Jagonews24
নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়লেও এখানকার কৃষকদের সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। ছয় বছরে ৬২ জনের মৃত্যুও যেন প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে পারেনি। অকার্যকর লাইটনিং অ্যারেস্টার আর অস্তিত্বহীন তালগাছ প্রকল্পের আড়ালে অরক্ষিতই থেকে গেছে দেশের ‘খাদ্যভাণ্ডার’ খ্যাত এই বিশাল জনপদ। এর ফলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাওরে বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। মাঠজুড়ে পাকা বোরো ধান থাকলেও জীবনঝুঁকির কারণে কৃষিশ্রমিকেরা মাঠে নামতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটতে যাচ্ছেন, আর তাতেই ঘটছে হতাহতের ঘটনা। অকার্যকর ‘বজ্রনিরোধক দণ্ড’ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কমাতে সরকার বজ্রনিরোধক দণ্ড বা লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপনের উদ্যোগ নিলেও, এর কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। ২০২২ সালে নেত্রকোনায় জেলায় ৩২টি দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব দণ্ডের বেশিরভাগই হাওরের মাঝখানে বা মূল ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে না বসিয়ে তুলনামূলক নিরাপদ বাজার বা বসতিপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব দণ্ডও অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে। বজ্রনিরোধক এসব দণ্ড স্থাপনে প্রতিটিতে ব্যয় ধরা হয় দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা করে। স্থানীয়রা বলছেন, সরকার কোটি টাকা খরচ করে এসব যন্ত্র হাওরে স্থাপনের জন্য দিলেও, বেশিরভাগই স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কিংবা অন্য কোনো ভবনের ছাদে, বাজারে অথবা রাস্তার পাশে। এগুলো আর এখন নেই। আরও পড়ুনবজ্রপাতে মানুষ মরে হাওরে, যন্ত্র বসেছে সাবেক এমপির বাড়ির সামনেবজ্রপাতে ১৫ বছরে দুই হাজার মৃত্যু, সতর্কতা ও প্রস্তুতি এখনো সীমিতসারাদেশে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু স্থানীয় আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নেত্রকোনায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বজ্রপাত বেশি হওয়ায় প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। দায়সারা নানা প্রকল্প নেওয়া হলেও কোনোটাই কাজে আসেনি। দণ্ড স্থাপনের পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি। এখন যন্ত্রগুলো সচল আছে কি না, কেউ জানে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বজ্রনিরোধক দণ্ডে চারপাশের নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গায় বজ্রপাতের ফলে সৃষ্ট উচ্চমাত্রার বিদ্যুৎকে সহজে মাটিতে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয়। এতে ওই স্থানে কোনো প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে না। নেত্রকোনায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলোর পরিসর ছিল চারদিকে প্রায় ১১০ মিটার। নিশ্চিহ্ন ২ লাখ তালগাছও বজ্রপাত থেকে রক্ষায় ২০১৮ সালে সরকারি উদ্যোগে জেলায় ২ লক্ষাধিক তালগাছ রোপণ করা হয়েছিল। তবে এখন সেসব গাছের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। যার ফলে সরকারের এই বিশাল বিনিয়োগও এখন পুরোপুরি বৃথা। কৃষিবিদ দিলীপ সেন বলেন, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত দিক বজ্রপাত থেকে রক্ষায় সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছে কার্বনের স্তর বেশি থাকায় তা বজ্রপাত নিরোধে সহায়তা করে। তালগাছের বাকলে পুরু কার্বনের স্তর থাকে। এ কারণে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় তালগাছ রোপণে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। আরও পড়ুনবজ্রপাতে প্রাণহানিরোধে পদক্ষেপ নিতে কমিটি গঠনের নির্দেশযুক্তরাষ্ট্রে ৮২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বজ্রপাত, বিশ্বে রেকর্ড তিনি বলেন, ২০১৮ সালে সারা দেশের সঙ্গে নেত্রকোনায়ও সরকারিভাবে তালগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন এসব তালগাছের কোনো অস্তিত্ব নেই। এগুলো রোপণের পর আর কোনো পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে এ প্রকল্পের কোনো ফল হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, নেত্রকোনায় বজ্রপাতে ২০২০ সালে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহেই মারা গেছেন আরও ২ জন। কিন্তু এর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশী বলে দাবি স্থানীয়দের। