের ছায়া ফেলে। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যুবরণ করেন তাঁর চাচা আবু তালেব। তিনি যদিও ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবুও নবীজির (সা.) প্রতি তাঁর স্নেহ, মমতা ছিল অসাধারণ। মক্কার মুশরিকদের বিরোধিতা ও অত্যাচারের মধ্যে আবু তালেব ছিলেন রাসুলুল্লাহর (সা.) জন্য এক দৃঢ় ঢাল। তার মৃত্যুর ফলে নবীজি (সা.) সামাজিকভাবে আরও অসহায় হয়ে পড়েন এবং শত্রুদের আক্রমণ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই দুই প্রিয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যু নবীজিকে (সা.) গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি এই বছরকে ‘আমুল হুযন’ বা শোকের বছর নামে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু এই দুঃখ তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং তিনি ইসলামের দাওয়াত প্রচারে আরও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হন। এই প্রেক্ষাপটে নবীজি (সা.) তায়েফে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর আশা ছিল, মক্কার মানুষ যদিও ইসলাম গ্রহণে অনীহা দেখাচ্ছে, তায়েফের লোকেরা হয়ত এই সত্যের আহ্বান গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তায়েফবাসী শুধু তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যানই করেনি, বরং তাঁকে অপমান ও নির্যাতন করে তায়েফ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। তারা তাঁর দিকে পাথর ছুঁড়ে মারে, তাঁর শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। তাঁর পায়ের জুতো রক্তে ভিজে যায়। এই কঠিন সময়ে নবীজির (সা.) সঙ্গে ছিলেন হজরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)। তিনি নিজের শরীর দিয়ে নবীজিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন এবং নিজেও গুরুতর আহত হন। তায়েফের এই নির্মম আচরণ নবীজির (সা.) জীবনের এক চরম পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত নির্যাতনের পরও তিনি তাদের অভিশাপ দেননি বা তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করেননি; বরং তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, তারা হেদায়াত থেকে বঞ্চিত হলেও ভবিষ্যতে তাদের বংশধররা যেন ইমান গ্রহণ করে। এই দুঃখ-কষ্ট ও প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসুলকে এক মহান উপহার প্রদান করেন—ইসরা ও মেরাজ। এটি ছিল এক অলৌকিক সফর, যেখানে নবীজিকে আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চতম মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়। এই সফরে হযরত জিবরাইল (আ.) নবীজিকে (সা.) মক্কা থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে যান। এরপর শুরু হয় মেরাজ—অর্থাৎ আসমানের দিকে আরোহন। তিনি সাত আসমান অতিক্রম করেন এবং অনেক নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যেমন—হযরত আদম (আ.), ইবরাহিম (আ.), ইদ্রিস (আ.), ইউসুফ (আ.) প্রমুখ। তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নামের দৃশ্য দেখানো হয়, যা মানবজাতির জন্য শিক্ষা ও সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত। মেরাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়া। প্রথমে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু নবীজির বারবার অনুরোধের ফলে তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হয়, যদিও সওয়াব রাখা হয় পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমান। এ ছাড়া সুরা বাকারার অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ শেষ দুই আয়াত এ রাতেই নাজিল হয়। মেরাজের এই ঘটনা মক্কার মুশরিকদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়। তারা এটি নিয়ে উপহাস করতে থাকে। কিন্তু হযরত আবু বকর (রা.) এই সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই নিঃসংকোচে তা সত্য বলে মেনে নেন। তার এই অকুণ্ঠ বিশ্বাসের কারণে তিনি ‘সিদ্দিক’ উপাধিতে ভূষিত হন—যার অর্থ ‘সত্যায়নকারী’। নবুওয়াতের দশম বছরটি ছিল একদিকে গভীর দুঃখ ও কষ্টের, অন্যদিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সান্ত্বনা ও সম্মানের বছর। এটি আমাদের শেখায়, জীবনে যত বিপদ-আপদ আসুক না কেন, ধৈর্য, বিশ্বাস ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে তিনি অবশ্যই উত্তম প্রতিদান দান করেন। রাসুলুল্লাহর (সা.) জীবনের এই অধ্যায় মানবজাতির জন্য এক অনন্ত প্রেরণার উৎস, যা আমাদেরকে কঠিন সময়েও সত্যের পথে অবিচল থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। ওএফএফ

Go to News Site