Somoy TV
মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানি রহ.জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সংযমের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, সময়সচেতন একজন প্রাজ্ঞ আলেম, মনস্বী লেখক এবং দৃঢ় নেতৃত্বের অধিকারী এক মহান ব্যক্তিত্ব।১৯৩৬ সালের ২১ জুলাই (১৩৫৫ হিজরির ২ জুমাদাল উলা ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার ঐতিহাসিক দেওবন্দ মহল্লায় তার জন্ম। এক সমৃদ্ধ জ্ঞান-ঐতিহ্যের পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। তার বংশধারা গিয়ে মিশেছে ইসলামের তৃতীয় খলিফা, রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জামাতা, ‘যিন-নুরাইন’ খ্যাত হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সঙ্গে। পিতা মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত আলেম আর দাদা মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াসিন (রহ.) ছিলেন দেওবন্দের কীর্তিমান শিক্ষক। এমন এক পরিবেশে তিনি বড় হয়েছেন, যেখানে জ্ঞান ছিল উত্তরাধিকার আর সাধনা ছিল নিত্যদিনের অনুশীলন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় দারুল উলুম দেওবন্দে। দেশভাগের পর পরিবারের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে পাড়ি জমান। ১৯৫১ সালে করাচিতে পিতার প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুমে ভর্তি হয়ে তিনি নতুনভাবে জ্ঞানসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চতর ইসলামি আইন বিষয়ে বিশেষায়িত গবেষণায় নিজেকে নিবিষ্ট করেন। পাশাপাশি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মৌলবি মুনশি’ পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন, যা তাঁর বহুমাত্রিক শিক্ষারই প্রমাণ। তার শিক্ষকবৃন্দও ছিলেন জ্ঞানের আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রসম। মাওলানা রশীদ আহমাদ লুধিয়ানবি, মাওলানা আকবর আলী সাহারানপুরি, মাওলানা সাবহান মাহমুদ, মাওলানা সলিমুল্লাহ খান এদের মতো মনীষীদের সান্নিধ্যে তিনি গড়ে তোলেন নিজের চিন্তার ভিত। পাশাপাশি তিনি তাঁর পিতা মুফতি মুহাম্মদ শফি, মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলবি, কারি মুহাম্মদ তায়্যিব, শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া কান্ধলবি ও মাওলানা যফর আহমদ উসমানির কাছ থেকে হাদিসের ইজাজত লাভ করেন। ১৯৬১ সালে দারুল উলুম করাচি’র শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে । এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণপুরুষ। পিতার ইন্তেকালের পর তিনি দারুল উলুম করাচীর মহাপরিচালক নিযুক্ত হন এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ইন্তেকাল করলে তিনি সভাপতির দায়িত্বও গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু তা বহন করেন। একই সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন প্রধান মুফতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষক হিসেবে তার ব্যক্তিত্ব ছিল অনন্য পরিপাটি, সংযত, স্পষ্টভাষী এবং মধুর আচরণে তিনি ছিলেন সবার কাছে প্রিয়। তাঁর পরিচালনা-দক্ষতা ছিল এতটাই নিখুঁত যে, অনেকেই মনে করতেন তিনি চাইলে একজন সফল রাষ্ট্রনায়কও হতে পারতেন। ফিকহ ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ছিল অতুলনীয়। তিনি ফতোয়ার ভাষা, উপস্থাপন ও যুক্তির সূক্ষ্ম দিকগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যালোচনা করতেন এবং অতি সূক্ষ্ম ত্রুটিগুলোকেও চিহ্নিত করতে পারতেন। এতে তাঁর বিদ্যাবুদ্ধির গভীরতা ও দায়িত্ববোধের পরিচয় মেলে। বক্তা হিসেবেও তিনি ছিলেন মুগ্ধকর। অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলা, প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় বক্তব্য রাখা এই ছিল তার বৈশিষ্ট্য। তার কথায় ছিল স্বচ্ছতা আর হৃদয়ে পৌঁছানোর এক অদ্ভুত শক্তি। মুফতি রফি উসমানি ছিলেন বিনয়, ধৈর্য ও সহমর্মিতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর জীবনে শৃঙ্খলা, নিয়মের প্রতি আনুগত্য, অন্যের অধিকার আদায়ের সচেতনতা এবং সংযম ছিল স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তিনি কখনো তাড়াহুড়ো পছন্দ করতেন না; বরং ধীরস্থিরতা ও পরিমিতিবোধকে প্রাধান্য দিতেন। অনর্থক কথা ও কাজ থেকে দূরে থাকা ছিল তাঁর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর পুরো জীবন যেন ছিল এক সুশৃঙ্খল সাধনার প্রতিফলন। দারুল উলুম করাচীর বাইরে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অল পাকিস্তান উলামা কাউন্সিল, কাউন্সিল অব ইসলামিক আইডিওলজি, রুআতে হেলাল কমিটি এবং সিন্ধু সরকারের যাকাত কাউন্সিলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের শরিয়া বেঞ্চের উপদেষ্টা ছিলেন। পাশাপাশি এনইডি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তানের সহসভাপতি হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্যস্ততা যেন কখনোই তাঁর কলমকে থামাতে পারেনি। দায়িত্বের