Collector
পরিবহন খরচ বাড়তি, ঢাকার হাটে কোরবানির পশু তোলা নিয়ে শঙ্কা | Collector
পরিবহন খরচ বাড়তি, ঢাকার হাটে কোরবানির পশু তোলা নিয়ে শঙ্কা
Jagonews24

পরিবহন খরচ বাড়তি, ঢাকার হাটে কোরবানির পশু তোলা নিয়ে শঙ্কা

প্রতি বছর ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খামারিরা রাজধানীর কোরবানির হাটে পশু নিয়ে আসেন বিক্রির জন্য। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামারিরা ভালো লাভের আশায় ঢাকার হাটকেই বেছে নেন। এতে নগরবাসীরও গরু-ছাগল কেনা সহজ হয়। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে সৃষ্টি হয় নতুন কর্মসংস্থান। তবে চলতি বছর এই চিত্র অনেকটাই বদলে যেতে পারে। খামারিরা বলছেন, গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে তারা এরই মধ্যে অতিরিক্ত খরচের চাপে আছেন। এখন জ্বালানি সংকটের জেরে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে অনেকেই ঢাকায় গরু নিয়ে আসতে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। সার্বিকভাবে তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কোরবানির হাটে গরুর সরবরাহ কমে যেতে পারে, যা বাজারদরে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবহন খরচ গত বছরের তুলনায় এখনই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। কোরবানির সময় তা আরও বাড়তে পারে। এসব কারণে আদৌ গরু ঢাকায় নিয়ে যেতে পারবো কি না, তা নিয়ে এখন সংশয়ে আছি।- মেহেরপুরের খামারি মনিরুল ইসলাম মেহেরপুরের খামারি মনিরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে গরু পালনে তেমন কোনো লাভ নেই; বরং সব খরচ হিসাব করলে লোকসানের পাল্লাই ভারী। যেমন, ৮০ হাজার টাকায় একটি গরু কিনে সেটি লালন-পালনে আরও প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। ৮ থেকে ৯ মাস পর গরুটি দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা গেলেও নিজের শ্রমের মূল্য ধরলে তেমন লাভ থাকে না। তারপরও মানুষ গরু পালন করে। কারণ এটি বিক্রি করে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা পাওয়া যায়। এই টাকা দিয়ে অনেকেই ছেলে-মেয়ের বিয়ে বা সংসারের বড় খরচ মেটান। এটা অনেকটা ব্যাংকে ধীরে ধীরে টাকা জমানোর মতো। কিন্তু এ বছর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে জানিয়ে মনিরুল বলেন, ‘গো-খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া। আর পরিবহন খরচ গত বছরের তুলনায় এখনই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। কোরবানির সময় তা আরও বাড়তে পারে। এসব কারণে আদৌ গরু ঢাকায় নিয়ে যেতে পারবো কি না, তা নিয়ে এখন সংশয়ে আছি।’ কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় গরু পরিবহনে ৩৫ হাজার টাকার নিচে ট্রাক পাওয়া যাবে না বলে জানাচ্ছেন চালকরা/ফাইল ছবি বাড়ছে পরিবহন খরচ বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কুষ্টিয়া-ঢাকা রুটে ট্রাক চালানো আল-আমিনের সঙ্গে। তিনি খরচ বেড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘গত বছর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় গরু পরিবহনে খরচ ছিল প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যা এবার বেড়ে ৩০ হাজার টাকারও বেশি হয়েছে। বর্তমানে এই ভাড়ায় আমরা সবজিও পরিবহন করছি। জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে কোরবানির আগমুহূর্তে গরু পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার নিচে কোনো ট্রাক পাওয়া যাবে না।’ এদিকে, এক যাত্রায় বের হলেও অনেক সময় জ্বালানি পাওয়ার জন্য ট্রাকগুলোকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত সময়ের খরচ কে বহন করবে- এ প্রশ্নও তুলেছেন চালকরা। আরও পড়ুনরাজধানীতে বসছে ২৪ অস্থায়ী পশুর হাট, আফতাবনগরে ‘অনিশ্চিত’তেলের অজুহাতে বেনাপোলে ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৬ হাজারতেল সংকট ও রপ্তানি কমার অজুহাতে বেড়েছে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া আল-আমিন জানান, এখন ছোট পিকআপে ঢাকায় যেতে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আর বড় ট্রাকের ক্ষেত্রে খরচ দ্বিগুণেরও বেশি। জ্বালানির দাম কমলে ও সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ভাড়া কিছুটা কমতে পারে। তবে সংকট অব্যাহত থাকলে ভাড়া আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিচর্যায় অতিরিক্ত ব্যয় কুষ্টিয়ার আমলা এলাকার খামারি মজিবর রহমান জানান, ভুসি এবং ভাঙানো গম ও ভুট্টা সবকিছুরই দাম অনেক বেড়েছে। এছাড়া গরুকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত ভিটামিন দিতে হয়। পাউডার (এ, ডি, ই ও বি-কমপ্লেক্স), লিকুইড ও ইনজেকশন (এডি৩ই ও বি-কমপ্লেক্স) ব্যবহার করতে হয়। এসব না দিলে গরুর খাবারের রুচি কমে যায় এবং ছোটখাটো অসুস্থতা থেকে বড় রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব ওষুধের দামও এখন বেশি। সেই সঙ্গে গরমের কারণে ষাঁড়গুলোকে সারাক্ষণ বৈদ্যুতিক ফ্যানের নিচে রাখতে হয়। এখন লোডশেডিংয়ের কারণে অনেক সময় হাতপাখাই ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় গরু পরিবহনে খরচ ছিল প্রায় ২৫ হাজার টাকা, যা এবার বেড়ে ৩০ হাজার টাকারও বেশি হয়েছে। বর্তমানে এই ভাড়ায় আমরা সবজিও পরিবহন করছি। জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে কোরবানির আগমুহূর্তে গরু পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকার নিচে কোনো ট্রাক পাওয়া যাবে না।- ট্রাকচালক আল-আমিন মজিবর বলেন, ‘সব মিলিয়ে এত খরচের পর তেমন কোনো লাভ থাকে না। তারপরও খামারিরা আশা করেন, ঢাকায় গরু বিক্রি করে একসঙ্গে বড় অঙ্কের টাকা পাবেন। কিন্তু এখন ট্রাকের ভাড়া বাড়তে শুরু করায় এ বছর আর ঢাকায় যাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকায় গরু নিয়ে যেতে না পারলে লোকসান আরও বাড়বে।’ গো-খাদ্যের বাজার পরিস্থিতি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে সব ধরনের গো-খাদ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। প্রতি কেজি গমের খোসা (চেলটি) ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, খুদ ৫৫ টাকা, ভাঙানো ভুট্টা ৪৫ টাকা ও ভাঙানো গম ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি আঁটি ঘাস ২০ টাকা, কাঠাল পাতা ২০ টাকা, বিছালি ৬ থেকে ৭ টাকা ও ধানের গুড়া ২০ টাকা কেজিতে কিনতে হচ্ছে। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে খামারিরা এরই মধ্যে অতিরিক্ত খরচের চাপে আছেন/ফাইল ছবি সেই সঙ্গে খামারিদের হিসাব অনুযায়ী, গরমের সময় একটি গরুর পেছনে প্রতি মাসে ভিটামিন বাবদ এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ হয়। কোনো রোগ দেখা দিলে চিকিৎসা খরচ তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ও জিংক বাবদ অতিরিক্ত খরচও যোগ হয়। বিপাকে খুচরা ব্যবসায়ীরাও বর্তমান পরিস্থিতিতে গো-খাদ্যের খুচরা দোকানিরাও পড়েছেন চাপে। চুয়াডাঙ্গার আসমানখালি এলাকার ব্যবসায়ী আকুল হোসেন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে খাদ্যবাহী গাড়ির সংখ্যা কমে গেছে। ফলে সব ধরনের খাদ্যের দাম বেড়েছে। তারা বেশি দামে কিনে সামান্য লাভ রেখে খামারিদের কাছে বিক্রি করছেন। আরও পড়ুন৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে ট্রাকভাড়া, বাড়ছে মাছের দামজেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দামে আকাশপথে ভ্রমণে অশনিসংকেতউৎপাদন খরচের চেয়ে কমছে ডিমের দাম, রাজশাহীতে বন্ধ হচ্ছে ছোট খামার তিনি আরও জানান, অধিকাংশ খামারি বাকিতে গো-খাদ্য নেন এবং কোরবানির পর গরু বিক্রির টাকা দিয়ে দেনা পরিশোধ করেন। এজন্য ব্যবসায়ীরা হালখাতার ব্যবস্থাও রাখেন। তবে খামারিরা যদি ঢাকায় গরু নিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে বকেয়া পরিশোধে জটিলতা তৈরি হবে। কারণ স্থানীয় বাজারে অনেক সময় গরু বিক্রি হলেও সেটা বাকিতে হয়। ফলে দোকানের পাওনা পরিশোধ করা