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে এপ্রিল ও মে মাসেই বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। মাঠে শ্রমিক সংকট, দুশ্চিন্তায় কৃষক খালিয়াজুরী উপজেলার সদরের কৃষক মহসিন মিয়া বলেন, মাঠে ধান পেকে আছে। শ্রমিক পাইনি। জমিতে বৃষ্টির পানি লেগে গেছে। স্থানীয় শ্রমিকরা বজ্রপাতের ভয়ে মাঠে যেতে চান না। ঝড় বৃষ্টি এলেই বজ্রপাত হয়। শ্রমিকরা হতাহত হয়। এই ভয়ে তারা মাঠে যেতে চায় না। একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর গ্রামের কৃষক পলাশ মিয়া। তিনি বলেন, কালবৈশাখীর ভয়ে কৃষি শ্রমিকরা মাঠে যেতে ভয় পায়। জমিতে পানি জমে গেছে হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটা যায় না। ডিজেলের সংকট রয়েছে। এক হাজার টাকা রোজেও শ্রমিক যেতে চায় না। হাওরে পাকা ধান নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের দাবি, পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের মতো নেত্রকোনাতেও আধুনিক ‘লাইটনিং শেড’ বা আশ্রয়স্থল নির্মাণ করা হোক, যেখানে বজ্রপাতের সময় কৃষকরা নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও শৌচাগার সুবিধা পাবেন। তারা জানান, ২০২৩ সালে লোকাল গভর্নমেন্ট ইনিশিয়েটিভ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (লজিক) প্রকল্পের মাধ্যমে পাশ্বর্বতী সুনামগঞ্জ জেলায় ৪ টি লাইটনিং শেড (আশ্রয়স্থল) নির্মাণ করা হয়। ১৮ ফুট উচ্চতা ও মাঝখানে ৯ ফুটের পাকা মেঝে রয়েছে এতে। রাখা হয়েছে বিশুদ্ধ পানি, টয়লেটের ব্যবস্থা। এসবের প্রতিটি নির্মাণ করতে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আরও পড়ুনদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হতে যাচ্ছে বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবসবজ্রপাত থেকে রক্ষায় দুই মন্ত্রণালয়ের একই ধরনের প্রকল্প যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার তথ্য বলছে, সারা বিশ্বে মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জসহ নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০১৭ সালের দিকে এই গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। এ গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বায়ুদূষণ, বায়ু–মাটির তাপ বৃদ্ধিসহ বেশ কিছু কারণে বজ্রপাত বেশি হচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু হাওরাঞ্চলের ওপরে এসে মেঘালয় পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই শুষ্ক বাতাসে তাপমাত্রা বেশি। এখানে জমে থাকা উষ্ণ মেঘে মেঘে ঘর্ষণের ফলে বজ্রপাত বেশি হয়। হাওরে গত ৩০ বছরে ৬০ শতাংশ জলাভূমি পরিবর্তন হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় পরিবেশবাদীরা বলছেন, দায়সারা কোনো পদক্ষেপ বা প্রকল্প নয়, সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, গবেষকসহ সবাইকে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। এতে প্রায় ৮০ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব বলেও দাবি করা হয়। খালিয়াজুরীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বজ্রপাতের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে জরুরি নির্দেশনাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা পরিষদ থেকে কয়েকটি লাইটনিং শেড (আশ্রয়স্থল) নির্মাণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মানুষের কাজে পৌঁছানো গেলে মানুষ দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবেন। এতে ঝুঁকি কমবে। কেএইচকে/এমএস
Go to News Site