ভার, শিক্ষা-দীক্ষার ব্যস্ততা, ফতোয়া প্রদান, সবকিছুর মাঝেও মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানি রেখে গেছেন এক সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি নিয়মিত ফতোয়া লিখে গেছেন। তার লিখিত ফতোয়াগুলো ছয় খণ্ডে সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে ফতোয়া দারুল উলুম করাচী (ইমদাদুস সায়িলিন) নামে। পাশাপাশি নির্বাচিত গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়াগুলো নিয়ে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে নাওয়াদিরুল ফিকহ যা তাঁর গভীর ফিকহি প্রজ্ঞার সাক্ষ্য বহন করে। আরও পড়ুন: নিরন্তর সংগ্রামী চেতনার পথিকৃৎ ছিলেন মুফতি আমিনী রহ. তার খুতবা ও বয়ানসমূহও সমানভাবে প্রভাববিস্তারী। সেগুলো সংকলিত হয়ে নয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে “ইসলাহি তাকরিরে নামে—যেখানে ভাষা, ভাব ও উপদেশ একসঙ্গে মিলিত হয়ে হৃদয়ে রেখাপাত করে। এছাড়া তার রচনার বিস্তৃতি আরও বহুদূর। দরসে মুসলিম (২ খন্ড), রফিকে হজ, আদম আলাইহিস সালাম সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তক, আম্বিয়া কি সারজমিন মেঁ, ইয়ে তেরে পুর আসরার বান্দে, দোসরা জিহাদে আফগানিস্তান আওর হামারে ফারায়েয, জিহাদে কাশ্মীর আওর হামারে জিম্মাদারি, দো কওমি নাযরিয়া, ইখতিলাফ রহমত হে ফেরকাবন্দি হারাম, আহকামে যাকাত, আলামতে কিয়ামত আওর নুযুলে মাসিহ, আত তালিকাতুন নাফিআ আল ফাতহিল মুলহিম, বাইয়ুল ওয়াফা, ইউরোপ কে তিন মাআশি নেজাম, ইলমুস সিগা, আওরত কি সারবরাহি কি শারই হাইসিয়াত, ইসলাম মে আওরত কি হুকুমরানি, হায়াতে মুফতিয়ে আজম, কিতাবাতে হাদিস: আহদে রিসালাত ও আহদে সাহাবা মেঁ , মেরে মুর্শিদ হযরত ডা. আরেফি, ইসলাম মেঁ গোলামি কা তাসাওউর, সুন্নাত কা মাকাম আওর ফিতনায়ে ইনকারে হাদিস, মুস্তাহাবাত, তাওবা কি হাকিকত ও আহাম্মিয়ত, মাহে রমাযান : বখশিশ কা জারিয়া, জান্নাত কা আসান রাস্তা, তারিখ কে দরিচোঁ সে ইত্যাদি। ব্যক্তিগত জীবনে মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানি রহ. এক ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন। তার একমাত্র ছেলে ড. মাওলানা জুবায়ের আশরাফ উসমানি দারুল উলুম করাচী-র উস্তাযুল হাদিস ও মুফতি। এছাড়াও তিনি হাবিব ব্যাংক ও পাকিস্তান ইউনিয়ন ব্যাংকের শরিয়া বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিরলপ্রজ এ মনীষী দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০২২ সালের ১৮ নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। পরদিন সকাল নয়টায় তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর স্নেহধন্য প্রিয় অনুজ ও আজীবনের ছায়াসঙ্গী বিচারপতি মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি জানাযায় ইমামতি করেন। জানাযায় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তান-এর প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া পাকিস্তান-এর মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মদ হানিফ ঝালন্ধরি, সাইয়িদ মুখতারুদ্দিন শাহ, সিন্ধু প্রদেশের গভর্নর কামরান তিসোরিসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণ উপস্থিত ছিলেন। দারুল উলুম করাচি-র পুরনো কবরস্থানে বাবা-মায়ের মাঝে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। তার ইন্তেকালে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ছোট ভাই মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি আবেগভরা ভাষায় বলেন এই বিচ্ছেদ শুধু পারিবারিক নয়, বরং এক দীর্ঘ সাথিত্বের অবসান। তার ভাষায়, বড় ভাই ছিলেন জ্ঞান ও আমলের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। দারুল উলুম দেওবন্দের পক্ষ থেকেও গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানের তৎকালীর রাষ্ট্রপতি ড. আরিফ আলভি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, স্পীকার ও ডেপুটি স্পীকারসহ বিভিন্ন প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী, ভারত ও পাকিস্তানের বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম, রাজনীতিবিদ, সকলেই তার ইন্তেকালকে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে, তিনি ছিলেন ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার অধিকারী, ঐক্যের আহ্বানকারী এবং জ্ঞানচর্চার এক অনন্য পথিকৃত। মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানি রহ. ছিলেন একজন অধ্যবসায়ী জ্ঞানসাধক। অদম্য স্পৃহা নিয়ে আজীবন দীনের খিদমত করে গেছেন। বিরূপ পরিস্থিতিকে পরাজিত করে নিজের স্বকীয় মেধা ও মননশীলতার প্রমাণচিহ্ন একে দিয়েছেন ইতিহাসের মহাকালিক পাতায়। ভারতীয় বংশোদ্ভূত পাকিস্তানি এ মনীষী আকাবিরে দেওবন্দের ঐতিহ্যের পরম্পরাগত সুতোটিকে উত্তর-প্রজন্মের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজের যশ ও কীর্তি সংস্থাপিত করে গেছেন কাল-কালান্তরের স্রোতে। লেখক: শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক।
Go to News Site