খামারিদের কঠিন হয়ে পড়ে। এতে গো-খাদ্য ব্যবসায়ীরাও আর্থিক সংকটে পড়তে পারেন। তবে কিছুটা স্বস্তিতে আছেন যারা নিজেরাই গো-খাদ্য উৎপাদন করেন। এমন একজন খামারি মেহেরপুরের গাংনীর আশরাফ আলী। তিনি জানান, নিজস্ব জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে খরচ কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও অন্যান্য ব্যয় হ্রাস করা যাচ্ছে না। অধিকাংশ খামারি বাকিতে গো-খাদ্য নেন এবং কোরবানির পর গরু বিক্রির টাকা দিয়ে দেনা পরিশোধ করেন। এজন্য ব্যবসায়ীরা হালখাতার ব্যবস্থাও রাখেন। তবে খামারিরা যদি ঢাকায় গরু নিয়ে যেতে না পারেন, তাহলে বকেয়া পরিশোধে জটিলতা তৈরি হবে।- চুয়াডাঙ্গার ব্যবসায়ী আকুল হোসেন আশরাফ আলী বলেন, ‘গরু মোটা-তাজা করতে প্রতিদিন গোসল করানোর জন্য শ্রমিক রাখতে হয়। কোরবানির দুই মাস আগে দিনে দুইবার গোসল করানো হয় এবং সপ্তাহে একদিন শ্যাম্পু দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়। এতে গরুর খাবারের রুচি বাড়ে। বর্তমানে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গোসল করানোতেও অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে। সব মিলিয়ে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা না পেলে এ বছর গরু নিয়ে ঢাকায় যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’ রাজধানীর পশুর হাটগুলো চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৭ বা ২৮ মে দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্‌যাপিত হবে। এ উপলক্ষে রাজধানীতে ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এরই মধ্যে ১২টি স্থানে হাট ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ১২টি হাটের ইজারা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীতে ২৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন/ফাইল ছবি ডিএসসিসি নির্ধারিত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- উত্তর শাহজাহানপুর মৈত্রী সংঘ ক্লাবের খালি জায়গা, পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পশ্চিম পাশে নদীর তীরবর্তী খালি জায়গা, দনিয়া কলেজের পূর্ব পাশ ও ছনটেক মহিলা মাদরাসার আশপাশের খালি জায়গা, ধোলাইখালে সাদেক হোসেন খোকা মাঠের দক্ষিণ পাশ ও ট্রাক টার্মিনাল এলাকা, রহমতগঞ্জ ক্লাব প্রাঙ্গণ, হাজারীবাগের ইনস্টিটিউট অব লেদার টেকনোলজি-সংলগ্ন এলাকা, মেরাদিয়া বাজারের পূর্ব পাশে খালপাড়, কমলাপুর সাদেক হোসেন খোকা কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশ, আমুলিয়া আলীগড় মডেল কলেজের উত্তর পাশ, শ্যামপুর-কদমতলী ট্রাক স্ট্যান্ড এলাকা, লালবাগের রহমতগঞ্জ ক্লাব-সংলগ্ন স্থান এবং কামরাঙ্গীরচর বেড়িবাঁধ। আরও পড়ুনএক ছাগলেই ভাগ্য বদল মমতাজ বেগমেরমুরগি ও মাছের সমন্বিত খামারে জীবন বদলে গেছে সজীবেরদুবাই থেকে ফিরে গরুর খামার, মাসে আয় আড়াই থেকে তিন লাখ অন্যদিকে, ডিএনসিসি নির্ধারিত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- খিলক্ষেত বাজার-সংলগ্ন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গা, মিরপুর সেকশন-৬ এর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকা, কালশী বালুর মাঠ, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট-সংলগ্ন এলাকা, মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার এলাকা, পূর্ব হাজীপাড়ার ইকরা মাদরাসার পাশ, মোহাম্মদপুর বছিলা এলাকার ৪০ ফিট রাস্তার পাশ, উত্তরা দিয়াবাড়ির ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন এলাকা, রানাভোলা অ্যাভিনিউ থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত এলাকা, কাঁচকুড়া বাজার-সংলগ্ন রহমাননগর আবাসিক এলাকা, খিলক্ষেত মস্তুল চেকপোস্ট-সংলগ্ন পশ্চিমপাড়া এবং ভাটারা সুতিতোলা খালপাড় এলাকা। এছাড়া, ডিএনসিসির গাবতলী ও ডিএসসিসির সারুলিয়া স্থায়ী হাটেও কোরবানির পশু বিক্রি করা হবে। ঈদের দিনসহ মোট পাঁচদিন হাট বসবে রাজধানীতে। ইএআর/একিউএফ

Go to News Site