Collector
সাগরে কাঠের টুকরো ধরে বেঁচেছেন রাহেলা, ১৯ নারী ডুবেছে চোখের সামনে! | Collector
সাগরে কাঠের টুকরো ধরে বেঁচেছেন রাহেলা, ১৯ নারী ডুবেছে চোখের সামনে!
Somoy TV

সাগরে কাঠের টুকরো ধরে বেঁচেছেন রাহেলা, ১৯ নারী ডুবেছে চোখের সামনে!

আন্দামান সাগরের উত্তাল জলরাশিতে চারদিকে শুধু নোনা জল আর মৃত্যুর হাতছানি। চোখের সামনে একে একে তলিয়ে যাচ্ছিলেন সহযাত্রীরা। কেউ চিৎকার করছিলেন বাঁচার আকুতিতে, কেউবা নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছিলেন চিরতরে। সেই যমদূতসম ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে টানা দুই দিন এক রাত একটি কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে বেঁচে ফিরেছেন ২৫ বছর বয়সী রাহেলা বেগম। ২০ জন নারীর মধ্যে একমাত্র তিনিই এখন জীবিত, বাকি ১৯ জনই সাগরের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে গেছেন।গত ৮ এপ্রিল আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছে গভীর সমুদ্রে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। পরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড, যাদের মধ্যে ৮ জন পুরুষ ও ১ জন নারী রয়েছেন। ১১ এপ্রিল তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে উখিয়ার ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিজ ঘরে ফিরেছেন রাহেলা, কিন্তু সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাকে এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি দিচ্ছে না।উখিয়ার ক্যাম্প-১৫, এফ-১৫ ব্লকের বাসিন্দা রাহেলা বেগম জানান, উন্নত জীবনের আশায় গত ৪ এপ্রিল তিনি আরও অনেকের সঙ্গে একটি ট্রলারে করে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু ৮ এপ্রিল মাঝসাগরে তাদের ট্রলারটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ডুবে যায়।নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাহেলা বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমি দুই দিন এক রাত সাগরের পানিতে ভেসে ছিলাম। ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল, কিন্তু ডুবে যাওয়ার পর কে কোথায় হারিয়ে গেছে, তা আমি জানি না। দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসতে ভাসতে একটি কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে ছিলাম। কিন্তু একপর্যায়ে সেটিও উল্টে গিয়ে হারিয়ে যায়। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে জ্ঞান ফিরে দেখি একটি জাহাজ আমাকে উদ্ধার করছে।'রাহেলা আরও জানান, সেই অভিশপ্ত ট্রলারে তার সঙ্গে মোট ২০ জন নারী ছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র তাকেই জীবিত উদ্ধার করে বাংলাদেশে ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা ভেবে এখনো শিউরে উঠছেন তিনি।রাহেলা ফিরে আসলেও তার চোখেমুখে এখনও সেই ভয়ংকর রাতের আতঙ্ক। রাহেলার ভাই মো. আয়াছ জানান, তার বোন মানসিকভাবে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘক্ষণ সাগরে ভেসে থাকার শারীরিক ক্লান্তি এবং চোখের সামনে এত মানুষের মৃত্যু দেখার মানসিক আঘাত তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। আয়াছ বলেন, 'আমার বোন কারো সাথে কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়েছেন।'এদিকে, রাহেলা বেঁচে ফেরার খবর ছড়িয়ে পড়লে তার ঘরে এখন উৎসুক মানুষ ও স্বজনহারাদের ভিড়। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন ব্লকের রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের নিখোঁজ স্বজনদের কোনো খবর পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় রাহেলার কাছে ছুটে আসছেন। কিন্তু রাহেলার নীরবতা আর শূন্য দৃষ্টি যেন সেই ট্র্যাজেডির গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।আরও পড়ুন: মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবি: নিখোঁজদের স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর দালালের মিথ্যা আশ্বাসএই ট্রলার ডুবির ঘটনা রোহিঙ্গা সংকটের এক করুণ চিত্রকে পুনরায় সামনে এনেছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মো. মিজানুর রহমান এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের কোনো প্রত্যাবাসন না হওয়া এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ।কমিশনার মো. মিজানুর রহমান পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, 'গত নয় বছরে রোহিঙ্গাদের কোনো প্রত্যাবাসন হয়নি। তারা নিজ দেশে ফিরতে পারছে না, বরং এখনো নতুন করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসছে। এতে একটি গভীর হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাগরপথে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় হওয়া জরুরি। তা না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়বে।'আরও পড়ুন: মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবি: সেই ‘গোপন কক্ষ’ ও ৩৩ লাশের রহস্যতিনি আরও জানান, বর্তমানে সমুদ্রের আবহাওয়া অত্যন্ত টালমাটাল। এমন সময়ে ছোট কাঠের নৌকায় গভীর সমুদ্র পাড়ি দেওয়া আত্মহত্যার শামিল।ট্রলার ডুবির এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি মানবপাচারকারী চক্রকে ধরতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে কমিশনার বলেন, 'যারা এসব মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত, বিশেষ করে যদি তারা বাংলাদেশি নাগরিক হয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা আশা করি, দ্রুত মূল হোতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।'আরআরআরসি কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, তারা নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে। কমিশনার সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন কেউ ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রায় অংশ না নেয় এবং মানবপাচার রোধে সবাই সচেতন ভূমিকা রাখে।

Go to News Site